.
মাস পয়লায় সবাই মাইনে নিয়ে চলে গেল –ম্যানেজার সুধাকে থাকতে বলল। সুধা ম্যানেজারের ঘরে গেলে ম্যানেজার তাকে একটা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল। তার পর ড্রয়ার খুলে হুইস্কির বোতল খুলে বড় একটা পেগ এক নিঃশ্বাসে সাবাড় করল। সুধা তখন রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার জন্যে উঠল ম্যানেজার তার হাত ধরে বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘রাগ কোরো না। তোমার প্রমোশনের ফাইল আমার টেবিলে আছে। আর আমি জানতে পারলাম যে তুমি এখানকার পুরনো লোক। তোমার নাম তো সুধা, তাই না?’ ম্যানেজার এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল।
সুধা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে তার দিকে তাকাল। এতদিন কাজ করছে, তবু আমার নাম জানে না! ম্যানেজার আরেকটা পেগ চড়িয়ে বলল, ‘মানে আমি বলছি যে তোমার বাপের নাম জীবনরাম নয়?’
‘হ্যাঁ, তাই। সে তো অফিস-ফাইলেই লেখা আছে। তা আবার জিগ্যেস করে কী লাভ?’ সে আবার উঠতে গেল।
‘বসো বসো।’ ম্যানেজার মিনতির সুরে বলল, ‘তুমি আমাকে চিনতে পারলে না?’ ম্যানেজার সোজাসুজি তার দিকে তাকিয়ে বলল।
‘না!’ সে রাগের সঙ্গে বলল।
‘তোমরা জিন্দান মহল্লায় থাকতে?’
‘হ্যাঁ।’
‘একদিন আমি তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তোমার সঙ্গে কথাও বলেছিলাম। সেদিন তুমি একটা সাধারণ মেয়ে ছিলে। আজ তুমি একজন মহীয়সী নারী হয়েছ। আমি তোমায় দেখতে গিয়েছিলাম। তখনই তোমার সঙ্গে কথা বলেছিলাম।’ ম্যানেজার বলল।
‘কবে? সে কবে?’ সুধা অস্থিরভাবে প্রশ্ন করল।
বুড়ো ম্যানেজার সুধার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার নাম মোতি।’
সুধার দেহ অবশ হয়ে গেল।
‘আমি খুবই হতভাগা। তাই তোমাকে বিয়ে করিনি। আমি তোমাকে ভালো করে দেখিনি। বুঝিওনি। আর সামান্য সময়ে লোকে কীই-বা জানতে পারে? সৌন্দর্য তো চামড়ার নিচে লুকিয়ে থাকে। আমি যুবক ছিলাম। তাই ফর্সা রঙ আর সম্পদের সন্ধান করতাম। আমি যে স্ত্রী পেলাম– সে ফর্সাও ছিল, সম্পদও এনেছিল আর সেইসঙ্গে এনেছিল অহংকার, নিষ্ঠুরতা, অবাধ্যতা। কয়েক বছরেই আমার পাঁচটি সন্তান জন্মাল। তার কটি যে আমার তা জানিনে। কিন্তু লোকে নানা কথা বলত! আমি শুনতাম আর বারনারী সন্ধানে যেতাম। তার পর আমার সারাদেহে নিষ্ঠুরতা, মদ্যপান, কুৎসিত রোগ ও ব্যর্থতার গ্লানি ফুটে উঠল। তাই বয়স না-হতেই আমি বৃদ্ধ হলাম– নিভে গেলাম। সে এখন মরে গেছে। তাই তার কথা বলে লাভ নেই। আর বলবই-বা কী! দোষ তো আমার। এই চোখ তোমাকে চিনতে পারেনি আমার এই চোখ হীরেকে পাথর মনে করে ফেলে দিয়েছিল। তুমি কি আমাকে কোনও প্রকারেই ক্ষমা করতে পারো না? তুমি কি… তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে পারো না? আমার বয়েস তো তত বেশি নয়। সারাজীবন আমি ভালোবাসা পাইনি। তাই জীবনভর ছটফট করে বেড়িয়েছি।’
.
ম্যানেজার বলছিল আর সুধা বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। একবার তার মনে হল, সে মোতিকে বলবে– এতদিনে তোমার সময় হল আসবার– কুৎসিত, টেকোমাথা বৃদ্ধের রূপ নিয়ে। আর বিপজ্জনক রোগ নিয়ে। এখন তুমি আমাকে বিয়ের কথা বলছ? কিন্তু আমি তো সমস্ত জীবনটাই তোমাকে উৎসর্গ করেছিলাম। তুমি জানো না যে সারাটা যৌবন শুধু তোমার ধ্যানেই অতীত হয়েছে। তোমার চিন্তায়ই জীবনের সবগুলো বসন্ত কাটিয়েছি। যৌবনেরও প্রতিটি আবেগ তোমার একবার প্রেমপূর্ণ চাহনির বদলে বিকিয়ে দিয়েছি। তোমার ছায়াকে অবলম্বন করে সারাটা জীবন একা একা পথ চলেছি। অন্ধকার পার্কে তোমার ধ্যান করেছি একা একা বসে। নিজের পয়সা খরচ করে আমি তোমার কাছ থেকে শাড়ি উপহার নিয়েছি। তোমার দেওয়া গয়না পরেছি– সিনেমা দেখেছি পাশের সিট খালি রেখে। আমার বাপ মারা গেছে, মা মারা গেছে, আমার গর্ভাশয়ের সন্তান দূর থেকেই আমাকে ডাকত কিন্তু আমি কারওর কাছে যাইনি! তোমার ধ্যান করেছি– চল্লিশ বছরের কৌমার্য পালন করে– চোখ, কান ও মুখ বন্ধ করে। আমি কত সুখী ছিলাম– কত মগ্ন ছিলাম ধ্যানে। আমি তোমার কাছ থেকে কিছু চাইনি। বিয়ের চাপও দিইনি। সোহাগরাত পালনের প্রত্যাশাও করিনি। চাইনি একটি নিষ্পাপ শিশুর নির্মল হাসি। শুধু একটা কল্পনা, একটা জ্যোতি, একটা প্রতিবিম্ব– এটাই তোমার কাছ থেকে ধার নিয়েছিলাম। আজ সেটাও তুমি নরকের আগুনে পোড়াতে এখানে এসে পড়েছ!
কিন্তু সুধা এসবের কিছুই বলতে পারল না। টেবিলে মাথা রেখে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ল। মোতি তার হাত ধরতে গেলে সে রাগে তার হাত সরিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। মোতি যতই তাকে নিষেধ করল, সে কিছুই শুনতে চাইল না। রাস্তায় অন্ধকার নেমেছে। তবু বিদ্যুতের আলোয় তার চোখের পানি চিকচিক করতে লাগল। কিন্তু সে এসব গ্রাহ্যেই আনল না। কাঁদতে কাঁদতেই সে পথ বেয়ে চলল। আসিফ আলি পার্কের কাছে এসে সে থমকে দাঁড়াল। হঠাৎ তার মনে হল পার্কের ভেতরে গিয়ে সে একটা গাছে ঠেস দিয়ে বসবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে করল, এসব নিরর্থক– আমার কল্পনার রাজকুমার আর আসবে না সেখানে! সে আর কোনওদিনই আসবে না!
একথা মনে করেই সে তার সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলল। মাথার টিপও মুছে ফেলল এবং পার্কের রেলিঙে ঘা দিয়ে হাতের চুড়িগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে জোরে জোরে ভেঙে ফেলল। কারণ তার বদ্ধমূল ধারণা যে সে এবার বিধবা হয়ে গেছে।
