বড় বাইজির বয়েস পঁচিশ বছরের বেশি হবে না। কিন্তু যেন মূর্তিমতী রতি। এই চোখে কোনও রঙ নেই। এমন সুডোল হাত, যেন কলি দিয়ে গড়া। আর ওই আলতারাঙা তুলতুলে চরণ কোনও কাঁটার আঘাত পায়নি কোনওদিন। কী মোলায়েম! বড় বাইজির কপোল যেন পাকা আপেল। এখনি গাছ থেকে ছিঁড়ে পড়তে চায়। বুধ, তোমার ঝুলি বাড়িয়ে দাও।
হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ!
মেজ বাইজির দুনিয়া-ঝলসানো দেহের দিকে তাকাও। সে বাইজির দলে সাপের মতো নাচের তালে তালে চমকাচ্ছে। এমন কালো বিষধর কেশপাশ তুমি কোথাও দেখেছ! এমন স্বপ্ন কোথায় দেখেছ তুমি? যেন ঘুমন্ত শিশুর হাসি, ঊষার বুকে শিশিরসিক্ত ফুল, সুন্দর স্বপ্ন দেখার পর চোখ মেলে বিকশিত হচ্ছে। যেন…। আধফোঁটা এই কলির মাধুর্যই অন্যরকম।
করতালের লয় হাজার মূর্ছনায় ফেটে পড়ছে। ছাতির ওপর গ্রীবাসমুদ্রের ঢেউ নাচছে, ভেঙে পড়ে দূরে হারিয়ে যাচ্ছে, আবার ভেঙে পড়ছে, তার পর সব নিস্তব্ধ। এই সুন্দর উপত্যকা, এই টিলা, এই দুধের ঝরনা…
হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ!
বুড়ো পূজারি মারা গেছেন।
মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি কোলাহল তুলেছিল। পূজারি কাঁদছে। মেয়েরা মন্ত্রপাঠ করছে। বাইজিরা থালায় ফুল সাজিয়ে সাধুর সমাধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সারাদিন কলরব লেগেই থাকে।
এখন রাত্রি।
টিলা সুপ্ত। সাধুরা যার যার সমাধির ভেতর ঘুমিয়ে। বিশহাজারির ছোট-ছোট ঘরের ছোট্ট-ছোট্ট জীবনের কোলাহল ঘুমন্ত। পৃথিবীর কক্ষ-পরিভ্রমণ থেমে গেছে। মন্দিরের চত্বরে যুবক পূজারি একা বসে ছিল। সে আজ সিদ্ধি গিলেছে, চরস খেয়েছে, মদ টেনেছে। তবু তার চেতনায় কোনও বিভ্রাট নেই।
‘গুরু।’ আমি তার কাছে গিয়ে আস্তে করে ডাক দিলাম। তার পর তার গায়ে হাত দিয়ে বসে পড়লাম। সে নিঃশব্দে কাঁদছিল, আর আলগোছে চোখের জল মুছে ফেলছিল।
‘তোমার কিসের দুঃখ, গুরুদেব?’
‘আমি গদি চাই, আমি নারী দেহ চাই, আমি হোটেলে খেতে চাই, আমি আমার আত্মা থেকে সমস্ত ভোগ-লালসা দূর করে দিতে চাই। জানি না, আমি কী চাই।’
‘তুই গদি চাস, হোটেলে খেতে চাস?’ কে যেন তার মাথার উপর থেকে বলল। আমরা দু জনে ঘুরে দেখি, প্রৌঢ় পূজারি অগ্নিদৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে রয়েছে বলছে, ‘এই মন্দিরে লালসার ভিখারিদের জায়গা নেই। দূর হ এখনি এখান থেকে!’
যুবক পূজারি সটান খাড়া হয়ে দাঁড়াল। তার হাতের পেশি উছলে উঠেছে। দাঁত কটমট করছে। দম-আটকানো গলায় সে বলল, ‘এখনি তোকে খতম করে ফেলব। তুই দূর হয়ে যা– ‘
বাবা পন নাথ ভয়ে পালিয়ে গেল।
অতিথিশালায় তখনও আলো জ্বলছিল।
যুবক পূজারি অতিথিশালার দিকে এগোতে লাগল। সে একবার আমার দিকে তাকাল। তার পর মুখ ঘুরিয়ে আবার এগিয়ে চলল সামনের দিকে। আরও, আরও…। আর ফিরে তাকাল না। পূজারির ফুল-সাজানো সমাধি পার হয়ে সে এগিয়ে চলেছে। এবার অতিথিশালার দরজায় পৌঁছল। তার পর ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
অতিথিশালার আলোও নিভে গেল।
টিলা সুপ্ত। সাধুরা সমাধির বুকে নিদ্রামগ্ন। বিশহাজারির ছোট-ছোট ঘরের ছোট্ট-ছোট্ট জীবনের স্পন্দন নিভে গেছে। থেমে গেছে পৃথিবীর গতি।
দ্বিতীয় দিন জানা গেল, বাবা পন নাথকে কে যেন খুন করে রেখে গেছে। পুলিশ সন্দেহক্রমে যুবক পূজারি ও বাইজি তিনজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। পরে বাইজিরা ছাড়া পেল। খুনের অভিযোগে মামলা চালানো হল কেবল ছোকরা পূজারির বিরুদ্ধে। কিন্তু সে-ও প্রমাণের অভাবে রেহাই পেয়ে গেল।
খালাস পেয়ে বেরিয়ে এসেই সে সুন্দর করে বাবা পমন নাথের সমাধি তৈরি করে দিল। এখন তিনজন বাইজি প্রতিদিন সেখানে ফুল ছড়ায়।
যোধপুর থেকে বাইজি তিনজনের ফিরে যাওয়ার আদেশ এল। সেখানকার পূজারি লিখেছে। কিন্তু যুবক পূজারি তা গ্রাহ্যই করল না। কেননা, দিল্লিতে ধর্মজ্ঞানের চর্চা এখন খুব বেশিমাত্রায় হওয়া দরকার। যুবক পূজারি জবাবে লিখল, যদি এইরকম বাইজি যোধপুরের মন্দিরে আরও থাকে, তাদের যেন দিল্লি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর যোধপুরের পূজারি চুপ করে গেল।
দৈবক্রমে মঠের রায়মতো নতুন পূজারিই ভৈরবী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত মনোনীত হল। সে গায়ত্রী পাঠ করতে জানে না। তাতে কী। সে এখন বৃদ্ধ পূজারির বিপুল ধনদৌলতের মালিক। বৃদ্ধ পূজারি এ সম্পদ ব্যাংকে রাখেনি, তার কুঠরির ভেতর পুঁতে রেখেছিল।
‘তুমি কেমন করে খবর পেলে?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
‘এমনি। শুধু ভগবান আমাকে খবর দিয়েছিল। বুড়ো বাবার কুঠরির ভেতর ঢুকেই আমার খেয়াল এল। তিনি হাত-ইশারায় বলেছিলেন, তাঁর ঘরে কিছু আছে। এটা-সেটা খুঁড়ে দ্যাখো। যদি রাতারাতি না-দেখতাম, এই গুপ্তধন আমার কপালে জুটত না। আমি মামলা চালাতাম কী করে! কী করে হতাম এই গদির মালিক!’
সে গদির মালিক– গর্বভরে কথাটা সে বলছে, ঠিক এমনি সময় আমার চোখে পড়ল একখানা সাক্ষাৎকার কার্ড :
ভৈরবী মন্দির লিমিটেড
শাখা : লাহোর, দিল্লি, যোধপুর, রুড়কি
স্বত্বাধিকারী : বাবা দমন নাথ গোস্বামী
আমি এবার চিৎকার করে বললাম, ‘পেয়েছি, পেয়েছি।’
সাধু ভয় পেয়ে গিয়ে জিগ্যেস করল, ‘কী হল?’
আমি ঘরমুখো ছুটতে ছুটতে বললাম, ‘ভগবান পেয়েছি, ভগবান পেয়েছি, পেয়েছি।’
.
গত পনেরো বছর যাবৎ আমি বোম্বাইয়ে স্থায়ীভাবে বাস করছি। জহুতে আমার নিজস্ব ভৈরবী মন্দির আছে। একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছি সুরাটে, আর একটি আহমদাবাদে। আনন্দপুরে বাইজিদের মঠ খুলেছি। সারা ভারতে কোথাও আপনার চোখে পড়বে না এমন সুতনু সাধন-সঙ্গিনী। বছরে আট মাস এই বাইজিরা ঘুরে-ঘুরে টাকা আর কাপড় সঞ্চয় করে।
