হোটেল আজ শিগগির বন্ধ হয়ে গেল। বড় সাহেব আর চাচাজি আগেই বাড়ি চলে গিয়েছে। রাত ক্রমশ গম্ভীর হয়ে আসছে।
মকরানি, জরগুল আর বশির থালা-বাসন এবং হোটেল পরিষ্কার করার পর বেঞ্চের উপর নিজেদের বিছানা পাড়তে লাগল। মকরানির মনটা ভালো ছিল। সারারাত সে গুনগুন করে চলল, ‘কোই য়েহাঁ গিরা, কোই ওহাঁ গিরা…’, ‘আয় মেরে দিল কাহি আওর্ চল্…’; কিন্তু বশির আর জরগুলের খুব অসুবিধে হচ্ছিল গানে। ওরা বারবার কটমটে চোখে তার দিকে তাকায়, কিন্তু কিছুই বলে না। যখন সে কারও পাথর ছুড়বার বা গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়ার কাহিনি শোনায়, তখন বশির রেগে ছুরি নিয়ে তেড়ে যায়, ‘চুপ হারামি, চুপ করে থাক্! নইলে ছুরি মেরে দেব।’ মকরানি মৃদু হেসে চুপ মেরে যায়। আর, জরগুল তো সন্ধ্যাবেলা থেকেই একেবারে উদাস।
।
সকাল থেকেই শহরের অবস্থা খারাপ। ট্রাম, বাস, ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা– সমস্ত বন্ধ। শহরে পূর্ণ হরতাল। হাজার হাজার লোক রাস্তায় এসেছে। তারা দোকান এবং ঠেলা-দোকান বন্ধ করিয়ে দিচ্ছে। ছোট ছেলের দল মোটর এবং ঘোড়ার গাড়ি থামিয়ে সোয়ারিদের হেঁটে যেতে বাধ্য করছে। পুলিশের প্রচারের গাড়ি রাস্তায় টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। কোথাও চারজনের বেশি লোক জমা হওয়া বেআইনি। আইন-ভঙ্গকারীদের গ্রেফতার করা হবে।– অথচ, শত শত লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মালাবারি হোটেলের একটা দরজা খোলা। তাতে কালো পর্দা ঝুলছে। ভেতরে বৈঠক খুব জমে উঠেছে।
: ‘আজ কি কোনও খবরের কাগজ বের হয়নি?’ –চাচাজি জুম্মনকে জিগ্যেস করলেন।
মুনশিজি বললেন, ‘আজ খবরের কাগজের হরতাল, আর খবরই-বা এমন কী আছে? আমাদের সামনেই তো সবকিছু হচ্ছে। সারা শহরে একটা হাঙ্গামা সৃষ্টি হয়েছে।’
আখঅলা জানাল, ‘লরেন্স রোডে লোক পুলিশকে গাড়ি থেকে টেনে টেনে নামিয়ে পিটুনি দিয়েছে।’
পিঠাঅলা নজির বলল, ‘সোলজার বাজারে লোকে চারজন সেপাইকে ঘিরে ফেলে তাদের ইউনিফর্ম খুলে নিয়েছে। আর কান ধরে ওঠবোস করিয়েছে।’
মকরানি চট্ করে জুড়ে দিল, ‘আর, তাদের মুখে কালো পালিশও ঘষে দিয়েছে।’
: ‘কাল রাত্রে প্রধানমন্ত্রী রেডিওতে ছাত্রদের উদ্দেশ করে বলেছেন, তোমরা আমার ছেলে।’
চানাচুরঅলা রেগে বলল, ‘জি! এসব প্রথমে মনে হয়নি বাবাজির!’
কাপড়অলা বলল, ‘না-জানি কত ছেলে রক্তে ভেসে গেছে, কত ঘরের বাতি নিভে গেছে। আর এখন বলা হচ্ছে, ছাত্রেরা আমার কজের টুকরো!’
চানাচুরঅলা জবাব দিল, ‘আমাদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়া হচ্ছে।’ দইবড়াঅলা একটা ভয়ংকর সংবাদ নিয়ে এল, ‘রাজা-ম্যানশনের কাছে গুলি চলেছে। একটা মদের দোকানের মালিক দোকান বন্ধ করতে অস্বীকার করায় জনতা দোকান লুট করে। তার পর পুলিশ গুলি চালিয়েছে। তিনজন মারা গেছে।’
মাহমুদ খাঁ পাঠান বলল, ‘ভালো করেছে মদের দোকান লুট করে। শালা! ইসলামি রাজত্ব বলে– এদিকে মদ বেচে!’
একজন এসে খবর দিল, ‘প্লাজা-কোয়ার্টারে গুলি চলেছে। লোকে একটা মদের দোকানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।’
চাচাজি চিৎকার করে বললেন, ‘এসব কী কাণ্ড রে, বাবা! এ আগুন তো সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে!’
কাপড়অলা বলল, ‘সারাদেশে এখন এই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।’ মকরানি দৌড়ে এসে নেচে নেচে বলতে লাগল, ‘ওদিকে পেছনে– ফিরিয়ার রোডের মদের দোকানটা পুড়ে যাচ্ছে।’
সব লোক বেরিয়ে এল। বাইরে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল।
জনকুড়ি সেপাইভর্তি পুলিশের একটা ট্রাক শেজানের দিক থেকে এসে ভিক্টোরিয়া রোডের চৌমাথায় থেমে গেল। সেপাইরা লাঠি নিয়ে লাফ দিয়ে দিয়ে গাড়ি থেকে নামতে লাগল। কে যেন জোরে চিৎকার করে উঠল, ‘মার্ শালাকে!’– তার পর শত শত লোক দাঁড়িয়েছিল বাসস্ট্যান্ড, ভিক্টোরিয়া রোড আর প্রেডি স্ট্রিটে; তারা পাথর, লাঠি আর কাঠ নিয়ে তাদের দিকে ধাওয়া করল। সেপাইরা ভয় পেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে গির্জায় গিয়ে ঢুকল। জনতার উচ্চহাসি শোনা গেল। মকরানি পাথর হাতে করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একমনে হাসতে লাগল।
আজ জরগুল এক মিনিটের জন্যে হোটেল থেকে বের হয়নি। সে হোটেলেই কাজ করছিল। আজ সে ভারি বিব্রত এবং বিষণ্ন। জুম্মন জিগ্যেস করল, ‘কেন রে, আজ এমন উদাস হয়ে রয়েছিস কেন?’
জরগুল কোনও জবাব দিল না।
শরফু বলল, ‘হাসান খাঁ লালা মারা যাওয়ায় ও দুঃখ পেয়েছে।’
জরগুল শুধু বলল, ‘ওস্তাদ, আরও অনেক লোক মরেছে।’
মুনশিজি, কাপড়অলা, বইঅলা, মির্জাজি এবং গা-মালিশঅলা মদের দোকানের অবস্থা দেখে ফিরে এল। শহরের সমস্ত জায়গায় গোলমাল হচ্ছে। পুলিশ দেখলেই লোকে মারতে ছুটছে। কয়েক জায়গায় গুলি চলেছে। প্রত্যেক মুহূর্তে নতুন নতুন খবর হোটেলে আসছে। অবস্থা ক্রমশ খারাপ থেকে আরও খারাপ হয়ে চলেছে। বারোটার সময় মকরানি এসে এক খবর দেওয়ায় সবার জান উড়ে গেল। সে বলল, ‘বন্দুকের দোকানগুলো লুট হয়ে গেছে।
জরগুল নিজের জায়গা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার মুখখানা লাল হয়ে উঠল। সে হনহন করে বেরিয়ে গেল। মকরানি তাকে অনুসরণ করল। ভিক্টোরিয়া রোডে কাপড়ের স্টলগুলোর আড়ালে বারো বছরের একটা ছেলে বন্দুক হাতে করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বন্দুকটা খোলার চেষ্টা করছিল। জরগুল লুব্ধদৃষ্টিতে নতুন, চকচকে বন্দুকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নিয়ে আয়। আমাকে দিয়ে দে বন্দুকটা।
