কিন্তু মালাবারি হোটেলের জৌলুশ কমল না। প্রত্যেকেই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে নিজের নিজের কথা বলে যাচ্ছে। ভিক্টোরিয়া রোডে আন্ডারগ্রাউন্ড রাস্তা তৈরি হচ্ছে। এখানকার ইট-পাথরের গাদাটা ছেলেরা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে নিল। মকরানি আর বশির দশ মিনিট পরপর বাইরে এসে পাথর কুড়িয়ে নিচ্ছে আর পুলিশ দেখলেই ছুঁড়ে মারছে। তার পর হোটেলের ভেতর ফিরে গিয়ে রসালো করে নিজের কীর্তি বর্ণনা করছে।
এবার পুলিশ পালাচ্ছে।
ছেলেরা খুব জব্দ করেছে ওদের। পুলিশ আত্মরক্ষার জন্যে ঘাঁটি বেঁধে দাঁড়াল।
জনৈক মন্ত্রীর মোটরে আগুন লাগল।
একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি হল।
এদিকে ভিড় বেড়েই চলেছে।
তার পর যখন খবর এল, পুলিশ গুলি চালাচ্ছে, তখন হোটেলে কিছুক্ষণের জন্য সব নীরব হয়ে গেল। শোরগোলের মধ্যে গুলি-চালানোর স্পষ্ট আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। সবাই ভীত হয়ে উঠল এবং আশ্চর্য হয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।
চাচাজি ক্রুদ্ধভাবে বললেন, ‘এর মানে কী? কোথায় মকরানি, জরগুল, বশিরঃ কেউ যেন বাইরে না যায়!’
পুলিশ এবার প্যারাডাইসের সামনে দাঁড়িয়ে গুলি চালাচ্ছে। কতকগুলি ছেলে পালিয়ে এসে হোটেলে ঢুকল। তাদের চোখ লাল হয়ে উঠেছে এবং চোখ থেকে পানি পড়ছে। ছেলেগুলো রাগে কাঁপছে। সবারই সহানুভূতি জাগল এদের দেখে। লোকের ইচ্ছা, এদের বসিয়ে পানি খেতে দেয়। কিন্তু গুলির আওয়াজ হতেই তারা সবাই বেরিয়ে গেল।
বড় সাহেব চিন্তিতভাবে হোটেলে ঢুকে বললেন, ‘হাসান খাঁ সাহেবের বুকে গুলি লেগেছে। তিনি ওখানেই পড়ে আছেন।’
সমস্ত ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন।
একজন এসে সংবাদ দিল, ‘প্রাইড অব পাকিস্তান রিকশাঅলা মারা গেছে।’
: ‘এলফিনস্টোন স্ট্রিটে দুটো ছেলে মারা গেছে। ‘
: ‘প্যারাডাইসের সামনে তিনটে লাশ পড়ে রয়েছে।’
: ফেরদৌসের কাছে একটা এগারো বছরের ছেলে মরে পড়ে আছে।’
: ‘এলফিনস্টোন স্ট্রিটে একজন লোক একটা আহত ছেলেকে সাহায্য করছিল। পুলিশ তাকেও গুলি করে মেরে ফেলেছে।’
: ‘একটি ছেলে ছাদের উপর থেকে ঢিল ছুড়ছিল। তাকে ওখানেই শেষ করেছে।’ চাচাজি খুব ধৈর্য ধরে এসব খবর শুনছিলেন। তিনি রাগে এবং দুঃখে চিৎকার করে উঠলেন, ‘এসব কী হচ্ছে? গুলি কেন চালাচ্ছে? ওদের বুদ্ধিসুদ্ধি কি একদম লোপ পেয়েছে?’
মুনশিজি বললেন, ‘যদি লোপই না-পাবে, তা হলে এরকম কাণ্ড কেন হবে?’
: ‘কিন্তু এর পরিণামটা কী হবে?’
‘পরিণাম!’– গফুর কাবাবি চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বেঞ্চ থেকে উঠতে উঠতে বলল, ‘আমরা যেদিন এখানে এসেছিলাম, পরিণাম তো সেইদিনই ঠিক হয়ে গেছে।’
বলতে বলতে চাচাজির বাক্সের উপর এক আনা পয়সা রেখে সে বেরিয়ে গেল।
সবাই নীরব। কথাটা তাদের মনে কাঁটার মতো বিঁধছিল। অতীত এবং বর্তমানের কত দৃশ্য মনের সামনে ভিড় করে দাঁড়াচ্ছে। ভবিষ্যৎটা গ্যাসের ধোঁয়া আর গুলির আওয়াজে তলিয়ে গেছে।
লোকে বাইরে গিয়ে হাঙ্গামায় যোগ দেয়। তার পর হোটেলে ফিরে এসে আজব আজব খবর শোনায়।
পুলিশ একটি টাই-পরা কলারঅলা আপ-টু-ডেট বাবুকে ধরে লাথি-ঘুসি মারতে মারতে ট্রাকে তুলে নিয়ে চলে গেল। খবরের কাগজের হকার সামির পায়ে গুলি লেগেছে। খেলনাঅলা সামাদের দিকে পুলিশ নিশানা করেছিল। সে শব্দ শুনেই মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। বোরি বাজারে লোকে পুলিশদের ঘিরে ফেলেছে। তারা বন্দুক নিয়ে একদিকে দৌড়ে যায়, আর পেছন থেকে তাদের ওপর পাথরবৃষ্টি হতে থাকে। ঘুরে অন্যদিকে যায় তো পেছন থেকে আবার পাথর পড়তে শুরু করে। তারা রেগে এদিক-সেদিক দু-চার বার গুলি চালিয়ে শেষে পালিয়ে গেছে।
জরগুল খাঁ অত্যন্ত অন্যমনস্ক হয়ে গলির মধ্যে পানের ঠেলা-দোকানের কাছে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। হোটেল থেকে বের হবার সময় মকরানি তাকে খোঁচা দিয়ে বলল, ‘কি বাবা, গুল্লু খাঁ, লুকিয়ে রয়েছ এখন! এসো-না ময়দানে! আরে তুই-না সীমান্তের পাঠান!’
: ‘শালা! হারামি! আমরা গুলি দেখে ভয় করি না। আমাদের কাছে বন্দুক নেই। নইলে শেষ করে দিতাম সবাইকে!’
: ‘বাহ্! বেটা পাঠান! এরা সব তোমার বাপ যে ভয় পেয়ে গেছে!’
বলতে বলতে মকরানি ক্যাপিটাল সিনেমার গলিতে ঢুকে গেল।
হোটেলে গনি হকার অত্যন্ত উত্তেজিত এবং ক্রুদ্ধভাবে বলে চলেছে, ‘এই পাকিস্তান কার জন্যে হয়েছে? কে পাকিস্তানের জন্যে ত্যাগ স্বীকার করেছে? গরিব মুসলমানরা, না যারা ক্লিফ্টনে থাকে, বিলাতে সফর করে বেড়ায়, আর ব্ল্যাকমার্কেট করে, তারা? আমরা ছয় বছর থেকে ফুটপাথে পড়ে আছি, আমাদের জিগ্যেসটি করার লোক নেই। ছেলেপিলের শিক্ষার কোনও ব্যবস্থা হয়নি। আর, তারা মাইনে কমানোর কথা বলেছে বলে পুলিশ গুলি চালাচ্ছে!’
ফলঅলা বলল, ‘আমাদের বিপদ উদ্ধারের কোনও উপায় কি সরকারের হাতে নেই? কোনওই প্রতিকার নেই?’
মুনশিজি বললেন, ‘হ্যাঁ, একটা প্রতিকার আছে। চুপ করে থাকো। মুখ বন্ধ করে রাখো। নইলে নিরাপত্তা আইন, জেলখানা…।’
দিন শেষ হল। ছায়া দীর্ঘ হতে শুরু করল। কোলাহলও সন্ধ্যার অন্ধকারে তলিয়ে গেল। হোটেলে আর লোকজন রইল না। কিন্তু এখনও লোকে দল বেঁধে-বেঁধে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। রক্তের দাগের কাছে যখন ভিড় জমে উঠেছে, তখন প্রচারের গাড়ি থেকে চিৎকার করে বলা হচ্ছে : ‘১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, চার জনের বেশি লোক এক জায়গায় জমা হওয়া নিষেধ।’
