‘তোমার বেলা তো এখনও কলেজে পড়ছে, তাই-না?’ সে তোতারামকে জিগ্যেস করল।
‘হ্যাঁ’, তোতারাম ঠিক তোতাপাখির মতোই ককিয়ে উঠল, ‘আগামী শীতে তার বিয়েও হয়ে যাচ্ছে।
‘ছেলের খোঁজ করেছ?’ জীবনরাম শুষ্ককণ্ঠে বলল।
‘হ্যাঁ’। তোতারাম এবার কোকিলের মতো বলে উঠল, ‘সে নিজেই খোঁজ করে নিয়েছে। একসঙ্গেই পড়ে। ছেলেটা অবস্থাপন্ন।’
তোতারাম যাওয়ার পর সে তোতারামের কণ্ঠস্বরকে ভেংচি কেটে বলল, ‘নিজেই বর খুঁজে নিয়েছে!’ তার পর মাটিতে থুতু ফেলে বলল, ‘হারামজাদা!’
দু বছর অতীত হল। আসিফ আলি রোডের একটা ফার্মে সুধা টাইপিস্ট। সে আগের চেয়ে আরও মৌন, ব্যক্তিত্বশালিনী ও পরিশ্রমী হয়েছে। সংসারের অবস্থাও ভালো হয়েছে আগের চেয়ে। কারণ সুধা মাসে একশো টাকার ওপর রোজগার করছে। অফিসের কাজের শেষে সে স্টেনোর কাজও শিখছে। বি.এ. পরীক্ষা দিতেও ইচ্ছুক সেইসঙ্গে। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য হওয়ায় জীবনরাম ও মঘি ।এবার জোরেশোরে সুধার জন্যে বর খুঁজতে শুরু করল। তারা সুধার রোজগার থেকে স্কুটারের জন্যে পয়সা জমাচ্ছে।
.
অনেক চেষ্টার পর জীবনরাম এক ছেলের বাপকে স্কুটারের লোভ দেখিয়ে আটকাতে সক্ষম হল। আনুষ্ঠানিক খরচ, বিয়ের মূল খরচ, যৌতুক, নগদ টাকা, গয়নাগাঁটি সবকিছু স্থির হওয়ার পর ছেলে তার ভাবী বধূকে দেখতে চাইল। ছেলেটির নাম মোতি। আর দেখতে-শুনতে মোতির (মুক্তো) মতোই সুন্দর ছিল।
যখন দেখতে এল তখন তার পরনে ছিল গাঢ় ব্রাউন রঙের স্যুট। সোনালি গায়ের রঙের ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল খুবই সুন্দর দেখাচ্ছিল। শার্টের আস্তিনের বাইরে তার সবল হাতদুটো দেখা যাচ্ছিল। সে যখন একটু হাসিমুখে সুধার দিকে তাকাল তখন সুধার মনে এতদিনকার জমাট বরফ যেন হঠাৎ গলে গেল। তার হাতের চায়ের কাপটা কেঁপে উঠল। অতিকষ্টে সে মোতিকে চা দিল।
মোতি চা খেয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে অতিশয় বিনয়ের সঙ্গে প্রস্থান করল। সঙ্গে তার বোনেরা ছিল। পরদিন সেই বোনেরাই খবর দিল– মেয়ে পছন্দ হয়নি। সে রাতে সুধার ঘুম হল না। সারারাত মোতির সুন্দর চেহারা, সেই হাসিমুখ, তার হাতের সামান্য ছোঁয়া তাকে যেন সুড়সুড়ি দিয়ে জাগিয়ে রাখল।
‘মেয়ে পছন্দ হয়নি! হুঁ!’ মগ্ঘি কড়াইতে তরকারি চাপিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল, ‘নিজে যেন একেবারে কন্দর্প! গায়ের রঙের দেমাক কত! তবে নিজের নাকটা দেখে না! আর নিগ্রোদের মতো কোঁকড়ানো চুল। আর বোনগুলো কী! একেবারে মেথরানির মতো দেখতে– তার ওপর রঙের পোঁচ। মাথায় চুলগুলো দেখলে মনে হয় মাথায় একটা বস্তা চাপিয়েছে। মেয়ে পছন্দ হয়নি! হুঁ!’ বলেই সে জোরে তরকারি নাড়া দিল। মনে হল যেন তরকারি নয়–ছেলেটাকেই রাঁধছে কড়াইয়ে চাপিয়ে।
বাড়ির লোকেরা বা পাড়া-প্রতিবেশী এবং অফিসের সহকর্মীদের এই ধারণা ছিল যে, সুধার কোনও অনুভূতিই নেই। তাছাড়া অফিসের কাজে সে বেশ দক্ষ। কারও সঙ্গে প্রেমপ্রীতির ভাব ছিল না। ধীর ধীরে তার চোখদুটো মলিন হতে লাগল, ঠোঁট নীরব হয়ে চেহারা ধোঁয়াটে হয়ে চলল। তার চেহারা এমন হয়ে গেল যা দেখলে বরফখণ্ড বলে মনে হত। কেরানিরা পরস্পর বলাবলি করত, সুধাকে যে বিয়ে করবে তাকে আর পাহাড়ে যেতে হবে না।
তাই মোতি যখন তাকে পছন্দ করল না তখন সুধার প্রতিক্রিয়া কী হল, তা কেউ জানতে পারল না। এই প্রথম সে একজনকে মন দিয়েছিল, আর তা কেউ জানত না। জানবেই-বা কী করে? সে কি কাউকে কিছু বলত?–আমাকে যে দেখতে এসেছিল তাকে আমি মন দিয়েছিলাম। কিন্তু সে আমাকে পছন্দ করেনি।– আর সবাই তো প্রেমে পড়লে কাঁদে কিন্তু সে বেচারি তো কাউকে কিছু বলে না।
সেদিন অফিসে সুধা ওভারটাইম কাজ করল। সন্ধ্যা হতেই সে অফিস থেকে বের হল এবং তার কালচে রঙের পার্সটা হাতে ঝুলিয়ে কাছেই আসফ আলি পার্কে গিয়ে একটা বেঞ্চে একা একা বসে রইল। পার্কটা দিল্লি-গেটের পাশেই এককোণে অবস্থিত। কয়েকটা গাছ আর কয়েকটা বেঞ্চ ছিল এই পার্কে। কয়েক টুকরো ঘাসের চাতাল– পাশেই ট্রাফিকের হই-হল্লা। আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি নীরব ছিল জায়গাটা। সুধা রোজই এখানে আসত, কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নিয়ে তবে বাড়ি যেত। কিছুক্ষণের জন্য সে তার কল্পনার দুনিয়ায় ডুবে যেত। একাকিত্বকে সে ভয় পেত না। এই একাকিত্বই তার একমাত্র আশ্রয় ছিল। অন্ধকারেও সে ভয় পেত না। বরং অন্ধকারই তার প্রিয় বন্ধু ছিল। গুণ্ডাদের ভয়ও সে করত না। তার স্বভাবে কী এমন বৈশিষ্ট্য ছিল যে গুণ্ডারাও দূর থেকে দেখেই সটকে পড়ত। পাশ কাটিয়ে চলে যেত।
আজ অন্ধকার খুব গাঢ় ছিল। গাছের নিচে নীরবতাও বেশি অনুভূত হচ্ছিল। পাথরের বেঞ্চটাও অধিকতর ঠাণ্ডা লাগছিল। সুধা কয়েক মিনিট বেঞ্চের উপর বসে রইল। কিন্তু তার শ্রান্তি দূর না-হওয়ায় একটা গাছের নিচে গিয়ে গুঁড়ির সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসে পড়ল। তার চোখ বুজে এল।
.
হঠাৎ কে যেন বলে উঠল, ‘তুমি এখানে একা বসে কী করছ?’
সুধা চোখ মেলে তাকাল। মোতি পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। সেই সুন্দর ব্রাউন স্যুট পরা। তেমনি ধবধবে সাদা দাঁতগুলো চকচক করছে।… তার হাতগুলো কী সুন্দর! সুধার গলায় যেন কী আটকে গেল– সে কথা বলতে পারল না।
মোতি তার পাশে এসে বসল। এত কাছে যে তার প্যান্ট সুধার শাড়ি স্পর্শ করল। সে ধীরে ধীরে জিগ্যেস করল, ‘আমি অপছন্দ করায় তুমি রাগ করেছ?’
