অনুবাদ : কাজী মাসুম
একটি সত্যি গল্প – রিয়াজ রউফি
তার নাম কেউ জানে না। তবে নিজেদের সুবিধের জন্যে অনেকে অনেক নাম তার রেখেছে। এবং যখন যা-খুশি তাই বলে ওরা ডাকে। জুম্মন বাবুর্চি তার কদর সবচেয়ে বেশি বোঝে। সে তাকে সবসময় ‘আবে ও হারামি’ বলে ডাকে। হোটেলের মালিকের পাকা চুল-দাড়িঅলা বাবা তাকে ‘চাচাজি’ বলেন। আর মালিক বড় সাহেব ডাকেন ‘মকরানি’ বলে।
এই হোটেলে কয়েকজন বাঁধা খদ্দের এসে বসে প্রত্যেক দিন। তারা বারবার সিঙ্গেল চা খায়, খবরের কাগজ পড়ে, আর নিজেদের জীবনের বিরক্তিকর দৈনন্দিন সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে। এই দলে রয়েছে দিল্লির মোহাজের কাপড়অলা, যার কেবিনগুলো হোটেলের একটা পাশ ঘিরে রয়েছে। আছেন মুনশিজি, যিনি পোস্ট অফিসের সামনে বসে কার্ড আর টিকিট বিক্রি করেন এবং লোকের চিঠি লিখে দেন। রয়েছেন মির্জাজি, যিনি ‘সিলভারের নিচে তৃতীয় শ্রেণির বই বিক্রি করেন। আর রয়েছে এক পাঠান চৌকিদার, সে বড় বড় দোকান, হোটেল আর সিনেমাঘরে রাত্রে পাহারা দেয়। এ দলটি হোটেলে আসে সস্তা খাবার খেতে, আর ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে কল্পনার বেলুন ওড়াতে। এদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এরা তাকে আদর করে ‘আবে ও হারামি’ বলে ডাকে।
দিল্লির দলটি হল যারা দিনে দু-একবার চা খেতে বা গল্পগুজব করতে আসে, তাদের। এই দলে হরেকরকম পেশার লোক দেখা যায়। প্যারিসিয়ান কাফের সামনে লা-লা-লা-লা শব্দ করে নকল দাড়ি-গোঁফ বিক্রি করে যে লোকটি, কফি-হাউসের সামনে যে একপয়সায় ওজন বলে দেয়, কাঠের হ্যাঁঙ্গারে ঝুলিয়ে যে-লোকটা আমেরিকান নেকটাই আর জাপানি রুমাল বেচে, হরেক মাল ইধার দোআনা উধার চার-আনাঅলা, বুট-পালিশ ও গা-মালিশঅলা, চানাচুর-বাদাম- তিলেখাজা-গজাঅলা, প্যারাডাইসের সামনে যে রঙিন মোড়ক দিয়ে ফল আর চকোলেট বিক্রি করে, কাফে ইরমের পিঠা-পকৌড়িঅলা, ক্যাপিটালের গলির আখঅলা, বাসস্ট্যান্ডে একআনা দরে দুটি সান্ধ্য ইংরেজি দৈনিক বিক্রি করে যে হকারটি, ফেরদৌসের সামনের পান-বিড়িঅলা, কাগজের খেলনাঅলা, অন্ধ হাফেজ– যে রোজ সন্ধ্যায় এলফিনস্টোন স্ট্রিট, প্রেডি স্ট্রিট, ভিক্টোরিয়া রোড এবং ক্লার্ক স্ট্রিটে সকলকে কোরান শরিফ শুনিয়ে শুনিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ‘প্রাইড অব পাকিস্তান’ রিকশাঅলা এবং এইরকম ছোট ছোট পেশার লোক রয়েছে এই দলে। এরা তার কাছে বিশেষ ভদ্রতা দেখায় না এবং তাকে ‘মকরানি’ বলেই ডাকে।
মকরানি আজ দু-বৎসর এই হোটেলে কাজ করছে। সে গোটা জাতের মকরানি। তার সাক্ষী তার দেহের মজবুত গড়ন এবং ছোট ছোট কোঁকড়ানো চুল। সে খুব পরিশ্রমী, সকাল পাঁচটা থেকে রাত একটা পর্যন্ত কাজে ব্যস্ত থাকে। সিনেমার সমস্ত গান তার মুখস্থ। চা-দেওয়া আর বাসন-ধোয়ার সময় তার মুখে নতুন গানের গুনগুনানির তালে তালে তার শিরায় শিরায় যেন নাচন জেগে ওঠে। জুম্মন বলে, ‘মকরানি খুব ভালো সিন্ধি নাচ জানে।’ কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ তার নাচ দেখবার জন্যে ফরমাশ করেনি।
লোকের কথা শুনে তখনি তার ওপর টিপ্পনী দেওয়ার রোগ আছে মকরানির। সে অসীম গাম্ভীর্য সহকারে একেবারে নিশ্চুপ থেকে কথাবার্তা শোনে। তার পর হঠাৎ একটা খাপছাড়া কথা বলে ফেলে। লোকে রেগে উঠে তাকে ধমক মারে আর গালাগালি দেয়, আর সে মুচকি হেসে গুনগুন করে কোনও একটা সিনেমার গান গাইতে গাইতে নিতান্তই ঔদাসীন্যভরে কাজে মশগুল হয়ে যায়।
এই হোটেলটা সবচেয়ে সুন্দর এলাকায়। এই এলাকায় সন্ধ্যাবেলা সুবেশ লোকের ভিড়ের চোটে পথচলা মুশকিল হয়ে ওঠে। কিন্তু সে জনতার দৃষ্টি এই হোটেল পর্যন্ত এসে পৌঁছয় না। কারণ, এলাকার বড় বড় আলিশান বাড়িগুলো হোটেলটাকে আড়াল করে রেখেছে; ভিক্টোরিয়া রোডের নতুন তৈরি কাপড়ের কেবিনগুলোর মাঝখান থেকে একটা ছোট্ট গলি বেরিয়ে এই হোটেল পর্যন্ত গেছে। হোটেলের কোনও নাম নেই। গলির মধ্যেকার হোটেলের ভালো নাম রাখা এবং সুন্দর সাইনবোর্ড টাঙানো একদম নিরর্থক– মালিক একথা বোঝেন। ‘৪৮ সালে একজন মালাবারি হোটেলটা তৈরি করেছিল– সেই থেকে আশেপাশে মালাবারি হোটেল নামেই এর পরিচয়, যদিও ইতোমধ্যে কয়েকবার এর মালিক বদল হয়েছে।
পনেরো বর্গফুট জমির উপর কাঠের খুঁটির মাথায় চিড়ের ছাদ দেওয়া এই ঘরটি। দেয়াল কাঠেরই। তার গায়ে মকরানি আর তার বন্ধুরা সিনেমা-তারকা ও আমেরিকান ম্যাগাজিন থেকে অর্ধ-উলঙ্গ মেয়েদের ছবি কেটে লাগিয়ে দিয়েছে।
চাচাজি একটা ছোট চৌকির উপর ময়লা গদি পেতে সামনে কাঠের ক্যাশবাক্স নিয়ে পয়সা উশুল করেন ও মোটা কাঁচের চশমা লাগিয়ে সারাদিন উর্দু খবরের কাগজ পড়েন।
জুম্মন বাবুর্চি এবং মকরানি ছাড়াও এই হোটেলে আরও চাকর-বাকর রয়েছে। শরফু জুম্মনকে সাহায্য করে। তার কাজ হল আটা-মাখা আর রুটি-বানানো। খাবার আর চা দেওয়ার জন্যে মকরানি ছাড়াও বশির নামে একটা ছেলে আছে। আর আছে ষোলো-সতেরো বছরের পাঠান ছেলে জরগুল খাঁ। সে ঠেলাগাড়ি করে চা দিয়ে বেড়ায়।
সেদিন সকালে প্যারাডাইসের চাকর জ্যাকিকে ধরে এনেছিল। সিনেমার টিকেট ব্ল্যাক করবার কাজে জ্যাকির হাত পাকা। আগের রাত্রে তারা অনেক টাকা আয় করেছিল। কিন্তু ভাগ-বাঁটোয়ারার সময় ঝগড়া বেধে গেল। হাসান খাঁ আর মাহমুদ খাঁ পাঠান মীমাংসা করে দিতে চাইছিল। এমন সময় বাইরে থেকে জরগুল খাঁ জোরে জোরে পা ফেলে মকরানির পাশে এসে বসে পড়ল। মকরানি পানির ড্রামের কাছে বসে পেয়ালা ধুচ্ছিল। জরগুল মৃদু হেসে মকরানিকে একটা মজার খবর শোনাল। মকরানি এবার অত্যন্ত অধীর হয়ে উঠল, এই খবর সবার আগে কাকে কাকে শোনানো যায়। জুম্মন বাবুর্চির কাছে গিয়ে রহস্যজনকভাবে মুচকি হেসে বলল, ‘ওস্তাদ, শুনেছ কিছু? খুব গণ্ডগোল বেধেছে। বিস্ রোডে হাঙ্গামা হয়েছে।’
