‘কেন?’ বড় কষ্টে কাঁচা পেঁয়াজ খেতে-খেতে আমি প্রশ্ন করলাম।
‘জ্যোতি-সাধুদের মনে কোনও লালসা থাকা উচিত নয়। মাংস খাক, মদ চালাক, বিছানায় মেয়েছেলে নিয়ে রাত কাটাক– সবকিছু করে দুনিয়ার ভোগ-লালসা বের করে দিক মন থেকে। তখন সে ভগবান পেতে পারে।’ সে হাসতে লাগল।
‘হাসছ কেন?’
‘কাউকে বলবে না তো? ভৈরবীর দিব্যি করো!’
ভৈরবী-জ্যোতির দিব্যি।
‘এই-যে প্রৌঢ় পূজারি বাবা পন নাথ– আসলে কিন্তু ভয়ানক বদমাশ। চেহারা দেখে বুঝতে পারো না, কেমন শয়তানি-শয়তানি ভাব। একে সাধু বলে মনে হয়, না, চণ্ডাল?’
‘চণ্ডাল।’ আমি মাথা দুলিয়ে বললাম।
‘চণ্ডাল নিজে নিজেকে সাধু বলে। আমি এর নাড়ি-নক্ষত্র জানি।’
‘নাড়ি-নক্ষত্র?’
‘হ্যাঁ।’ সে অন্য কোণ থেকে এক বোতল মদ তুলে নিয়ে এল। ‘নাও চালাও।’
আমি বললাম, ‘না, আগে তুমি।’
সে বোতলে মুখ দিল। মাত্র দু-চুমুক বাকি রেখে হেসে বলল, ‘না, তুমি খাও। জ্যোতির চরণামৃত।’
‘সহায় হও, গুরুজি।’ আমি দুই চুমুক কণ্ঠনালির নিচে নামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘অমৃতের মজা পেয়েছি, গুরু। হ্যাঁ, তুমি বাবা পন নাথের কথা বলছিলে।’
‘একদম পয়লা নম্বরের হারামি। গুরুজি এখন খুব বুড়ো হয়ে গেছেন– তিনি ধনে নিয়ে বসে থাকেন। আমাকে কিন্তু বলে, পেঁয়াজ খেয়ো না, চোখ তুলে চেয়ো না, দিনরাত ধনে খাও। বাবা পন নাথ আমাকে বড় কড়া চোখে দেখে। মন্দিরে কোনও মেয়ের দিকে তাকাবার উপায় আছে? কিন্তু নিজে– নিজে
‘হ্যাঁ, কী করে?’
যুবক পূজারি ইতিউতি তাকাল। একবার বাইরের দরজা পর্যন্তও গেল। তার পর ফিরে এসে আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলতে লাগল…
আমি চিৎকার করে বললাম, ‘না, না, একথা সত্যি হতে পারে না।’
ভৈরবী-জ্যোতির দিব্যি। আমি নিজের চোখে দেখেছি। ও নিজের বয়েসি মেয়ে খুঁজে বেড়ায়। যুবতী মেয়েদের দিকে ফিরেও তাকায় না। কেউ রোগ-শোক-বিপদে জর্জরিত, কেউ হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত, কারও ছেলেদের দৌরাত্ম্য থেকে হাঁফ ছাড়ার উদ্দেশ্য– নানারকমের মেয়ে আসে, আর বলে, আমাকে ভগবানের সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দাও। তারা দিনরাত মন্দিরে যাতায়াত করে, মানত শোধে, প্রসাদ আনে, মন্দিরের সিঁড়ি নিজের চুল দিয়ে ঝাঁট দিয়ে দেয়, পূজারির পা টেপে, ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা মন্দিরের চত্বরে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে, আর বাবা পমন নাথের সঙ্গে প্রার্থনা করে, তিনি যেন তাদের ভগবানের সঙ্গে মিলন ঘটিয়ে দেন, একবার ভগবান দেখিয়ে দেন।’
‘তার পর?’
‘ও তাদের ভগবানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়।’ যুবক পূজারি অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল। ‘হি হি হি।’ হাসিটা চড়তে লাগল তার। বলল, ‘একবার যে মেয়ে ভগবান দেখেছে, সে না ঘরের, না ঘাটের। ব্যস্, একদম মন্দিরের সম্পত্তি হয়ে যায়।’
.
যোধপুরের মন্দির থেকে তিনজন বাইজি এসেছিল। মন্দিরের দেবদাসী এবং অতিথিদের সঙ্গে তাদের থাকার জায়গা করে দেওয়া হল। তাদের পরনে গেরুয়া রঙের শাড়ি। চুল আলুলায়িত। কপালে চন্দনের তিলক। গৌর রঙ। দেহে যৌবন, অন্তরে ভগবানের জ্যোতি। বিশহাজারির আকাশে-বাতাসে আলোড়ন জাগল। প্রত্যেক মেয়ের এখন উৎসব-রাত্রি। যখন তারা করতাল সহযোগে ‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ’ গায়, বিশহাজারির মেয়েদের মন ভাবে গদগদ হয়ে ওঠে। তারা এদের সব আরতিতে যোগ দিতে লাগল। আজকাল ঘরে-ঘরে কেবল এই বাইজিদের কথা। জীবনে যারা মন্দিরে পা দেয়নি, তারা দিনে দু-তিনবার নিশ্চয়ই মন্দিরে আসবে। যদি মন্দিরে ভগবান-দর্শনে মন না-ভরে, তাদের কীর্তনের বায়না দেয় নিজের বাড়িতে। তার পর আর কী! জনসাধারণ বাইজি-দর্শনে আসছে, মেয়েরা প্রসাদ বিতরণ করছে, বাইজিদের জন্য দোশালার অর্ডার দিচ্ছে। প্রত্যেক কীর্তনের আসরে একশো সওয়াশো লোক জমা হয়। বাইজিদের নির্দেশ, সকলের আগে মন্দিরে ষাটটি টাকা এবং দোশালা পৌঁছে দিতে হবে। নচেৎ নাম-কীর্তনের আসর জমবে না। আবার পাড়ার একজন নাম-কীর্তন করাল, তখন অন্যে বাদ যাবে কেন? ঘরে-ঘরে মেয়েরা পালা করে নাম গাওয়াতে লাগল। ষাটটা টাকা, তিনজোড়া শাল আর ভগবানের নাম-গান। এ আর এমন কী! আরে মশায়, সবজি-মণ্ডির মেয়েরা- যারা আগে ঘরে এসে নাম-কীর্তন করত, এর কাছে কোথায় লাগে! তারা পঞ্চাশ টাকার কম স্পর্শ করত না। আর কী চেহারা! কালো পেতনি চিমসে মেয়েমানুষ! এদের ভজন-সভা দেখলে ভগবান নিজে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলতেন। আর, এই বাইজিদের গানে কী মজা… যেন… বাহ্ বাহ্ বাহ্…
শুনুন একবার এদের নাম-গান! হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ!– বাইজিদের চুল বাতাসে ঢেউয়ের মতো নাচছে। এলোমেলো চূর্ণকুন্তল সাপের মতো দুলছে। কয়েকগাছি এক বাইজির ঠোঁটের উপর এসে পড়েছে। পাতলা-পাতলা ঠোঁটে যেন দংশন করতে চায়। গলার উতরাইয়ে প্রাণস্পন্দন কীরকম, দেখেছেন! এই নরম বুক ভগবানের দর্শনের আশায় যেন তড়পাচ্ছে। চোখে কাজল। আহা, কী চোখ! কান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। কানের ডালিটাই-বা কী সুন্দর! ইচ্ছে হয়, কাঁচা খেয়ে ফেলি। হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ! এমন বদখেয়াল কেন মনে এল! ভগবান এর বিচার করো। ওই দ্যাখো, গোপিনীরা কদমতলায় গান ধরেছে, আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বাঁশরিতে সুর তুলে তুলে নাচছেন।
