অন্ধকার আস্তে আস্তে শহরটাকে ছেয়ে ফেলল। পথঘাট নির্জন হয়ে গেল। কোনও বাড়ি থেকে রেডিও’র শব্দও শোনা যাচ্ছে না। একটা ভয়াবহ নীরবতা সমস্ত শহরটাকে চেপে ধরেছে। তবু মিলিটারি ট্রাক্ বা জিপ দ্রুতবেগে চলে যাওয়ার শব্দ মুহূর্তের জন্যে এই নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে। তার পর আবার সব নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে।
.
সকাল সাতটা বাজবার সাথে সাথে লোকে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ট্রাম, বাস চলাচল শুরু হল। আজ প্রত্যেকের মুখ মলিন। ঘাড় নিচু করে চুপচাপ তারা নিজের কাজে চলে যাচ্ছে। বাজার বন্ধ। কিন্তু দু-একটা দোকান খোলা হয়েছে।
মালাবারি হোটেলের কপাল পুড়ে গেছে। কয়েকজন মাত্র লোক হোটেলের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। জুম্মন আর শরফু নিজের কাজে ব্যস্ত রয়েছে। বশির খদ্দেরদের চা দিচ্ছে। সে আজ সকালে কাজে ফিরে এসেছে। মুনশিজি পোস্টকার্ড আর টিকিটের বাক্স নিয়ে এসেছেন, কিন্তু আজ তাঁর দোকান খুলতে ইচ্ছা করছে না। মসজিদের হাফেজ সাহেব দিল্লির কাপড়অলার সাথে আস্তে আস্তে কথা বলছেন।
মাহমুদ খাঁ পাঠান মুনশিজির খোঁজে হোটেলে এসে পৌঁছল, ‘মুনশিজি, একটা চিঠি হাসান খাঁর বাড়ির লোকের কাছে লিখে দাও! ঠিকানা আমি বলে দিচ্ছি। বেচারার তিনটে ছোট ছোট বাচ্চা আছে।’
জুম্মন বলল, ‘হ্যাঁ, মুনশিজি, জরগুলের চাচাকেও একটা চিঠি লিখে দাও। তার বিধবা বুড়ি-মা আছে। সে-ই তার একমাত্র ছেলে।’
জুম্মন মুনশিজির সামনে চায়ের পেয়ালা রাখতে রাখতে বিষণ্নসুরে আস্তে আস্তে বলল, ‘আর মকরানি!’
মুনশিজি চশমার উপর দিয়ে জুম্মনের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, ‘হ্যাঁ, মকরানি!’
প্রত্যেকেই কেমন জানি উদাস হয়ে গেল। সবার মাথা নুয়ে পড়ল। মুনশিজি জিগ্যেস করলেন, ‘ওর নাম কী ছিল?’
কেউ কোনও জবাব দিল না।
: ‘ওর বাড়ি কোথায়?’
তবু সবাই নীরব।
: ‘ওর মা-বাপ কোথায়?’
এবারও কারও মুখে কথা নেই।
এবং তার পরিণাম যে কী হয়েছে, সে-কথাও কেউ জানে না।
অনুবাদ : মিলি হোসেন
ভৈরবী মন্দির লিমিটেড – কৃষণ চন্দর
সেইসব দিনের কথা, আমার যখন ঈশ্বর ও ধর্মে বিশ্বাস ছিল এবং আমি পাঁচ বছর বেকার ছিলাম।
এই পাঁচ বছরে সবরকমের চেষ্টা করেছি।
বি.সি.এস.-এর পরীক্ষা দিয়েছি। ফেল।
তহশিলদার হওয়ার চেষ্টা করেছি। ফেল।
তহশিলদারের সহকারী হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। ফেল। তাঁর কর্মচারী হওয়ার জন্য দরখাস্ত করেছি। ফেল।
চারিদিক থেকে নিরাশ হওয়ার পর দিল্লিতে দাদার ফার্মের দরজায় গিয়ে হাজির হলাম। এই ফার্মের মালিক আমার দাদা নন। কিন্তু যেহেতু দাদা ফার্মের খাজাঞ্চি, এইজন্য আমরা সকলে বলতাম ‘দাদার ফার্ম’। ফার্মের নাম ছিল ইন্ডিয়া-ইন্ডিয়া। দাদা আমার একটা পছন্দমতো রোজগারের হিল্লা করে দিলেন। ফেল। আবার, জনসন অ্যান্ড টমসন অ্যান্ড কোং, রোলদুরাম ফোলদুরাম খোলদুরাম অ্যান্ড কোং, রায় সাহেব রাম জয়রাম ভায়া সহায়রাম অ্যান্ড ব্রাদার্স ইত্যাদি অন্যান্য ফার্মে চেষ্টা করলেন। তা-ও ফেল।
আমার দাদা দিল্লির বিশহাজারিতে থাকতেন। ভৈরবীর মন্দিরের নিচে। এই মন্দির একটা ছোট পাহাড়ের উপর। অদৃষ্টই বলতে হয়, দিল্লির এক শেঠ তিন-কামরাঅলা পনেরো-বিশটা কোয়ার্টার তৈরি করে রেখেছিলেন। সেখানে কেরানির মাগ-ছেলে মুরগি বেড়াল কুকুর সমেত বাস করতেন। এই কোয়ার্টারের ঠিক সামনে পাহাড়ের উপর ভৈরবীর মন্দির। ডানদিকে একটা গির্জা, বাঁ-দিকে মোটরের গ্যারেজ আর শিখ ডাক্তার সর্বসুখ সহায়ের কুঠি। দাদার সঙ্গে এই ডাক্তারের খুব খাতির ছিল। তিনি আমাকে তাঁর ডাক্তারখানার কম্পাউন্ডারি শেখার জন্য রাখলেন। কিন্তু এখানে আমার আক্কেল বেশিদূর গড়াল না। কারণ, ওষুধের নামগুলো এত বেয়াড়া যে, বুঝতে বেশ বেগ পেতে হয়। তার পর, কোটা বিষ, কোন্টা নয় সেসব আরও মুশকিলের ব্যাপার। কোনও কোনও ওষুধ বিশ ফোঁটা পর্যন্ত বিষ নয়, কিন্তু একুশ ফোঁটা হলেই বিষ হয়ে যায়। বুঝুন এখন। ভুলচুকও তো হতে পারে! বিশেষ জায়গায় একুশ ফোঁটাই যদি পড়ে যায়! রোগী তা হলে আদমের দেশ ছেড়ে সোজা রাস্তা ধরবে। না, বাবা, দরকার নেই কম্পাউন্ডারিতে। আমি ফিরে এলাম।
যখন কোনও কাজ পাওয়া গেল না এবং জীবনের পাঁচটা বছর তল্লাশেই কেটে গেল, দাদার মেজাজ-ব্যারোমিটারের পারদ তখন শেষ সীমানায় এসে পৌঁছল। একদিন গর্জন করে বললেন, ‘চাকরি পাবি, না, ছাই পাবি। না আছে ভগবানের ওপর আস্থা, না আছে ধর্মে বিশ্বাস। এমন নাস্তিক আক্কেলের ছোকরা আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। যখনই দ্যাখো, খবরের কাগজ, সাময়িক পত্রিকা, সোশ্যালিজমের বই নিয়ে বসে আছে। তুই করবি চাকরি! চাকরি করার জন্য মনকে একটু কষ্ট দিতে হয়, দিনরাত ভগবানের আরাধনা করতে হয়। আমার দিকে চেয়ে দ্যাখ্। দিনভর আপিসে কাজ করি, সকাল-সন্ধ্যা আহ্নিক করি, রাত্রে শোবার সময় ফের মালা জপি। সেইজন্যই তো ভগবান চারটি ছেলে দিয়েছেন, ইন্ডিয়া-ইন্ডিয়ার মতো বড় ফার্মের ক্যাশিয়ার করেছেন, দুনিয়ায় ইজ্জত দিয়েছেন, সম্মান দিয়েছেন। ডাক্তার সুখ সহায় পাড়ার একজন কর্তাব্যক্তি, তিনি নিজে নমস্কার জানান। সমস্ত পাড়ায় রোয়াব করে থাকি। আর, তুই –‘
তার পর তিনি আমাকে ভয়ানক ইতর গাল দিলেন একটা। এ-গালি সারাজীবনে আমাকে কেউ দেয়নি। আমি কাঁদতে লাগলাম। বউদি এসে আমার মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। আমি আরও জোরে কেঁদে উঠলাম। বউদি রেগে বললেন, তুমি বেচারার ওপর বোমা ফাটাচ্ছ কেন। এখন তো ছেলেমানুষ। ভগবান করেন তো চাকরি পেয়ে যাবে। ওর দোষ কী?’
