আমার ফ্ল্যাট সম্পূর্ণরূপে আগুনের গ্রাসের মধ্যে এসে পড়েছিল। এবং তা ছিল উপরতলায়। সুতরাং ত্রিশ-চল্লিশ টাকার জন্য প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করে উপরে উপস্থিত হওয়ার বিপদ কেনার জন্য কেউ রাজি হচ্ছিল না। অবশেষে নিরাশ হয়ে আমি সিদ্ধান্ত করি একাই উপরে গিয়ে দুটি সিন্দুক নিচে ফেলে দেব। যদি কেউ লুটেও নেয়, তাতে কী; কমপক্ষে আগুনে ভস্ম হওয়া থেকে তো রক্ষা পেয়ে যাবে। একথা চিন্তা করে আমি উপরে দৌড়ে যেতে উদ্যত হচ্ছি এমন সময় কানের কাছে এক সহানুভূতিপূর্ণ স্বর শুনতে পেলাম :
‘আপনার কি কুলির দরকার?’
পিছন ফিরে তাকালাম। বাহ্যত একটি সাধারণ প্রকৃতির লোক আমার উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। তার দিকে করুণাপ্রার্থী দুই চোখ তুলে মাথা নাড়লাম। এবং তার সাথে কোনও মজুরির চুক্তি না-করেই উভয়েই দৌড়ে উপরে গেলাম। পুলিশের লোক ছাড়া কতক অন্য লোকও আমাদের উপরে যেতে বাধাদানে চেষ্টা করে; কিন্তু আমরা তাদের দু হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে দিতে উপরে পৌঁছে যাই। কয়েকবার আগুনের প্রসারিত শিখা আমাদের পরিধেয় বস্তু এবং শরীরকে প্রায় স্পর্শও করে; কিন্তু সেই শিখাগুলোর সাথে সংগ্রাম করতে করতে আমরা উভয়েই এক-একটি সিন্দুক তুলে নিতে সফল হই। এবং প্রসারিত অগ্নিশিখা থেকে নিজেদের রক্ষা করে দ্রুতবেগে নিচে নেমে আসি। নিচে নেমে দেখলাম কুলির পিঠের কয়েক জায়গায় কাপড় পুড়ে গেছে। জানি না তার শরীর পর্যন্ত আগুনের স্পর্শ লেগেছিল কি না। কিন্তু আমি সেকথা তাকে আর জিগ্যেস করিনি, তাছাড়া সে-ব্যাপারে চিন্তা করার সময়ও ছিল না। রাস্তায় অন্য বাড়িগুলোর দরজা-জানালা- ছাদে আরও ভয়ংকর প্রলয় সৃষ্টি হয়েছে। করুণ বিলাপ ও আর্ত রব পরিবেশকে আরও ভয়াবহ করেছে। কুলিকে উপদেশ দিলাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে যেন ভিড় থেকে বেরুবার চেষ্টা করে। নিজেও আমি পূর্ণশক্তিতে ভিড় ঠেলে ঠেলে এগিয়ে চললাম। অনেকক্ষণ সম্মুখে এগিয়ে গেছি, কিন্তু জনতার ধারা আর শেষ হয় না। হঠাৎ এই চিন্তায় আমি চমকে উঠলাম যে, কুলির মাথায় যে সিন্দুকটি আছে তা গয়না ও নগদ টাকায় পূর্ণ রয়েছে। এই চিন্তার সাথে সাথেই আমার একথাও খেয়াল হল যে, কুলিটা চলতে চলতে আমার পেছনে থাকার চেষ্টায় ব্যস্ত রয়েছে। কয়েকবার তাকে আমার আগে চলবার কথা বলেছি, কিন্তু ভিড়ে সুযোগ পেয়ে সে আবার পিছনে হয়ে যাচ্ছে। তার উদ্দেশ্য আমি ভালোরূপে বুঝতে পারলাম। বুঝতে পারলাম যে, সে আমার চোখে ধুলো দিয়ে সিন্দুকটি নিয়ে যেতে চায়। এই ধরনের ঘটনাও কতক লোকের ভাগ্যে ঘটে গেছে। কিন্তু অন্য লোকের কথা থাক, আমি সহজে এই চক্রান্তের মধ্যে যাচ্ছি না। আমি খুব সতর্ক হয়ে গেলাম এবং কঠিন স্বরে বললাম :
‘তুমি পিছনে থাকার চেষ্টা কোরো না।’
সে সন্ত্রস্ত হয়ে নীরবে আমার আগে আগে চলতে লাগল। আমি একথা স্বীকার করছি যে, তার মাথায় যে সিন্দুকটি ছিল তা আমার মাথার সিন্দুকটির চেয়ে দ্বিগুণ ভারী ছিল; এবং তা মাথায় নিয়ে হাঁটতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আর আমাদের গন্তব্যস্থানও ছিল বেশ দূরে। কারণ অগ্নি-আক্রান্ত অঞ্চলকে পুলিশেরা ঘিরে পাহারা দেওয়ায় ভিতরের পথগুলোতে প্রবেশ নিষেধ হয়ে যায় এবং আমাদের পথের দূরত্বও বেড়ে যায়। এমনিতেও যেখানে আমাদের পরিবারের লোকজন নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছিল তা একটু দূরেই ছিল। ভিড়ের জন্য রাস্তা রুদ্ধ থাকায় এখন আমাদের সোজা পথ ছেড়ে এক দীর্ঘ বাঁকা পথ ঘুরতে হবে। এ বাঁকা পথও পার হওয়া যেত, কিন্তু আমাদের প্রথম কাজ ছিল অগ্নি-আক্রান্ত এলাকা থেকে কোনওপ্রকারে বেরিয়ে বাইরে যাওয়া। আমি সিন্দুকটি মাথা থেকে নামিয়ে কাঁধে রাখলাম। বুকে বল আনলাম, কোমর শক্ত করলাম, ইচ্ছাশক্তিকে সতেজ করে দ্রুতগতিতে লম্বা লম্বা পা ফেলতে লাগলাম। সাথে সাথে কুলিকে বললাম যে, সে যেন আমার সাথে চলে।
হঠাৎ একদিক থেকে জনতার এক উত্তাল তরঙ্গ ঠেলা দিয়ে ওঠে। আমার পা কেঁপে সিন্দুক হাত থেকে ছুটে মাটিতে পড়ে গেল এবং আমি মুখ থুবড়ে মাটির উপর পড়ে গেলাম। তার পর ভূমিকম্পে পতিত গৃহের মতো কতক লোক আমার উপর এসে পড়ল। মনে হল যেন আমি এক ধ্বংসস্তূপের তলায় তলিয়ে গেছি; কিন্তু শিগগিরই আমি চেতনা সামলে উঠি এবং দক্ষ ডুবুরির মতো হাত-পাগুলোকে সক্রিয় করে সিন্দুকটি পুনরায় অধিকারে আনি এবং গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াই। কিন্তু তাকিয়ে দেখি কুলিকে কোথায়ও আর দেখা যায় না। আমি যেন সংবিহারা হয়ে গেলাম। সিন্দুকটি মাথার উপর তুলে আমি পাগলের মতো এপাশ-ওপাশ দৌড়াতে লাগলাম। তাছাড়া সকলেই নিজ নিজ ব্যাপারে এমন ব্যস্ত হয়ে রয়েছে যে, আমার অস্থিরতা কেউ বুঝতেই পারল না। বস্তুত, আমার ধারণা হল এবং একথা বিশ্বাস না-করার কোনও হেতুই রইল না যে, আমি চরম মার খেয়ে গেছি। কিন্তু ঠিক সেই সময় দূর একটি গলিতে মানুষের মাথার উপরে এক সিন্দুক ভাসতে দেখা গেল। বুঝতে পারলাম, ওই সিন্দুকটি আমারই। আমি যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। সিন্দুকটিকে অনুসরণ করে আমি দ্রুতগতিতে সেই গলিতে প্রবেশ করলাম। কুলির দিকে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম তার গতি খুব দ্রুত হয়েছে, বোধহয় সে আমার মনের কথা বুঝতে পারেনি। আমি কুলির পাশে গিয়ে উপস্থিত হলাম। এই সময় দ্রুত চলার ফলে সে হাঁপাচ্ছিল। তার পাদুটি দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে কাঁপছিল। আমি পিছন থেকে তার কাঁধে হাত দিয়ে কঠিন স্বরে বললাম :
