ছেলেটা দৃপ্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, ‘না, দেব না!
জরগুল একটু হেসে বলল, ‘নিয়ে আয়, গুলি ভরে দিই।’
ছেলেটি ক্রুদ্ধভাবে জবাব দিল, ‘না, দেব না।’– কিন্তু পরমুহূর্তেই জরগুলকে হাসতে দেখে বন্দুকটা সে তার হাতে দিয়ে দিল।
জরগুল খুশির চোটে বন্দুকটায় চুমো দিয়ে নিল। তার পর খুলে ফেলে বলল, ‘গুলি কোথায়, নিয়ে আয়।’
বিস্মিত ছেলেটা একটা ছোট কার্তুজ বের করে দিল।
: ‘আরে, এটা যে একেবারে ছোট! এতে হবে না।’–জরগুল কার্তুজটা নলের একদিক দিয়ে ভরে অন্যদিক দিয়ে বের করে দিয়ে হাসতে লাগল। কয়েকজন পথিক জমা হয়ে তামাশা দেখতে লাগল।
ছেলেটা পকেট থেকে অনেকগুলো কার্তুজ বের করে দোকানের চৌকির উপর রেখে দিল। জরগুল গুলি ভরে বন্দুকটা ছেলেটাকে দিতে দিতে বলল, ‘ঐ দ্যাখো, ফেরদৌসের কাছে সেপাই দাঁড়িয়ে আছে। মারো!’
ছেলেটা বন্দুক নিয়ে নিল। তার মুখে আনন্দের আভাস দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সমস্ত শরীর কাঁপছে। না-জানি কোনদিকে বা নিশানা করে সে ঘোড়া টিপে দিল। তার পর নিজেই এক ঝটকায় পড়ে গেল এবং বন্দুকটা একদিকে ছিটকে পড়ল। লোকে হো হো করে হেসে উঠল। মকরানি পেট চেপে ধরে চৌকির উপর গড়াগড়ি দিতে লাগল। জরগুল বন্দুক উঠিয়ে নিয়ে চৌকির উপর থেকে কার্তুজগুলো তুলে পকেটে ভরে নিল। তার পর স্টলগুলোর আড়াল দিয়ে প্যারাডাইস সিনেমার দিকে চলে গেল।
ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।
: ‘আরে! কাঁদছিস?’– মকরানি হাসতে হাসতে বলল, ‘মা’র কথা মনে পড়েছে? আয় আমার সাথে। এক সিঙ্গেল দুধ খাইয়ে দেব।’
ছেলেটা হু হু করে কাঁদতে লাগল, ‘ওই হারামিরা কাল আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে।’
তার ভাইয়ের সাথে মকরানির আদৌ পরিচয় ছিল না। তবু সে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আরে, ও মরেনি। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে মোটরে করে। আমি নিজে দেখেছি। তাকে ধরে নিয়ে গেছে। কাল ছাড়া পেয়ে যাবে।’
তবু ছেলেটি কাঁদতে লাগল।
.
হোটেলে বইঅলা অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে বলছিল, ‘ওরা ছয় বছরে কী করেছে আমাদের জন্যে? আমাদের কোন্ দুঃখ-দরদ ঘুচিয়েছে? কোন্ বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে? এখন পর্যন্ত শত শত লোক ফুটপাথে পচছে। শত শত লোক বেকার। রুজি মেলে না। রেশনের দোকানে আটা পাওয়া যায় না। আমাদের কোনও দুঃখের খবর রাখে কি ওরা?’
কাপড়অলা বলল, ‘সারাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। কাপড় আর খাবার জিনিস বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। তরিতরকারির দাম দুই-তিন গুণ বেড়ে গেছে।’
মুনশিজি দুঃখের সাথে বললেন, ‘আর, একসময় অহংকার করে বলা হত, আমাদের খাবার কখনও কম হবে না।’
বইঅলা বলল, ‘আরে সাহেব, বলে কি না আমাদের টাকার দাম ভারতের পাঁচসিকের সমান। আর বাজারে কেউ দশ আনা দিয়েও পৌঁছে না।’
মুনশিজি বললেন, ‘জি হ্যাঁ। আরও বলা হয়, আমরা স্বাধীন। ব্রিটিশ মহারানির অধীনে—’
বইঅলা বলতে লাগল, ‘বাজার তো চড়েই চলেছে। না আছে রোজগার, না বাড়ি, না খাবার, না কাপড়। আর ছাত্রেরা মাইনে কমাতে চেয়েছে তো দেখুন তার পরিণাম।’
মকরানি ভীতভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘চাচাজি, চাচাজি, জরগুল মারা গেছে।’– তার পর ঝট্ করে আবার বেরিয়ে যেতে উদ্যত হল।
জুম্মন ডাক দিয়ে বলল, ‘আবে এই হারামি! তুই কোথায় মরতে যাচ্ছিস?’
চাচাজি ডাক দিলেন, ‘আরে, এই মকরানি–!’ কিন্তু সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
তার পর প্রতিমুহূর্তে দুঃসংবাদ আসতে লাগল। চাচাজি, মুনশিজি, কাপড়অলা, মির্জাজি– সবাই মাথা চেপে ধরে এইসব খবর শুনতে লাগলেন। কিন্তু কারও মুখ দিয়ে কথা বের হল না।
আখঅলা মারা গেছে।
গফুর কাবাবি মারা গেছে।
ফলঅলা আহত হয়েছে।
অন্ধ হাফেজ, গনি, হামিদ আর ইলিয়াসকে গ্রেফতার করেছে। খবরের জাগজের হকার আহমদ এবং জাপানি রুমালঅলা আসলাম আহত হয়েছে। আকাশ-বাতাস গ্যাসের ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরপর গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ আসতে লাগল। সবাই চুপ করে বসে রয়েছেন। চাচাজি মাঝে মাঝে রাগে চিৎকার করে উঠছেন, ‘এ সমস্ত কী হচ্ছে? কেন? এর পরিণামই-বা কী হবে?’– কিন্তু কেউ উত্তর দিচ্ছে না।
একখানা মোটরগাড়ি ভিক্টোরিয়া রোডে ঘোষণা করে দিয়ে গেল, ‘পাঁচটার সময় থেকে শহরে কারফিউ চলবে। কোনও লোককে বাড়ির বাইরে দেখা গেলে তাকে গ্রেফতার করা হবে। গুলিও করা যেতে পারে। আপনারা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যান।’
কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় জনতা সেই একইভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
বড় সাহেব জিগ্যেস করলেন, ‘সে হারামি কোথায় গেল?’
জুম্মন উত্তর দিল, ‘কী জানি, একঘণ্টা থেকে তার পাত্তা নেই।
: ‘আর, বশির ‘
: ‘তারও পাত্তা নেই। ‘
শরফু বলল, ‘সে তো সকাল থেকেই নিখোঁজ।’
বড় সাহেব রাগে এবং দুঃখে বললেন, ‘সব শালা মরে গেছে। জুম্মন, তাড়াতাড়ি হোটেল বন্ধ করো! শহর মিলিটারির হাতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাঁচটা থেকে কারফিউ আরম্ভ হবে। চলো চাচাজি, বাসায় যাই। জুম্মন, তুমি রাত্রে এখানেই শোবে।’
পাঁচটা বাজবার আগেই হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হল। সবাই বাড়ি চলে গেল। জুম্মন অনেকক্ষণ একা হোটেলে বসে রইল। যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে লাগল, তখন দরজায় তালা লাগিয়ে সে রাস্তায় বেরিয়ে এল। লোকজন তখন পর্যন্ত দল বেঁধে বেঁধে এদিক-সেদিক ঘুরছিল, আর মিলিটারি সেপাইরা টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিল; পুলিশের কোথাও পাত্তা পাওয়া গেল না। রাস্তায় পাথরের স্তূপ জমে রয়েছে। আর ফুটপাথে দোকানের কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় রক্তের ছাপ। লোকে সেইসব দাগের কাছে এসে দাঁড়ালে মিলিটারি সেপাইরা তাদের বোঝাচ্ছে। তখন তারা চুপচাপ এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে।
