কিন্তু পুলিশের এই সিপাই বড় সাদা মনের মানুষ। অর্থনীতির দর্শনের ধার ধারে না। তার জীবনের খাতায় বাজেট আর জমা-খরচের হিসাবের ঠাঁই নেই। সে তার আবেগের অমৃত-ভাণ্ডটি নিঃশেষে পান করে নিশ্চিন্তে বসে রয়েছে।
আমি এই দানশীল সিপাইকে ভালো করে দেখার জন্য এগিয়ে গেলাম। আমার ওপর তার নৈকট্যের বড় খারাপ প্রতিক্রিয়া হল। তার দানশীলতা আমার মনের শক্ত-ভাবকে গলিয়ে দিতে লাগল।
আমি দশটাকার ছ-খানা নোট বের করে বুড়ির সামনে ধরে বললাম, ‘বুড়ি-মা এই নাও। এই টাকায় হয়তো তোমার সংসারের অন্যান্য লোকের কাপড়ও হয়ে যাবে।’
আমি এটা কী করলাম! ওই ষাট টাকা আমাকে একজন কৃপণ সম্পাদক একটা গল্পের বিনিময়ে অনেক কষ্টে দিয়েছেন। ওই টাকাটার আমার ভয়ানক দরকার।
মজা দেখতে আসা লোকগুলোর একজন এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আর বুড়ি-মা, এই পাঁচ টাকা আমি দিলাম। একটা খাবারের ডিবে কিনে নিও। আর ছেলের জন্য হোটেল থেকে খাবার নিয়ে নিও।’
ময়লা কাপড় পরা একটা লোক তার বিড়ির কৌটো থেকে একটা আধুলি বের করে বলল, ‘এই যে মা, তোমার মালিরের বাস-ভাড়া।’
তখন বুড়ি-মা’র হাতে নোট আর মুখে দোয়া।
এমন সময় হঠাৎ একটা লোক ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকল। তার পর বুড়িকে উদ্দেশ করে বলল, ‘বুড়ি-মা, এই পোঁটলা তোমার?’
আনন্দে উছলে উঠে বুড়ি বলল, হ্যাঁ বাবা, আমার।’
সামনের স্টপ্ থেকে বাসের কনডাক্টর পাঠিয়েছে।
ভিড়ের ওপর দিয়েও খুশির ঢেউ বয়ে গেল।
বুড়ি ভিড়কে সম্বোধন করে বলল, ‘বাবারা, আল্লা তোমাদের ভালো করুন। তোমরা আমার জন্যে খুব করেছ, অনেক করেছ। এখন তোমরা তোমাদের টাকা নিয়ে নাও। আমার তো আর দরকার নেই।’
দশ টাকার তিনটে নোট সে ট্রাফিক পুলিশের সিপাইয়ের দিকে এগিয়ে দিল।
সিপাই বলল, ‘বুড়ি-মা আমার আর ও-টাকা লাগবে না।’
পাঁচ টাকা যে দিয়েছিল, তার দিকে বুড়ি পাঁচটাকার নোট এগিয়ে দিল।
সে বলল, ‘বুড়ি-মা, আমার ও-টাকা লাগবে না।’
ময়লা কাপড় পরা লোকটাকে সে আট আনা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সে বলল, ‘বুড়ি-মা, আমার ও-পয়সা লাগবে না।
সে দশটাকার ছ’-খানা নোট আমার দিকে এগিয়ে দিল।
আমি বললাম, ‘বুড়ি-মা, আমার ও-টাকা লাগবে না।’
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
আঘাত – হামিদ কাশ্মিরী
সন্ধ্যার অনেক আগেই আগুন লেগেছিল। কিন্তু সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত সে-আগুন বাজার ও পাড়াকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলে। আগুনের লেলিহান শিখা দেখে মনে হচ্ছিল আগুন যেন মাটিতে নয় বরং আকাশে লেগেছে। এক হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলময় পরিবেশ তখন দেখা দিয়েছে। চারদিকে ভীতিপ্রদ রব, শিশুদের ক্রন্দন, নারীদের বিলাপ উচ্চতর হয়ে উঠেছে; কিন্তু কেউই কারওর দিকে তাকাবার সময় পাচ্ছে না। বরং কতক সুযোগসন্ধানী ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে বাড়িঘর, দোকানপাট লুঠতরাজ আরম্ভ করে। কয়েক জায়গায় মেয়েছেলের প্রতি উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও সংঘটিত হয়। এছাড়া আরও অনেক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়, যা হয়তো কোনওদিন দূর ভবিষ্যতে আমি ভুলে যেতে পারিও-বা, অথবা সেই আগুনের দৃশ্য আমার মন থেকে মুছে যেতেও পারে, কিন্তু সেই অগ্নিকাণ্ডের ফলে উদ্ভূত মানুষের অসহায়তা ও হট্টগোলের মাঝে যে-আঘাত সেই লোকটি আমায় দিয়ে গেল তা কোনওদিনই ভুলতে পারব না। সেই আঘাত আমার মনে এক অক্ষয়চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। আর এর ফলে এক ব্যথার যন্ত্রণা আমায় সর্বদা সেই লোকটির কথা স্মরণ করিয়ে রাখে। অনেক সময় আমি ব্যাকুল হয়ে শহরের অলিগলিতে তাকে অনুসন্ধান করে বেড়াই; এবং প্রায়ই পথের প্রতিটি ভিড়ের মধ্যে তাকে শনাক্ত করার জন্য আমার দৃষ্টি চঞ্চল হয়ে ওঠে। কিন্তু কোথাও তার দেখা পাই না। মনে হয় সে আমার অনুসন্ধানের সব খবরই রাখে; তাই সন্ত্রস্ত হয়ে সে কোথাও আত্মগোপন করে আছে। কিন্তু আমিও সংকল্প করেছি সারাজীবন তার অনুসন্ধান চালিয়ে যাব।
তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল নিচে ফুটপাতের উপর। সেই সময় বাজারে পলায়নের এক সাড়া পড়ে গিয়েছিল। চারদিকে ভীতিপ্রদ রব। আগুনের স্ফুলিঙ্গ ও মানুষের হৃদয়বিদীর্ণকারী চিৎকার ব্যাপকতর হয়ে উঠেছে। ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঠন্ ঠন্ শব্দ করে দ্রুতগতিতে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করছে। পুলিশের লোকেরা অগ্নি-আক্রান্ত অঞ্চলটিকে ঘিরে লোকগুলোকে টেনে টেনে বাইরে বার করতে আরম্ভ করে দিয়েছে। আর আমি সাহায্যলাভের জন্য অন্যান্য আরও অনেক সাহায্যপ্রার্থীর মতো কোনও লোকের সন্ধানে ব্যস্ত রয়েছি যাতে কিছু জিনিসপত্র ফ্ল্যাট থেকে বার করতে পারি। কিন্তু এমন ভয়াবহ পরিবেশে সাহায্যের লোক পাওয়া খুবই দুরূহ। প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রাণ রক্ষা করতে ব্যস্ত। আমি অবশ্য নিজের প্রাণ রক্ষা করেছিলাম। তাছাড়া ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসমূহ বার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু মূল্যবান দুটি বড় সিন্দুক বার করতে পারিনি, যা অন্য সব জিনিসপত্রের মতো আগুনে ভস্ম হওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে না। আমার কাছে সেই সিন্দুকদুটি ছিল খুবই মূল্যবান। কারণ মেয়েছেলের জামাকাপড়, গহনাপত্র, নগদ টাকা, এমনকি মরা-বাঁচার সমস্ত জিনিসপত্র সেই সিন্দুকদুটির মধ্যে বন্ধ ছিল। আর সেই সিন্দুকদুটি উদ্ধার করায় একটি পরিবারের সমস্ত পুঁজিপাটা ধ্বংস হওয়া থেকে বেঁচে যেতে পারত। তাই মজুরি দিয়েও যদি কোনও লোক পাওয়া যায় তার সন্ধানে আমি এদিক-সেদিক ছুটাছুটি আরম্ভ করি। অন্যদিকে আমার দৃষ্টি ছিল আগুনের ঝাঁপটা-পরিবৃত আমার ফ্ল্যাটের প্রতি, যাতে কেউ ভেতরে প্রবেশ করে লুটপাট আরম্ভ না-করে দেয়। আমার প্রতিবেশী ভদ্রলোক সৌভাগ্যক্রমে প্রত্যেকবার মোট বহনের জন্য বিশ টাকার চুক্তিতে এক কুলি পেয়েছিলেন। আমি অবশ্য ত্রিশ-চল্লিশ টাকাও দিতে প্রস্তুত ছিলাম, যদি কোনও কুলি পাওয়া যেত। কিন্তু কেউই রাজি হচ্ছিল না।
