সুধার বয়স চল্লিশ হল। সেই সন্ধ্যার কথা সুধা ভুলতে পারছে না। সুধা মোতিকে নিয়ে মথুরা রোডে জাপানি গার্ডেনে গেছে। এটা বাগানের চেয়ে নৈসর্গিক উদ্যান বলে ভ্রম হয়। গোধূলি লজ্জাবতী কুমারীর মতো মুখ লুকিয়েছে। রাত তার শ্যামল আঁচল বিছিয়ে দিয়েছে। আকাশে তারার মেলা। সুধা আজ একেবারে মৌন হয়ে আছে। মোতিও নীরব।
মোতি এখনও তেমনি সুন্দর– যেমন যৌবনে ছিল সে। আজও সে নিত্যকার মতো সেই ব্রাউন স্যুট পরে আসে। তাকে দেখে মনে হয় মোতির জীবনে আসেনি কোনও পরিবর্তন– একমাত্র তার কানের পাশের চুলগুলোতে একটু সাদা ছোপ লাগা ছাড়া। আগের মতোই সে সুন্দর, আকর্ষণীয় আর সহৃদয় ছিল– যাকে দেখামাত্রই সুধার বুকে স্পন্দন শুরু হত। যেমন সেই প্রথমদিনে হয়েছিল।
.
মোতি তাকে বলল, ‘তুমি আমাকে বিয়ে করলে না কেন?’
‘একবার অস্বীকার করবার পর’, সুধা আস্তে আস্তে বলল, ‘তোমাকে বিয়ে করা যেত না– শুধু প্রেম করা যেত। তুমি জানবে কী করে যে যখনই তুমি অমত করলে তখন থেকেই তুমি আমার হয়ে গেলে আর এটা জানতে হলে নারীর মন দরকার।’
‘তুমি চল্লিশ বছরের হয়ে গেলে –এজন্যে দুঃখ হয় না যে তুমি আমাকে বিয়ে করলে না…?’
একথা শুনে সুধাও নীরব হল। দীর্ঘ নীরবতার পর মোতির হয়তো মনে হল, সুধা মনে-মনে কাঁদছে।
সে আস্তে করে ঘাড় দুলিয়ে ডাকল, ‘সুধা!’
সুধাও তেমনি আস্তে বলল, ‘আমি ভাবছিলাম যে তোমাকে বিয়ে না করে আমি কী হারালাম। এমন কোনও সন্ধ্যা তোমায় বিনা কাটিয়েছি কি? মনে করো তো, কোথায় কোথায় না-ঘুরেছি তোমার সঙ্গে? যেখানেই তোমাকে ডেকেছি, সেখানেই তো তুমি হাজির হয়েছ আর যখনই ডেকেছি তখনই কাজকাম ছেড়ে তুমি কি আসতে বাধ্য হওনি? বিয়ের মানে যদি সঙ্গলাভ হয়, তা তো আমি পেয়েছি।’
আবার একটু চিন্তা করে বলল, ‘এই দীর্ঘ সঙ্গলাভে কোনওদিনই তোমার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়নি। বরাবর তোমাকে সেই হাসিমুখেই আমি দেখেছি। বছরের-পর-বছর ধরে তোমার হাতকে আবশ্যক হলেই আমার হাতের মুঠোয় পেয়েছি, তার স্পর্শের উষ্ণতা আমার দেহের প্রতি রোমকূপে অনুভূত হয়েছে। তোমার দেওয়া ফুল আমার খোঁপায় শোভা পেয়েছে। তোমার চুম্বন আমার ওষ্ঠে লেগেছে। তোমার একনিষ্ঠতা আমার অন্তর ভরে দিয়েছে। কোনও মেয়ে প্রেমের বদলে এর চেয়ে বেশি কী পেতে পারে, তুমিই বলো?’
সুধা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে সারাদেহ এলিয়ে দিল মোতির বাহুতে। মনে হল, মোতির দু বাহু নয়– চারটি অথবা আটটি– আর সে তার দেহ ও মন দিয়ে অনুভব করল তার উষ্ণতা, সে বাহুলতাকে আকর্ষণ করে তাকে বক্ষলগ্ন করল। সুধা তার সমস্ত সত্তা সেই বাহুবন্ধনে সমর্পণ করে দিল। যেমন চাঁদের আলোয় ফুলের কলি ফোঁটার জন্যে উন্মুখ হয়ে ওঠে– তার দেহও যেন মোতিকে গ্রহণ করার জন্যে তেমনি উন্মুখ হয়ে উঠল। মিটমিটে তারার আলোয় গাছের সবুজ পাতার ঝালরের মাঝখান দিয়ে চাঁদ উঁকি দিল।
চাঁদের আলো তার চুলে, চোখে, ঠোঁটে ও মুখে এসে পড়ল– আর জোছনার লহর যেন তার রক্তে তরঙ্গ তুলল। হায় আমার মোতি– মোতিহার-মোতিচুর- আমার মিষ্টান্ন– আমি তো তোমারই–
একটু পরে যখন সুধা চোখ মেলে তাকাল তখন তার চোখের ঔজ্জ্বল্য ও মদির ভাব দেখে মনে হল মোতি এখনই তাকে ভালোবাসা জানিয়ে গেল।
সেই সন্ধ্যা– সেই রাত –সুধার কাছে ভুলবার নয়। কারণ সে রাতেই সে-পূর্ণতা লাভ করে। এবং তাদের ভয়ের জীবনও পরিপূর্ণ হয়। যেমন সময়, বয়স, চাঁদের আলো ও আবেগ এক বৃন্তে এসে উপনীত হয় এবং আবেগের একটা কণাও যেন ছিটকে বাইরে না-যেতে পারে। এমন মুহূর্ত মানুষের জীবনে কখন কীভাবে আসে, কারই-বা আসে– আর এলেও সে তার প্রভাব রেখে যায়– যা শুধু অনুভবই করা যায়। মনে হয়– এই মুহূর্তটুকুর জন্যেই আমি বেঁচে ছিলাম এতকাল। সম্ভবত সুধাও এ মুহূর্তে তাই অনুভব করল– আর কখনও এমনভাবে অনুভব করেনি সে।
.
এর কয়েকদিন পরই সুধার অফিসের ম্যানেজার বদলি হয়ে গেল– আর তার জায়গায় যে এল তাকে সুধা মোটেও সহ্য করতে পারছিল না। একে তো লোকটা কুৎসিত দর্শন– এককালে হয়তো তার রঙটা ফর্সাই ছিল কিন্তু এখন তো পোড়া তামার মতো হয়েছে। আর নাকটা কী মোটা! তার ওপর অতিরিক্ত মদ খাওয়ার দরুন সেই নাকের ওপর রগগুলো নীল সুতোর জাল বুনেছে। তার নাক দেখেই সুধার মনে হয়, এটা নাক নয়– এটা বড় ডুমুর– হয়তো কথা বলতে বলতে এখনই ফেটে যাবে। থুতনি আর চিবুকের চামড়া ঝুলে পড়েছে। চোখের চারপাশে কালি-লেপা। মাথার চুল ঝরে গেছে। আর কথা বলতে গেলে মনে হয়, যেমন কোনও বুড়ো ব্যাঙ শ্যাওলা-ধরা পুকুরের মাঝে নড়াচড়া করছে। দারুণ ঘৃণা হয় তাকে দেখলে। আরও মুশকিল হল সুধার, এতদিন কাজ করতে করতে সে এখন হেড-স্টেনো হয়ে গেছে। তাকে সবসময়ই থাকতে হয় ম্যানেজারের ঘরে। তার চেয়েও বিপদ হল, এই কুৎসিত চেহারার লোকটাকে সে আরও যেন কোথায় দেখেছে– চেহারাটা চেনা-চেনা। কিন্তু কোথায়? স্মৃতির ওপর জোর দিয়েও সে মনে করতে পারে না।
নিজের মনেও সে ভাবে, এই মড়াটাকে সে হয়তো কনাট প্লেসে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। কিন্তু যখনই সেই ম্যানেজার ফাইলটা তুলে নিয়ে সুধার টেবিলে রেখে হাত দোলায় তখন সুধার মন চঞ্চল হয়ে পড়ে। সে চিন্তা করে, লোকটা কে? কে এমন করে চলাফেরা করত? আমার মৃত পিতা? অথবা কোনও ভাই? যার কথা আমার মনে পড়ে! চিন্তা করে সে কূল পায় না। পরক্ষণেই নিজের কাজে মন দেয়। কিন্তু সারাদিন মন জ্বলতে থাকে।
