জুম্মন ডেকচিতে চামচ নাড়তে নাড়তে একটু হাসল, ‘হাঙ্গামা হয়েছে? কী বকছিস রে?’ তার পর শরফু’র দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ সকালবেলায়ই শালার মাথায় নতুন জিনিস ঢুকেছে। ‘
আমল পেয়ে মকরানির সাহস বেড়ে গেল। এই মজার খবরটা হোটেলে ছড়িয়ে দেওয়া তার পক্ষে এবার জরুরি হয়ে পড়ল। ব্ল্যাকমার্কেটের ঝগড়া জোরসে চলছিল। হাসান খাঁ পাঠানকে উদ্দেশ করে মকরানি বলল, লালা, এখানে কিসের ঝগড়াঝাঁটি করছ? ওদিকে বিস্ রোডে যে লাঠি চলছে!’
এক মুহূর্ত সবাই চুপ করে রইল। হঠাৎ মাহমুদ খাঁ পাঠান চেঁচিয়ে উঠল, ‘হারামজাদা, শুয়োরের বাচ্চা, দূর হ এখান থেকে!’– তার পর সবাই মৃদু হেসে নিজের কথায় মন দিল।
কিছুক্ষণ পর শরীর মালিশঅলা আবদুল্লাহ্ হোটেলে ঢুকে খবরের কাগজ পড়ায় মশগুল চাচাজিকে উদ্দেশ করে বলল, ‘ফিরিয়ার রোডে হাঙ্গামা হয়েছে।’
মকরানি হাসতে হাসতে জুড়ে দিল, ‘অনেক লোকের মাথা ফেটে গেছে।‘
জুম্মন চুলোর কাছ থেকে মকরানিকে ধমক দিয়ে বলল, ‘কী বকছিস তুই!’
চাচাজি জিগ্যেস করলেন, ‘কীরকম হাঙ্গামা? কোথায় হয়েছে?’
আবদুল্লাহ্ উত্তর দেওয়ার আগেই মকরানি বলল, ‘ছেলেরা মারামারি করেছে।’
জুম্মন ধমকে উঠল, ‘চুপ, হারামি! শালা এখানে বসে-বসেই সব জায়গায় মেরে বেড়ায়।’
মালিশঅলা বলল, ‘চাচাজি, ছেলেদের মিছিল বেরিয়েছে। পুলিশ দু জায়গায় থামাতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেছে।’
‘প্রাইড অব পাকিস্তান’ রিকশাঅলা ব্যস্ত পায়ে হোটেলে এসে ঢুকল।
: ‘আবে ও মকরানি, এক সিঙ্গেল চা দে! পানি কম, দুধ বেশি। আর, এক গ্লাস পানি। শিগগির আন। লাঠি নিয়ে দু-ট্রাক সেপাই ক্লার্ক স্ট্রিটের দিকে গেল। মিছিল এদিকেই আসছে।’
ব্ল্যাকমার্কেটের ঝগড়া শেষ হয়ে গেল। সব লোক তার দিকে চোখ ফেরাল।
চাচাজি জিগ্যেস করলেন, ‘কীরকম মিছিল? ব্যাপারটা কী?’
মকরানি দুলতে দুলতে বলল, ‘ছেলেদের মিছিল।’
রিকশাঅলা তাড়াতাড়ি গরম চায়ে মুখ দিচ্ছিল। হোটেল থেকে ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। সিনেমার চাকররা আর লালা বাইরে চলে গেল। রিকশাঅলা পয়সা দিতে দিতে বলল, ‘ছাত্রদের মিছিল। মাইনে কমাতে চায়। শিক্ষামন্ত্রীর বাড়ি যাচ্ছে। পুলিশ বাধা দিচ্ছে, কিন্তু তারা থামছে না।’
সবাই মিছিল দেখতে বেরিয়ে গেল। শুধু জুম্মন আর চাচাজি রইলেন। জুম্মন ডেকচিগুলোর পাশে বসে বিড়বিড় করতে লাগল, ‘ঠিকই তো। শালারা মাইনে কী নেয়, মানুষের রক্ত চোষে! আমার মতো গরিব লোক তো ছেলেপিলেকে পড়াতেই পারে না।
.
প্রেডি স্ট্রিটে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লোকে দোকান থেকে বেরিয়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কাণ্ডকারখানা দেখছিল। মকরানি প্রথমে কফি-হাউসের নিচে দাঁড়িয়ে রইল। তার পর পা দুখানা আপনা থেকেই মিছিলের সাথে চলতে লাগল। এগোতে এগোতে দেখে, জরগুল খাঁ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
: ‘এই জরগুল, ওখানে কী দেখছিস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? এইমাত্র এদিক থেকে তিন গাড়ি পুলিশ গেছে। সামনে গুলি চলবে। তাদের কাছে বন্দুক আছে।’
ওরা দু জন জোরে হেঁটে এলফিনস্টোন স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে চলল।
এলফিনস্টোন স্ট্রিটে খুব গণ্ডগোল হচ্ছিল। পুলিশ মিছিল ছত্রভঙ্গ করার জোর চেষ্টা করছিল। আর, ছেলেরা চাইছিল এগিয়ে যেতে। পুলিশ পনেরো-বিশজন ছেলেকে গ্রেফতার করল। ছেলেরা আরও জ্বলে উঠল। আকাশ-বাতাস ‘মুর্দাবাদ’ ধ্বনিতে ভরে গেল। ইতোমধ্যে বন্দুক ছোঁড়ার আওয়াজ এল।
মকরানি চিৎকার করে উঠল, ‘ওই জরগুল, পালা! গুলি চলছে!’
কিন্তু জরগুল খাঁ মকরানির হাতখানা শক্ত করে ধরে ফেলে এগিয়ে যেতে লাগল।
এলফিনস্টোন স্ট্রিটে হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেল। ছেলেরা দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়ল আর গলির মধ্যে পালাতে শুরু করল। শুধু একটাই আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, ‘পানি, পানি!’ দোকানের কলসি খালি হয়ে গেল। হোটেলের চাকররা গেলাস ভরে ভরে ছেলেদের পানি দিতে লাগল। ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা রুমাল ভিজিয়ে ছেলেদের দিকে ছুঁড়ে দিল। ক্যাপিটাল সিনেমার সামনে আখঅলার পুরা পানির বালতি যখন খালি হয়ে গেল, তখন ছেলেরা রুমাল আর কাপড় আখের রসে ভিজিয়ে নিতে শুরু করল। কিন্তু কেউ আখ নিল না। তারা চোখ রগড়াচ্ছে, হাসছে আর ভেজা রুমাল চোখে ধরছে।
এলফিনস্টোন স্টিট চোখের পানি আর কাঁদুনে গ্যাসের ধোঁয়ায় ছেয়ে গিয়েছিল। হাওয়া একটু পরিষ্কার হলে ছেলেরা রাস্তায় বেরিয়ে আবার ‘মুর্দাবাদ’ ধ্বনি দিতে লাগল। মিছিলও আবার চলতে শুরু করল। পুলিশ কিছুক্ষণ পর আবার গ্যাস ছাড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে লাঠিও চালাল। কারও মাথা ফাটল, কারও আঙুল ভাঙল, কারও পায়ে লাঠি পড়ল, কারও-বা কোমরে চোট লাগল। ছেলেদের কাপড় রক্তে ভরে গেল। তারা গলির ভেতর পালাতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল, আবার যানবাহন চলাচল শুরু হল।
.
হোটেলে হাসান লালা বন্ধুদের বলল, ‘এ কেমন জোয়ান? ভয়ে পালিয়ে যায়! আমাদের এদিকে এরকম অত্যাচার করলে শালাদের মাথা ফাটিয়ে দিতাম আমরা।’
মকরানি ঠাট্টা করে বলল, ‘অই জন্যেই তো তুমি গলির মধ্যে পালিয়ে ছিলে।’ হাসান খাঁ গর্বভরে বলল, ‘আমি হলাম পাঠান, পাঠান! আমরা ইংরেজের কাছে কখনও মাথা নিচু করিনি।’
জুম্মন বিড়বিড় করে বলল, ‘খুব অত্যাচার হচ্ছে। ছেলেদের লাঠি দিয়ে তাড়া করছে। শালাদের কি লজ্জা নেই?’
