কলেজেও তার বন্ধুবান্ধব বলতে কেউ ছিল না। তার লাজুক স্বভাব সে এখনও সঙ্গে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তার মাতাপিতার দারিদ্র্য যেন তার লজ্জাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তার পিতা চাঁদনিচকের জীবনরাম নাথুমলের ঘড়ির দোকানে ত্রিশ বছর যাবৎ সেলসম্যানের চাকরি করে আসছে। তার এমন সামর্থ্য ছিল না যে মেয়েকে কলেজে পড়াতে পারে। তা সত্ত্বেও মেয়ের যাতে যোগ্য বর জোটে সেই আশায় সুধাকে সে কলেজে দিয়েছে। তার মনে অনেক সময় আশারও উদয় হত যে কলেজের কোনও ছেলেই হয়তো তার মেয়েকে বিয়ে করতে চাইবে। কিন্তু যখনই সে সুধার দিকে তাকিয়ে দেখত তখন সুধার ঘাড়-ঝোঁকানো চাল, শুকনো বুক, আর স্থির চোখ ও মৌনভাব দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করত। তার পর আবার সে চুপচাপ হুঁক্কা টানতে শুরু করত।
‘সুধার জন্যে বর ধরে আনতে হবে’, কিন্তু এতে বিপত্তি হল এই যে এ-ধরনের বরেরা অনেক যৌতুক দাবি করে। কিন্তু তার অবস্থা এমন যে, অনেক তো দূরের কথা, কম যৌতুকও দেওয়ার সামর্থ্য নেই। চিন্তায় দোল খেতে-খেতে সে এ-চিন্তাও করেছে– আজকাল ভালোবাসাবাসিতেও তো অনেক বিয়ে হয় আর খুব সস্তায়ই হয়। এই তো মালিকরামের মেয়ে গোপীকেই দ্যাখো না– বাপ তো হেল্থ্ মিনিস্ট্রির তৃতীয় শ্রেণির কেরানি, কিন্তু মেয়ের বিয়ে হল লাখপতি ঠিকাদারের সঙ্গে। ছেলেটা গোপীর সঙ্গে কলেজেই পড়ত। বাপ থাকে সরকারি কোয়ার্টারে আর মেয়ে এয়ারকন্ডিশন্ড গাড়িতে চেপে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে। তবে গোপী তো খুব সুন্দরী মেয়ে। আর আমাদের সুধা! সে তো তার মায়ের মতোই অতিসাধারণ।
ওর জন্যে তো কোনও বর ধরে আনতেই হবে। যেমন সুধার মায়ের জন্যে তার মা আর আত্মীয়স্বজনরা আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
সুধার মা দু-এক জায়গায় কথা চালিয়েছিল– কিন্তু তারা আর এগোয়নি। তবে একবার একটু জোরেশোরে ধরা হতেই একটা ছেলে সুধাকে দেখতে এসেছিল। কিন্তু সে সুধাকে পছন্দ করল না। ছেলেই-বা কী সুন্দর ছিল! মুখে বসন্তের দাগ, রোগা টিনটিনে চেহারা। কথা বলতে তোতলায়, রঙ কালোজামের মতো। কিন্তু বউটি চাই সুন্দরী। আর যৌতুক চাই স্কুটার একটা। কিন্তু সুধার বাপ তো একটা সাইকেল দিতেও অপারগ। তাই আর কথা এগোয়নি।
কিন্তু সুধার বাপের তো এটা জানা ছিল না যে, এই রোগাপটকা কুৎসিত লোকটার অপছন্দ হওয়ায় সুধা নিজে কত সুখী হয়েছিল। তার পর দুবছরে আরও দুটো ছেলে সুধাকে দেখে ফিরে গেছে এবং বিয়ে করতে রাজি হয়নি। এতে সুধা খুবই স্বস্তি পেয়েছিল। সুধা ওপরে যতটা শান্ত ছিল, ভেতরে ছিল ততটা উত্তপ্ত। কেউ জানত না সুধার কল্পনার দৌড়। বাইরে থেকে একটা সাদামাটা মেয়ে মনে হলেও সে ভেতরে ভেতরে এক রঙিন স্বপ্নের জীবনে বাস করত। সে জীবন এই সংকীর্ণতা ও অন্ধকারময় বন্ধ জীবন থেকে চাকচিক্যময় ও উজ্জ্বল। এ খবর তার বাপ জীবনরামও জানত না আর তার মা মঘিও খবর রাখত না। কিন্তু সে তার মনের গহনে এক উজ্জ্বল জীবন লুকিয়ে রেখেছিল– যেমন ছিন্নবস্ত্রের অঞ্চলে রত্ন বাঁধা থাকে। আর এটা তো আমাদের ট্রাডিশন যে, একজন নোংরা কাপড় পরা বেনিয়াকে দেখে কেউ কি ধরতে পারে যে তার থলের মধ্যে কতটা সোনা আছে? সুধাও খুব লাজুক মেয়ে ছিল, তাই কাউকে মনের কথা বলত না। লোকে শুনে হাসবে যে! আরও কত কথা সে ভাবত, কলেজের সুন্দরী মেয়েরা যদি তার এই মানসিক ঐশ্বর্যের কথা জানতে পারে, তা হলে তারাও বিস্মিত হবে। আর যেসব যুবক বড় বড় গাড়ি হাঁকিয়ে চলে তারা যদি মনের খোঁজ পায়, তা হলে! তারা তো সুধার দিকে ফিরেও চায় না। আর একথাও সত্যি, হাতে ধোওয়া সালওয়ার, কুঁচকানো কামিজ- এমন মেয়ের দিকে কেউ তাকাবে কেন? আর সুধাই-বা কেন তার মনের অতল সম্পদের কথা তাদের জানাবে?
.
জীবনরাম কখনও কখনও তার স্ত্রীকে বলে, ‘কী মেয়েই-না জন্ম দিয়েছ? সারাদিন চুপ করে থাকে, কোনওদিকে তাকায় না, খালি কাজ আর কাজ। মুখে হাসির লেশও নেই। দ্যাখো না কপুর সাহেবের মেয়েদের? কেমন ফুলের মতো ভুরভুর করে। সারা বাড়ি গুলজার করে রাখে আর তোমার সুধা’… জীবনরাম খবরের কাগজ ছুঁড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে।
তার স্ত্রী বারো আনা সের দরের চালের ভাত আর পানির মতো পাতলা ডাল স্বামীর খাবার টেবিলে রেখে বলে, ‘ওদের কথা বল না। ওদের বাপ সুপারিন্টেন্ডেন্ট। মাসে চারশো টাকা ঘরে আনে। আমার সুধার মাত্র দুটো কামিজ। কপুর সাহেবের মেয়েরা দিনে দুবার কাপড় বদলায়। এটা কখনও ভেবেছ?’
জীবনরাম দাঁত পিষে চুপ করে থাকে। তার মনে নানা প্রশ্ন জাগে… এই চাল এত মোটা কেন? আর ডাল এত পাতলা কেন? তার স্ত্রী সবসময় খিটমিট করে কেন? তার মেয়েটা কেন চুপ করে থাকে? লোকে যৌতুকে স্কুটার কেন চায়?
এমনি অনেক প্রশ্ন তার পাতলা ডালের দানাগুলোর মতো মগজের মধ্যে কিলবিল করতে লাগল। কিন্তু যখন কোনও প্রশ্নেরই জওয়াব পাওয়া গেল না তখন সে প্রশ্নগুলোকে পাতলা ডালের মতো এক চুমুকে গিলে ফেলাই যুক্তিযুক্ত মনে করল।
.
আই.এ. পাস করিয়ে জীবনরাম সুধাকে কলেজ থেকে ছাড়িয়ে আনল। ‘আমি এফোর্ড করি না’, জীবনরাম তার সঙ্গী তোতারামকে বলল –সে সেবামল দুমল ক্লথ মার্চেন্টের ওখানে চাকরি করত। সে অতিসহজেই বলতে পারত যে কলেজে পড়াবার ক্ষমতা নেই। কিন্তু ক্ষমতা শব্দটা কত স্পষ্ট আর পরিষ্কার। যেন কেউ তার মাথায় গুনে গুনে সাতটা জুতোর বাড়ি মারল–আর ‘এফোর্ড’ শব্দটা কত ব্যাপক। এমনি করে দেশি ভাষার সঙ্গে বিদেশি ভাষার সংমিশ্রণে অনেকটা আবরু থাকে। যেমন বাড়িতে যখন ঝগড়া হচ্ছে, তখন আগন্তুকের আগমনে তার ওপরও পর্দা পড়ে।
