‘ওর দোষ নয় তো কার দোষ? ছেলেমানুষই তো! ছাব্বিশ বছর বয়েস ছেলেমানুষের! ওর সাথের পড়ুয়ারা দু-দুবার বিয়ে করেছে। সুপারিন্টেন্ডেন্ট, তহশিলদার, হেডক্লার্ক হয়েছে। আর, এ হল কি না এখন ছেলেমানুষ!’
বলে দাদা আমাকে মারবার জন্য হাত তুললেন।
বউদি মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন, ‘হায়, হায়, কী করছ! ছোটভাইয়ের গায়ে হাত তুলতে লজ্জা হয় না তোমার? আপিসে যাও! আমি ঠিক ওকে বুঝিয়ে বলব।’
দাদা থেমে বললেন, ‘ওকে বলে দাও, যদি বাড়িতে থাকতে চায়, তবে এই গেঁয়োচণ্ডিপনা ছেড়ে দিতে হবে, ভগবানের নাম নিতে হবে, সকাল-সন্ধ্যা মন্দিরে যেতে হবে। আমি কখন বলেছি যে, চাকরি পায়নি, সেটা ওর দোষ? কিন্তু ভগবানের নাম নিলে সব বিপদ থেকে পার পাওয়া যায়। আমার ভাই কী অপরাধ করেছে তুমি দয়া করো, ভগবান!’
বলতে বলতে দাদা ভারি নরম হয়ে গেলেন। আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘বুধ (আমার নাম বুধরাজ। তিনি আদর করে ডাকেন, বুধ।), মন্দিরে যাওয়া-আসা করো, ভগবানকে অসন্তুষ্ট করা উচিত নয়। ভগবানকে পাওয়া গেল তো সব পাওয়া গেল। আমাকে কথা দাও, তুমি আমার কথা রাখবে।’
আমি চিরকালের জন্য মার্কসের বই বন্ধ করে ফেললাম এবং নিয়মিত ভৈরবীর মন্দিরে যাতায়াত শুরু করলাম।
ভৈরবীর মন্দিরে তিনজন পূজারি। একজন বৃদ্ধ, দ্বিতীয়জন প্রৌঢ়, তৃতীয়জন যুবক। সবচেয়ে উদার বৃদ্ধ পূজারি, সবচেয়ে নীচ প্রৌঢ় পূজারি। যুবক পূজারি সৌম্যদর্শন, হাসিমুখ। প্রথম পূজারি পাণ্ডিত্যে অগ্রজ, মধ্যম পূজারি কলহপ্রিয়। ছোট পূজারি গায়ত্রী মন্ত্র পর্যন্ত ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। কিন্তু তার হাসিটুকু বড় মিষ্টি, চেহারাটি ভারি সুন্দর। শরীরটা বেশ সুঠাম। সিদ্ধি পানের পর তার চোখ লাল ধুতরার মতো মনে হয়। যখন সে ঢুলুঢুলু চোখে মেয়েদের দিকে তাকায়, হরিণও ভুলে যায় তার পটলচেরা চোখের গর্ব। কিন্তু মধ্যম পূজারি তার ওপর ভয়ানক কড়া নজর রাখে। আর, বৃদ্ধ পূজারি তাকে পেঁয়াজ এবং অন্যান্য গরম জিনিস খেতে মানা করে।
ভৈরবী মন্দিরের মালিক অন্য কোনও ব্যক্তি। বৃদ্ধ পূজারি হলেন এই মঠের গুরু। মঠের একটা মন্দির আছে লাহোরে, একটা রুড়কি আর একটা যোধপুরে। কিন্তু দিল্লির মন্দির সবচেয়ে বড়। এখানে দান সবচেয়ে বেশি পড়ে। তারপরেই লাহোরের মন্দিরের আয়। যোধপুরের মন্দিরের স্থান তার নিচে। রুড়কির মন্দিরের অবস্থা আদৌ ভালো নয়। সেখানকার পূজারির মাইনে এখান থেকে পাঠাতে হয়। বুড়ো পূজারি প্রত্যেক মাসের পয়লা তারিখে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মনি-অর্ডারযোগে পাঠিয়ে দেয় রুড়কি।
ভৈরবীর মন্দিরের চত্বর খুব প্রশস্ত। মন্দিরটি বড় ছোট। কিন্তু সিদ্ধি তৈরির কামরাটা বেশ বড়। এই কামরার সংলগ্ন তিনটি কামরা। ছোট, ধুলোয় কালো, আরও ছোট দরজা। তার ওপর জানালা নেই। এ-পাশেরটা বৃদ্ধ পূজারির। তার পরের কামরা মধ্যম পূজারির। তার সম্মুখে যুবক পূজারির শোবার ঘর। তার সম্মুখে টিলার উপর ঝোঁপঝাড় এবং কোথাও কোথাও সাধুদের সমাধি-মন্দির চোখে পড়ে। শেষ সমাধি-মন্দির থেকে এক ফার্লং দূর হবে। এখানে বহিরাগত সাধুদের জন্য অতিথিশালা; কেবল মঠের সাধুরাই থাকতে পারে। মন্দির ও অতিথিশালার চারিদিকে দেয়াল।
ভৈরবীর মন্দিরে প্রতিদিন পঞ্চাশ-ষাট টাকা দান পড়ে। সকালে মেয়েদের ভিড় জমে। সন্ধ্যায় কাজকর্ম থেকে অবসর পাওয়ার পর পুরুষেরা আসে ঠাকুর-দর্শনে। কিন্তু মেয়েদের সকালে ঠাকুর দর্শন করতে হয়। এইজন্য তারা ভোরবেলাতেই মন্দিরে আসে। অনেক সময় এমনও ঘটে যে, সকালে এসে তাদের ছোট পূজারিকে ঘুম থেকে জাগাতে হয়। তার পর ঘণ্টাধ্বনি পাহাড়ের মাথায় আঘাত খায়, গর্জন তুলে বিশহাজারির আকাশ ছেয়ে ফেলে। যুবক পূজারি ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। তখন মেয়েরা মৃদু গলায় শোরগোল তোলে। সকালে যুবক পূজারির ওপর ঠাকুরকে জাগানোর ডিউটি পড়লে দর্শনার্থীদের প্রায়ই তাকে বিছানা থেকে টেনে তুলতে হয়। ছোট পূজারির বড় ঘুম। বুড়ো পূজারি তাকে ভর্ৎসনা করে। প্রৌঢ় পূজারি করে গালাগালি। যুবক পূজারির শাস্তি হিসেবেই বোধহয় সকালে ডিউটি পড়ে। ভারি বিরক্ত হয় সে। কিন্তু গুরুর মর্যাদা ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে চুপ করে যায়।
যুবক পূজারি খুব শিগগির আমার বন্ধু বনে গেল। মন্দিরের পূজা-পাঠ ইত্যাদির পর আমরা তার কামরায় গিয়ে সারাটা দিন গালগল্প করে কাটাই। সে-ই আমাকে জানাল, মন্দির থেকে আজকাল বৃদ্ধ পূজারির প্রায় লাখ টাকা আমদানি। বৃদ্ধ পূজারি এখন শ্মশানের পথে। এখন তাদের মধ্যে উত্তরাধিকারী নিয়ে ঝগড়া চলছে। সে নিজেই চায় এই গদি। কিন্তু মর্যাদা ও বয়সের দিক থেকে বোধহয় প্রৌঢ় পূজারি উত্তরাধিকারী হবে। ব্যাপারটা ভারি খারাপ দাঁড়াবে। বুড়ো পূজারি প্রথমে তাকে ভালোবাসত, এখন তার মন ঢলেছে মধ্যম পূজারির ওপর। কারণ, তার ধারণা, যুবক পূজারির পূজা-পাঠের প্রাথমিক অধ্যায়ও শিক্ষা হয়নি।
‘এখন তুমি কী করবে?’ আমি হেসে বললাম।
সে ঘরের কোণ থেকে দু-কোষ পেঁয়াজ নিয়ে এল, আগে লুকিয়ে রেখেছিল। আমার দিকে একটা পেঁয়াজ ছুঁড়ে বলল, ‘খাও।’ অন্য পেঁয়াজটা সে নিজেই খেতে লাগল।
‘কচর-মচর– বেশ মজা কিন্তু।’ সে আমাকে বলল, ‘পেঁয়াজ আমার খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে লুকিয়ে আমি মাংসও খাই। জ্যোতি-সাধুদের সবকিছু খাওয়া উচিত।’
