‘পালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছ কোথায়?’
‘কোথাও নয়।’ সে হাঁপাতে হাঁপাতে পিছন ঘুরে বলল : ‘আমি তো আপনাকেই খুঁজছিলাম।’
‘আমাকে খুঁজছিলে? না আমার কাছ থেকে পালাচ্ছিলে? এ চালাকি আমার সাথে চলবে না।’ আমি বুক ফুলিয়ে বললাম।
একথায় সে মনঃক্ষুণ্ণ হল। তার চেহারায় রোষের ছায়া পড়ে; কিন্তু সে কিছুক্ষণ আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখল। যেন কিছু বলবার প্রয়াস পাচ্ছে; কিন্তু তার সাহস হচ্ছে না। তার পর কিছুক্ষণ পরে নিজেই সিন্দুকটি মাথা থেকে নামিয়ে কাঁধের উপর রাখল এবং ধীর স্বরে বলল :
‘আচ্ছা, এখন কোনদিকে যাবেন?’
‘ওই সামনের রোডের দিকে চলো।’ আমিও শান্তস্বর ধারণ করলাম, তার পর তাকে পথ দেখালাম।
‘চলুন।’ সে আমার পিছন হয়ে চলল।
কিন্তু আমিও তো কাঁচা ছেলে নই, যে এতকিছু করার পর তাকে আবার পিছনে ছেড়ে দেব। আমি রেগে গিয়ে নিজের সিন্দুকটা মাটিতে নামালাম, এবং তাকে শেষবার সাবধান করে বললাম :
‘দ্যাখো মিয়া আমি তোমায় সোজা কথা বলে দিচ্ছি, এখানে তুমি কোনও হাতসাফাই করতে পারবে না। যদি কুলিগিরি করতে চাও তো চুপচাপ আমার আগে আগে চলো, না তো সিন্দুক নামিয়ে দাও।’
একথা বলে আমি একটু ভয়ও পেয়ে গেলাম যে, সে সিন্দুকটি নিচে আছাড় দিয়ে না-দেয়। কিন্তু সে একটুক্ষণ কী চিন্তা করে পূর্ণদৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল এবং কোনওরূপ তর্ক না-করে নীরবে আমার আগে আগে চলতে লাগল। এরপর থেকে তার সম্পর্কে আমি গভীর সতর্কতা অবলম্বন করি এবং একমুহূর্তের জন্যও তাকে না আর আমার পেছনে ছেড়েছি অথবা আমার দৃষ্টির সম্মুখ থেকে তাকে না আর অদৃশ্য হতে দিয়েছি।
আমরা জনতার মাঝ থেকে পথ করে অগ্নি-আক্রান্ত অঞ্চল থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে এক খোলামেলা বড় রাস্তায় উপস্থিত হই। যদিও আমরা সেই আগুন থেকে বেশ দূরে চলে এসেছিলাম, কিন্তু তবুও মনে হচ্ছিল শেষ সীমা পর্যন্ত অগ্নির লালিমাই দেখা দিচ্ছে। এবং চারদিকে লোকের শঙ্কিত ও নিষ্প্রভ চেহারা যেন আকাশের দিকে মুখ তুলে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি যতই আগে বেড়ে গেলাম, বিপদগ্রস্ত নারী-পুরুষ-শিশুদের চিৎকার ততই কাছে শোনা গেল। আর যদি সেই প্রলয়ংকর ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যে কোনওরূপ প্রভাবিত না-হয়ে সেই কুলিটি শুধু আমায় আঘাত হানার চেষ্টায় ছিল, তাতে কী, আমিও তো এত নির্বোধ ছিলাম না যে, মানুষের বিলাপ-আর্তির দুঃখে বিগলিত হয়ে নিজের সমস্ত ঐশ্বর্য হারিয়ে ফেলব। আমিও তো এক কুলির মাথার উপরের সিন্দুক এবং তার মনের চোরটিকে নিজের চিন্তার কেন্দ্র করে রেখেছিলাম। আমিও কোনও দক্ষ গোয়েন্দার মতো তার কাঁপা পায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করলাম। এবং নিজের মন, বুদ্ধি, চতুরতাকে সতর্ক করে সেই কুলির সাথে হেঁটে হেঁটে দীর্ঘ পথযাত্রা নিরাপদে শেষ করলাম। যখন গন্তব্যস্থানে পৌঁছাই– যেখানে আমার পরিবারের অন্যান্য লোকজন সব অবস্থান করছিল– তখন আমার মনে হল যেন আমি এক নতুন পৃথিবী ও এক নতুন জীবন লাভ করেছি। আত্মীয়স্বজন আমায় ও সিন্দুকদুটিকে অক্ষত দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলল। বাড়ির দরজার কাছে উপস্থিত হয়ে কুলিটি একমুহূর্তের জন্য আবার থেমে গেল এবং তিক্তস্বরে বলল :
‘লন সাহেব, এখন তো আপনি আগে গিয়ে রাস্তা দেখাবেন।
তার পর কণ্ঠস্বরে যেন পরাজিতের ভাব দেখা দিল। কিন্তু একথা আমার স্বপ্নেরও অগোচর ছিল যে, সে আমায় এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে পরাজিত করার চিন্তায় রয়েছে। আমি তাকে কোনও উত্তর দিলাম না, এবং নীরবে পথ দেখাবার জন্য সম্মুখে এগিয়ে গেলাম। সে আমার পেছনে পেছনে কামরার মধ্যে প্রবেশ করল এবং আমার নির্দেশমতো এককোণায় সিন্দুকটি রেখে দিল। সে যখন সিন্দুকটি মাথা থেকে নামিয়ে রেখে দিল আমি তাকে বাইরে বারান্দায় গিয়ে একটু দাঁড়াতে বলি। সে নীরবে বাইরে চলে গেল। আর আমি গিয়ে তার মজুরি সম্পর্কে চিন্তা করতে লাগলাম।
যখন মোট বহনের জন্য কোনও লোক পাওয়া যাচ্ছিল না তখন আমি চল্লিশ টাকা পর্যন্তও দিতে তৈরি ছিলাম। কিন্তু এখন আমি শান্তমনে চিন্তা করে বুঝতে পারি এত টাকা কোনও কুলিকে এই সামান্য কাজের জন্য দেওয়া বোকামি। কোনও বুদ্ধিমান লোক এত টাকা কোনও কুলিকে কীভাবে দিতে পারে! বাড়ির মেয়েছেলেরা ন্যায্যরূপে পরামর্শ দিল যে, পাঁচ টাকা দেওয়া উচিত। পাঁচ টাকা যদিও ন্যায়সংগত ভাড়া, কিন্তু যেহেতু আমি মৌলিকরূপে করুণ হৃদয়ের অধিকারী সেজন্য নিজের করুণা দেখাবার জন্য তার সঙ্গে আরও পাঁচ টাকা যোগ করলাম। দশটাকার নোট হাতে নিয়ে আমি বাইরে বেরিয়ে আসি। কিন্তু বারান্দায় কুলিটিকে দেখতে পেলাম না।
বাইরের দরজার দিকে দেখলাম, নিচে নেমে উঠানে গেলাম, বাইরে রাস্তায় বহুদূর পর্যন্ত তাকিয়ে দেখলাম, কিন্তু তাকে কোথাও দেখা গেল না। বেশ আশ্চর্য বোধ হচ্ছিল যে, সে ভাড়া না-নিয়ে চলে গেল কোথায়! এমন সময় ঘরের একটি ছোট ছেলে এসে আমায় বলল :
‘ভাইয়া, সে তো অনেকক্ষণ চলে গেছে- বলেছে, সাহেবকে বলে দিও, আমি তো আর কোনও কুলি নই।’
অনুবাদ : বশীর আহমদ
রাজকুমার – কৃষণ চন্দর
সুধাকে সুন্দরী যেমন বলা যায় না, তেমনি কুরূপাও বলা যায় না। এমনি একটা সাধারণ মেয়ে ছিল সে। শ্যামলা রঙের পরিচ্ছন্ন মেয়েটির শান্ত মেজাজ, তবে গৃহকর্মে নিপুণা। রান্নাবান্না, সেলাই-বুননি, লেখাপড়ায় দারুণ ভালো। কিন্তু সুন্দরী ছিল না– চাঞ্চল্যও ছিল না তার। এমনকি পুরুষের মনকে আকর্ষণ করতে পারে এমন কোনও বস্তুই তার অবয়বে ছিল না। সে ছিল একটি লাজুক শান্ত মেয়ে। ছেলেবেলায় একাই খেলা করত, মাটির পুতুল বানাত আর সেই পুতুলের সঙ্গেই কথা বলত। পুতুলটাকে একপাশে বসিয়ে খেলা করত। অন্য কোনও মেয়ে তার কাছে এলেই সে পুতুলের সঙ্গে কথাবলা বন্ধ করত। কোনও দুষ্টু ছেলে তার খেলাঘর ভেঙে দিলে সে নীরবে কাঁদত। একটুপর আপনা-আপনি চুপ করত। আবার নতুন খেলাঘর তৈরি করত।
