সুধা আস্তে মাথা নাড়ল। তার চোখে পানি।
‘খুব খারাপ লাগছিল, তাই-না?’
সুধা আবারও মাথা নেড়ে সায় দিল। এবার তার চোখের পানি গাল বেয়ে পড়তে লাগল। সে কাঁদল…।
মোতি তার কোটের পকেট থেকে রুমাল বের করে সুধার চোখ মুছে বলল, ‘এতে কান্নার কী আছে! প্রত্যেক লোকেরই পছন্দ-অপছন্দের অধিকার আছে। তাই না?’
‘কিন্তু তুমি তো আমার কিছু দ্যাখোনি। আমার হাতের ফুলকো লুচি বা মটর-পোলাও তো খাওনি। তুমি কি আমার মনের ব্যথা বুঝবার চেষ্টা করেছিলে? আর সেই অনাগত শিশু– তোমাকে দেখামাত্রই যে আমার গর্ভাশয়ে স্পন্দিত হয়ে উঠেছিল? তুমি সেই হাতটাও দ্যাখোনি যে তোমার পা ধুইয়ে দিত– যে তোমার জামার বোতাম সেলাই করে দিত। তুমি আমার গায়ের রঙ দেখেই ভড়কে গেলে? সেই সুন্দর সোয়েটার –যেটা তোমার জন্যে বুনতাম তার রঙটার কথা চিন্তা করলে না? মোতি! তুমি আমার হাসি দ্যাখোনি, কান্নাও দ্যাখোনি, তোমার মাথার চুলে আমার আঙুলের স্পর্শও পাওনি। আমার কুমারী দেহকে তোমার সুডোল বাহুবন্ধনে কম্পিত হতেও দ্যাখোনি। তবে কী করে তুমি আমাকে অপছন্দ করলে?’
আরে বাপ… এত লম্বা বক্তৃতা সে অনায়াসে কীভাবে দিল! তার শুধু এটুকুই জানা ছিল যে সে কাঁদছে, আর তার মাথাটা মোতির কাঁধে ভর দেওয়া আছে। আর মোতি লজ্জায় মুখ নামিয়ে আস্তে আস্তে তার কাঁধে হাত বোলাচ্ছে।
.
সেদিন খুব দেরিতে সে বাড়ি ফিরল। মা জিগ্যেস করায় সে লাপরোয়াভাবে বলে দিল, ‘অফিসে দেরি হয়েছে।’ তার পর হাতের ব্যাগটা বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেলে বেশ ভারিক্কি গলায় খাবার চাইল। ফলে তার মা চমকে উঠল, এমনকি বাপও। আজ সুধার কান্নাভেজা চোখের অতলে যেন এক আনন্দের প্রবাহ চলছে– যেন নিবিড় মেঘমালায় অশনি সংকেত।
সুধার মা ঠোঁট কামড়ে তার স্বামীর দিকে বাঁকাচোখে তাকিয়ে রইল যেন সে অনেককিছু বুঝে ফেলেছে। জীবনরামও এক মুহূর্ত মেয়ের দিকে স্নেহাপ্লুত চোখে তাকিয়ে রইল। তার পর খাবারে মন দিল।
নিশ্চয়ই কোনও ব্যাপার আছে। আর যেহেতু সুধা নারী, তাই এই রহস্যের অন্তরালে কোনও পুরুষের অবস্থান অবশ্যম্ভাবী বলেই স্বামী-স্ত্রী আন্দাজ করে নিল।
কিছুদিন পরে সেই সন্দেহ আরও দৃঢ়তর হল। মঘি তার এক বান্ধবীকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়িতে এনেছিল মেয়ে দেখাতে। কিন্তু এবার ছেলেকে ‘না’ বলতে হল না– সুধাই বিয়ে করতে অস্বীকার করে বসল। তখন সুধার মা আরও চমকে উঠল– নিশ্চয়ই সুধার সঙ্গে কারও ব্যাপার-স্যাপার চলছে।
এবার সে মেয়ের জন্যে যৌতুক গোছাতে লাগল আর জীবনরাম হুঁক্কা টানতে টানতে চিন্তা করতে লাগল, কবে সেদিন আসবে যেদিন সুধা এসে তার মাকে খবরটা শোনাবে আর জীবনরাম ক্রোধান্ধ হয়ে সুধাকে ধমক দেবে, গালি দেবে– তোর এত সাহস! আমাদের লুকিয়ে নিজেই বর পছন্দ করেছিস! বাড়ি থেকে বের করে দেব– পিঠের চামড়া তুলে ফেলব। বংশের সুনাম নষ্ট করলি…! তার পর সে স্ত্রীর অনুরোধে শান্ত হয়ে হুঁক্কা টানতে টানতে জিগ্যেস করবে– কে সে? যেই হোক-না সে, সুধা বলা মাত্রই সে তার হাত বাড়িয়ে দেবে। পঁচিশ বছর হয়ে এল, আর কতদিন ঘরে রাখা যায়!
কিন্তু দিন যায়, মাস-বছর পেরিয়ে যায়, সুধা কিছুই বলে না। তারা অপেক্ষা করছে, কিন্তু পোড়ারমুখী কিছুই বলে না। অবশেষে শ্রান্ত হয়ে তারা আবার মেয়ের জন্যে বর খুঁজল, কিন্তু সুধার সেই একই কথা– বিয়ে করব না।
শেষ বরটা তার বাপ খুঁজে এনেছিল –সে হল একজন মিষ্টান্নবিক্রেতা। বয়েস চল্লিশ পেরিয়েছে।
সেদিন গোধূলির পরে আবছা অন্ধকারে গোলাপগন্ধী সন্ধ্যায় সুধা মোতিকে বলল, ‘ওরা আজ একজন বড়ো মিঠাইঅলাকে ধরে এনেছিল আমার জন্যে।’
‘তার পর?’ মোতি জিগ্যেস করল।
‘আমি সোজাসুজি বললাম বিয়ে করব না।’
‘আরে পাগলি, তা বললে কেন? বিয়ে করতে, আর সারাজীবন মিষ্টি-হালুয়া খেতে।’
‘আর তোমাকে ছেড়ে দিতাম?’ সুধা অভিমানভরা চোখে তাকাল মোতির দিকে। মোতি তার কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তো এখনও তোমাকে বিয়ে করিনি। ‘তাতে কী?’ সুধা মোতির মুখে মুখ লাগিয়ে বলল, ‘তুমি তো আমারই। বিয়ের চেয়েও বড়। সবসময় তুমি আমার আয়ত্তে আছ। যেন…’
মোতি হেসে বলল, ‘তা ঠিক। আমি সম্পূর্ণরূপে তোমার মুঠোয়। যখন ইচ্ছে, ডাকলেই চলে আসব।’
‘প্রথমদিকে তো এমন ছিলে না।’ সুধা মোতির চঞ্চল চোখে তাকিয়ে বলল, ‘তখন তো অনেক দেরি করে আসতে।’
‘প্রথমে তো এত গভীর ভালোবাসাও ছিল না। আর কারওর অন্তরকে বুঝতে তো সময়েরও প্রয়োজন আছে।’ মোতি সুধার কানে কানে বলল, আর সুধা আবেশে চোখ বন্ধ করল। পরে যেন তার মুখে মোতির তপ্ত শ্বাস ও চুম্বনের স্পর্শ অনুভূত হল।
‘কাল কোথায় দেখা করবে?’
‘তুমি যেখানে বলো, লাভার্স লেনে।’
‘উঁ হুঁ।
‘কোটলায় ঘোড়দৌড় হচ্ছে এখন।’
‘আমি কি ঘোড়া কিনব নাকি?’ সুধা হাসল।
‘ওল্ড হলে সাহিত্য সম্মেলন হবে।’
‘না, না!’ সুধা কানে হাত দিল।
মোতি চুপ করল এবার।
তার পর সুধা বলল, ‘কাল ছবি দেখব। ‘বসন্ত’ সিনেমায় খুব ভালো ছবি আছে। আমি দুটো টিকেট কিনব। ঠিক পোনে ছ’টায় তুমি এসো।’
‘টিকেট আমিই কিনব।
‘না, এ ছবি তো আমি দেখাচ্ছি। তুমি নাহয় আরেকটা দেখিও। আমি কি মানা করেছি?… কিন্তু ভুলো না। কাল সন্ধ্যা পৌনে ছ’টায় ‘বসন্ত’ সিনেমার সামনে।’
