‘বসন্ত’ সিনেমার বাইরে প্রচণ্ড ভিড়। সুধা দুটো টিকেট কিনল। এক প্যাকেট কিশমিশ আর বাদামও কিনল। ছবি দেখার সময় তার কিছু খাওয়ার অভ্যাস আছে। পৌনে ছ’টা বাজল। ক্রমে ছ’টা বাজল। প্রথম শো’র দর্শকরা বেরিয়ে গেল। দ্বিতীয় শো’র দর্শকরা হলে ঢুকল। চারদিকে আলো জ্বলছে। আর দারুণ ভিড়। ফেরিঅলা, রিকশা-টাঙ্গাঅলাদের হাঙ্গামা। মোতি আবার ভিড় ভালোবাসে না। হইচই পছন্দ করে না। সুধা তার মেজাজ চিনে নিয়েছে। সে চায় নীরবতা, অন্ধকার আর একাকিত্ব। মোতি খুবই ভাবপ্রবণ আর রুচিবান।
সোয়া ছ’টায় সে সিনেমাহলে গিয়ে বসল। পাশের সিটের উপর রুমাল রাখল। কিশমিশ ও বাদামের প্যাকেটও শেষ হয়ে চলল। কিন্তু মোতি এল না। তার পর হলের আলো নিভে যেই ছবি শুরু হল, তখনই সুধা অনুভব করল, মোতি তার হাত দিয়ে সুধার হাত ধরেছে। অন্ধকারে নিঃশব্দে সে সুধার পাশে এসে বসেছে। সুধা তার হাতে চাপ দিয়ে বলল, ‘অনেক দেরি করেছ।’
‘সরি!’ মোতির কণ্ঠ বেদনার্ত।
‘তোমার জন্যে বাদাম আর কিশমিশ এনেছি। খাও।’
মোতি কয়েকটা বাদাম ও কিশমিশ হাতে নিয়ে মুখে পুরল। সুধা এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে ছবি দেখতে লাগল। এখন আর কথা বলার সুযোগ ছিল না। তবে অনুভব করছিল, মোতি তার হাত ধরে আছে। আর কখনও কখনও সে মোতির কাঁধে মাথা রেখে মনকে শান্ত করছে।
মোতি তার কানে কানে বলে, ‘আমার কাঁধে মাথা রেখে তুমি কী দেখছ? ছবি তো দেখা যায় না!’
‘যে-ছবি আমি দেখতে পাই, তা আর কারওর নজরে আসে না।’ সুধা আন্তরিকতার সঙ্গে বলল।
.
ধীরে ধীরে সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করল যে সুধার মলিন চোখদুটো ক্রমেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভুরুতে কাজল পরলে সে চোখ আরও ধারালো হয়ে যায় তলোয়ারের মতো। বুকের মাংসও ফুলে উঠল, কোমর সরু হতে লাগল আর গতিতে এল অনিন্দ্য ছন্দ। দিনে দিনে তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতে লাগল। কাপড় যদিও কম দামের ছিল, কিন্তু তা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং দক্ষ দরজির মতো সেলাই-করা। ভালো দরজি দিয়ে কাপড় তৈরি তো তার সাধ্যের বাইরে ছিল– কিন্তু সে নিজেই এ বিদ্যায় নৈপুণ্য অর্জন করল। তাই দেখা যেত, নতুন ডিজাইনের জামা সে প্রতিদিন পরত –যা অন্য কোনও মেয়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এগুলো সে নিজেই তৈরি করেছে এমন কথা সে কোনও মেয়েকে বলত না। তার অফিসের কোনও মেয়ে জিগ্যেস করলে সে এমন এক দরজির নাম বলত, যেখানে বড়লোক ছাড়া আর কারও পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। অফিসের মেয়েরা একথা শুনে মনে-মনে জ্বালা অনুভব করত। তারা কখনও সুধাকে জিগ্যেস করে, ‘তোর স্বামী কেমন রে?’
‘খুব গোরা রঙ, কোঁকড়া চুল, হাসলে যেন মুক্তো ঝরে।’ সুধা জওয়াব দেয়।
‘কত মাইনে পায় সে?’
‘বারোশো।’
‘বারোশো!’ মেয়েরা বিস্মিত হয়। ‘বারোশো তো আমাদের ফার্মের ম্যানেজার পেয়ে থাকে।
‘সে-ও একটা ফার্মের ম্যানেজার।’ সুধা জওয়াব দেয়।
‘একদিন দেখাবি? আমরা দেখব, কেমন তোর…’
‘তা দেখাব-না কেন? বলিস তো অফিসেই একদিন ডেকে দেখিয়ে দিই।’
এটা তার কথার কথা। সুধা মোতিকে দেখাবার পাত্রীই নয়। মরে গেলেও সে তার মোতিকে দেখাবে না। এসব মেয়েদের বিশ্বাস কী… কিন্তু তা সত্ত্বেও সুধা এমন আত্মনির্ভরতার সঙ্গে অফিসে ডেকে আনার কথা বলে যাতে মেয়েরা আর সাহসই করে না উচ্চবাচ্য করতে। তারা মনে-মনেই বলতে থাকে।
.
সুধার বাপ মনের জ্বালায় ভুগে মরে। কারণ সুধা বিয়ে করল না। পাড়ার লোকে নানা কথা বলে। সে মেয়েকে কিছু বলতেও পারে না। সুধা বড় হয়ে গেছে। তার ব্যক্তিত্ব আছে, তাছাড়া মাসে মাসে দুশো টাকা ঘরে আনে। অবশেষে সুধার বাপ মারা গেল। বাপ মারা যাওয়ার পর তার ভাইয়েরা বিয়ে করে নিজেদের পছন্দমতো ঘর বাঁধতে দূরে দূরে চলে গেল। তার পর তার ছোটবোনেরও বিয়ে হল। সুধার মা তার বড়মেয়ের অবস্থা দেখে আস্তে আস্তে রুগ্ণ হয়ে পড়ল এবং অল্পদিনের মধ্যে সে-ও মারা গেল। আর দুনিয়ার তাবৎ দুঃখ নিয়ে সুধা একাই রয়ে গেল।
শেষে একদিন সে পুরনো বাড়ি ছেড়ে সিভিল লাইনে দোতলা বাড়ির দু-কামরাঅলা একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতে লাগল। বাড়িতে আসা-যাওয়ার পথটাও আলাদা ছিল। অতএব এ ব্যাপার সে স্বাধীন ছিল।
এখন তার বয়েস পঁয়ত্রিশ হয়ে গেছে। কিন্তু তাকে অত বয়েসি বলে মনে হয় না। তার ঠোঁটে সদা হাসি লেগেই আছে। চোখে আনন্দের ঝিলিক। তা সত্ত্বেও তাকে দেখা যেত অত্যন্ত ভারিক্কি মেজাজের ব্যক্তিত্বশালিনী মহিলার মতো। এ সময়ের মধ্যে সে বি.এ. পাস করেছে। আর আছে তার বইপড়ার শখ। এখন সে সচ্ছল, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করে।
কয়েক বছর আগে থেকেই সে সিঁথিতে সিঁদুর পরত আর কপালে দিত সোহাগিনীর টিপ। কিন্তু কেউ জানত না কোথায় এবং কার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। তবে লোকে জানত একটা-কিছু হয়তো আছে। যার সঙ্গে সে সন্ধ্যা অতিবাহিত করে– এটাও জানত, হয়তো এমন কোনও কারণ আছে, যাতে তাদের বিয়ে হয়নি। তবে প্রতি সন্ধ্যায় তারা মিলিত হয়। আর যখন সবাই ঘুমিয়ে যায় কেউ কাউকে দেখতে পায় না– যখন সকলের চোখে ঘুম নেমে আসে সেই তন্দ্রাভরা মুহূর্তে কে যেন নিঃশব্দে এসে সুধার দরজার কড়া ধীরে ধীরে নাড়ে– এবং চুপিসারে ঘরে ঢুকে পড়ে। কেউ তাকে দেখেনি, তবু তারা সুধাকে কিছু বলত না, কারণ সুধা গম্ভীর প্রকৃতির ভদ্রমহিলা। তার মাথায় সিঁদুরের টিপ জ্বলজ্বল করছে। তাকে কোনও কথা বলবেই-বা কী করে!
