রিকশাঅলা হাসতে হাসতে বলতে লাগল, ‘লজ্জা! কিসের লজ্জা! লজ্জা তো এখানে মোহাজের হয়ে গেছে। কায়েদে আজমের মাজারের নিচে ঝুপড়ি বানিয়ে পড়ে রয়েছে।
মুনশিজি বললেন, ‘তা-ও আবার এই তুচ্ছ কথাটুকুর জন্যে। কি না, ছেলেরা বলছে, মাইনে কমিয়ে দাও।’
রিকশাঅলা হাসতে হাসতে বলল, ‘মাইনে কেন কমাবে, সাহেব –যদি সব লোক লেখাপড়া শিখে ফেলে, তা হলে যে রোজ রোজ হাঙ্গামা লাগবে।’
কাপড়অলা বলল, ‘জি হ্যাঁ। আর, শিক্ষার ব্যয় পূরণ হবে কেমন করে? প্রফেসরের খোঁজে ইউরোপ বেড়িয়ে আসাই-বা চলবে কেমন করে!
বইঅলা বলল, ‘এখানকার কাণ্ডই আলাদা। ছয় বচ্ছর কেটে গেল, এ পর্যন্ত ছেলেদের লেখাপড়ার বন্দোবস্ত হল না। এখানে তো কোনও মন্ত্রী সুপারিশ না-করলে ভর্তিই করা হয় না।’
কাপড়অলা বলল, ‘প্রত্যেক বছর কোর্স বদলে দেওয়া হয়। সারাবছর বই পাওয়া যায় না। পড়াশোনা এমনি খরচের ব্যাপার যে, গরিব মানুষে তো ছেলেপিলেকে পড়াতেই পারে না।’
বড় সাহেব এই প্রথম আলাপে যোগ দিয়ে বললেন, ‘একথা সত্যি; কিন্তু বিনা অনুমতিতে মিছিল বের করারই-বা কী দরকারটা ছিল?’
রিকশাঅলা রেগে গিয়ে বলল, ‘জি! আর, লাঠি চালাবারই-বা কী দরকার ছিল? ছেলেরা কি শহর লুট করছিল?’
মুনশিজি বললেন, ‘চার বছর থেকে এই তো অবস্থা। সব লোক চিৎকার করে হয়রান হয়ে গেছে। সব খবরের কাগজে লিখেছে। কিন্তু এখানে কেউ তোয়াক্কা করল না। গরিবের কথা কেউ শোনেই না।’
রিকশাঅলা বলল, ‘ছেলে না কাঁদলে মা-ও দুধ দেয় না।’
সিল্ক মিলের ছাঁটাই হওয়া মজদুর আল্লা বখ্শ এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনছিল। সে এবার রেগে উঠে বলতে লাগল, ‘কথা এভাবে চাপা পড়ছে না আর, বড় সাহেব! এবার শুরু হয়ে গেছে ফ্যাসাদ। অত্যাচারেরও একটা সীমা আছে।’
: ‘আমাদের এখানে যদি এরকম অত্যাচার হত–
হাসান লালা নিজের কথাটা দোহরাতে চাইছিল। কিন্তু তার কথা শেষ না হতেই গফুর কাবাবঅলা খবর দিল, ‘লালা, প্যালেস সিনেমা আর করাচি ক্লাবের কাছে ছেলেদের ওপর আবার লাঠিচার্জ করেছে, আর, গ্যাস ছেড়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর বাড়ির সামনেও লাঠিচার্জ করেছে। কিন্তু ওরা ঘাবড়ায়নি।’
মকরানি আনন্দে নেচে উঠল, ‘বা রে, আবার বাঘ! লালা, আমিও পাঠান।’- হা হা করে হেসে উঠল সে।– ‘ইংরেজের কাছে কখনও মাথা নিচু করিনি।’
হাসান লালার মুখ আনন্দে লাল হয়ে উঠল। সে মুচকি হেসে বলল, ‘জিন্দাবাদ!’
.
পরদিন সকাল থেকেই লোকে হোটেলে বসে জল্পনা চালাচ্ছিল। গতকাল ছেলেরা প্রচার করে দিয়েছিল, তারা আজ আবার মিছিল বের করে নিজেদের দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে জানাবে।
চাচাজি খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বললেন, ‘পুলিশ অত্যাচারের চূড়ান্ত করেছে।’
মুনশিজি মন্তব্য করলেন, ‘হ্যাঁ, বড্ড বেশি জুলুম হয়েছে।’
কাপড়অলা বলল, ‘কমপক্ষে বিশটি ছেলে জখম হয়েছে।’
বড় সাহেব জানালেন, ‘কিন্তু রেডিওতে বলেছে, মৃদু লাঠিচার্জ হয়েছে। ফলে কয়েকটি ছেলে সামান্য আঘাত পেয়েছে।’
রিকশাঅলা ক্রুদ্ধভাবে বলল, ‘পাগলামি! ছেলেদের পেছনে শিকারি কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। প্রত্যেক গলিতে তাদের পিছু পিছু ফিরেছে। জায়গায় জায়গায় গ্যাস ছেড়েছে আর লাঠিচার্জ করেছে।
মুনশিজি বললেন, ‘দেখুন, আজ আবার কী হয়!
চাচাজি মন্তব্য করলেন, ‘আজ কিছু হবে না। এমন বোকামি আর করবে না পুলিশ। কালকের ঘটনায় সবাই ছি ছি করছে। ‘
ধ্বনি শুনে সবাই বেরিয়ে এল। আজকের মিছিল খুব বড় হয়েছে। ভারি উৎসাহ ছেলেদের। প্রাইমারি স্কুলের ছোট ছোট ছেলেরাও মিছিলে যোগ দিয়েছে। ভাইস-চ্যান্সেলার, চিফ কমিশনার এবং পুলিশের উদ্দেশে বিরূপ ধ্বনি দিতে দিতে তারা এসে এলফিনস্টোন স্ট্রিটে ঢুকল।
মিছিল ক্লার্ক স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় পুলিশ আগের মতো কাণ্ডই করে বসল, ধড় ধড় ধড়াস। অমনি দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। সারা এলাকায় গ্যাসের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল। বড় বড় ছেলেরা কালকের পথ ধরল– তারা ছোট ছোট মহল্লার মধ্যে বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির দিকে রওনা হল। কিন্তু মিছিলের বড় অংশটি– এ দলের সবাই স্কুলের, এই এলাকায়ই রয়ে গেল। ছোট ছোট ছেলেরা দোকান, বাড়ি এবং অলিগলিতে ঢুকে পড়ে কাপড় আর রুমাল ভিজিয়ে চোখে দেয়, তার পর আবার রাস্তায় বেরিয়ে এসে পুলিশের উদ্দেশে টিটকারি দেয় : হু-হুঁ-হুঁ, লু-লু-লু, হা-হা-হা, পিথ-পিথ-পিথ! তারা হো হো করে হাসে, নাচে আর বুক দেখিয়ে দেখিয়ে পুলিশকে শাপশাপান্ত করে। পুলিশ লাঠি নিয়ে তাদের তাড়া করে যায়।
লুকোচুরি খেলাটি অনেকক্ষণ যাবৎ চলল। দোকান আর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে লোকে পুলিশের বর্বরতার তামাশা দেখছিল আর হাসছিল। বড় বড় ছেলেরাও প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি থেকে ফিরে এসে তাদের দলে গিয়ে ভিড়ল। যখন কয়েকটি ছোট ছোট ছেলে পুলিশের লাঠিতে জখম হল, তখন হাওয়া বদলে গেল। ছেলেরা এবার পাথর ছুঁড়তে শুরু করল। অমনি বেধে গেল হাঙ্গামা। দোকানের কাঁচ ভাঙতে লাগল। চৌরাস্তায় আর গলিতে গলিতে হাজার হাজার লোক জমা হয়ে গেল। বাড়ির ছাদ থেকেও পুলিশের ওপর পাথর পড়তে শুরু করল। বাজার বন্ধ হয়ে গেল। পুলিশ এত গ্যাসবোমা ছাড়ল যে, আকাশ-বাতাস ধোঁয়ায় ভরে উঠল।
