পথেই ঘটল আমার নিজের দেখা গল্পটা।
সেই বুড়ি এখনও রাস্তা ধরে দৌড়াচ্ছে।
বাস্ চৌরাস্তার মোড় পার হয়ে চলে গেছে। সিগনালের বাতি লাল হয়ে গেছে। এদিকের ট্রাফিক বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই বুড়ি এখনও ছুটছেই। লোক অবাক হয়ে তাই দেখতে লাগল। মেয়েরা হাসতে শুরু করে দিল। ছেলেরা মজা দেখতে লাগল। আর সেই বুড়ি ছুটেই চলেছে।
এবার সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তার গতি মন্থর হল। সে বাঁ-হাতের ট্রাফিক বাঁচিয়ে চৌরাস্তা পার হচ্ছে। সে তার বোরকার সামনের অংশ তুলে নিজের মুখ উন্মোচন করে নিল। শেষে এক ট্রাফিক পুলিশের সিপাই তাকে থামাল।
‘বুড়ি-মা, মরার ইচ্ছে হয়েছে?’
বুড়ি-মা করুণ আওয়াজে বলল, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, বাছা। ওই বাসে আমার পোঁটলা রয়ে গেছে।’
হুজুগপ্রিয় যত পথিকের ভিড় জমে গিয়েছিল। একজন বলল, ‘বুড়ি-মা, তোমার ধারণা, তুমি ছুটে গিয়ে ওই বাস্ ধরতে পারবে?’
‘আর কী করব, বাবা? আমার বউ তো আমার মাথার আর-একটা চুলও বাকি রাখবে না।’
বুড়ির চেহারায় আর কথায় অসহায়তার গভীর ছাপ। মজা দেখতে যারা ভিড় জমিয়েছিল, তাদের সে বড় করুণ সুরে বলল, ‘বাবারা, বাছারা, তোমাদের মধ্যে কেউ দৌড়ে গিয়ে আমার পোঁটলাটা এনে দাও। ও-ই যে যাচ্ছে বাস্।’
‘মা, তোমার কোথাকার বাস্? কত নম্বর?’
‘মালিরের, বাবা।’
‘কিন্তু ওটা তো নাজিমাবাদের বাস্, মা!’
ট্রাফিক পুলিশের সিপাই বলল, ‘বুড়ি-মা, এবার ক্ষান্তি দাও। পোঁটলা আর কি পাওয়া যায়, মা? পোঁটলায় কী ছিল? তোমার কত লোক্সান হল?’
‘অ্যালুমিনিয়ামের একটা ডিবে– তাতে আমার ছেলের খাবার ছিল। একুশজন ছেলেমেয়ের জামা আর ফ্রকের কাপড় ছিল। আমার বউয়ের একজোড়া জাপানি সিকের কামিজ ছিল। আমার ছেলে বলেছিল : মা, আমার খাবার যখন আনবে, ওই সঙ্গে কাপড়গুলোও এনো– দরজিকে দিয়ে আসব। আমার ছেলে না-খেয়ে মরে যাবে। আর বউ আমার মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলবে
একজন অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘মা, তোমার ছেলের একুশ ছেলেমেয়ে?’
‘না বাবা। এ হতভাগার তো মাত্তর ন’টি ছেলে। তেরোটি ছেলেমেয়ে আমার বড়ছেলের। ওই ছেলে আমার গেল-বছর মারা গেছে। পাঁচ ছেলেমেয়ে আমার মেয়ের। ওই মেয়ে আমার পাগল হয়ে গেছে– সোয়ামি তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এদের মধ্যে একুশটি ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। তাদেরই জামা তৈরি হবে, বাবারা।’
‘তোমার ছেলে কী করে মা?’
‘কার ভাগ্যে কী আছে তাই সে বলে দেয়। এক আনা পয়সা নিয়ে সে তোতা পাখিকে কাগজের একটা টুকরো আনতে বলে। কাগজে ভাগ্যের লিখন লেখা থাকে।’
যারা মজা দেখতে জমা হয়েছিল, তাদের একজন হাসতে হাসতে বলল, ‘হ্যাঁ মা, তোমার ছেলে তোমাকে আজ একথা বলে দেয়নি যে, আজ তোমার কপালে জিনিস-খোয়া যাওয়া লেখা আছে?’
‘না বাবা, সে অমনধারা কথা কাউকেই বলে না। তুমিই বলো, এক আনা পয়সা নিয়ে যদি সে কাউকে ওইরকমের কথা বলে, তা হলে কি আর সে তার মাথা আস্ত রাখবে?’
ট্রাফিক পুলিশের সিপাই বলল, ‘বুড়ি-মা, তোমার ছেলে বড়লোক! অতবড় সংসারের বোঝা যে বয়ে বেড়াচ্ছে, তার কাছে এ আর এমন কী লোকসান! ছেলেমেয়েদের সে আবার জামা বানিয়ে দেবে। যাও, ঘরে গিয়ে আরাম করো।’
‘না বাবা, না। সে যখন জানবে, নিজের মাথায় বাড়ি মারতে শুরু করে দেবে, তার পর আমার মাথায়ও বাড়ি দেবে। আর আমার বউ তো তার রক্ত চুষে খাবে। আর সে হতভাগাকে বড়লোক কে বলবে, বাবা। এই তো চার দিন হচ্ছে, সে তার বাড়ি দেড় হাজার টাকায় বেচে দিয়েছে। কত কষ্টে অ্যালট পেয়েছিল। সেই বাড়ি বেচে এখন আমরা কুঁড়েঘরে গিয়ে উঠেছি। সব ধার-কর্জ শোধ দিয়ে দেড় হাজারের মধ্যে যা বেঁচেছে, তাতে শুধু আধখানা সংসারের কাপড় কেনা গেছে।’
ট্রাফিক পুলিশের সিপাই জিগ্যেস করল, ‘বুড়ি-মা, তোমার কত টাকার লোকসান হয়েছে?’
‘কেমন করে বলি, বাবা। এই ধরো, পঁচিশ-তিরিশ টাকার কাপড় হবে।’
এরপর যে ঘটনা ঘটল, তাতে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
ট্রাফিক পুলিশের সিপাই ওইদিনই মাইনে পেয়েছিল। সে পকেটে হাত চালিয়ে দশ টাকার তিনখানা নোট বের করে বুড়ির সামনে ধরল।
‘বুড়ি-মা, এই নাও, বাচ্চাদের আবার কাপড় কিনে দিও।’
তাই দেখে লোকে তো অবাক। তারা ওই সিপাইকে ভালো করে দেখতে লাগল। তারা যেন দেখছে, লোকটা সত্যি পুলিশের সিপাই, না আর কেউ! লোকে দু রকমের মানুষকে খুব ভয় করে। এক হচ্ছে পকেটমার, আর তার পর পুলিশ। কিন্তু এ কেমনধারা পুলিশ? এ তো, বলতে গেলে, সারামাসের মাইনেই একটা বিপদে পড়া বুড়ির সাহায্যে দান করে বসল। এখন এ নিজেই-বা কী খাবে আর বউ-বাচ্চাকেই-বা কী খাওয়াবে? এরও নিশ্চয় এক বিবি আর অসংখ্য বাচ্চা রয়েছে। গরিবের বাড়ি থাকে না, গাড়ি থাকে না, জমি থাকে না, আয় থাকে না। থাকে কেবল ছেলেমেয়ে। ছেলেমেয়েই গরিবের জমি-জিরেত, ছেলেমেয়েই গরিবের ফসল, ব্যাংক-ব্যালেন্স। ছেলেমেয়ে তার দারিদ্র্যের মালিন্যবিনাশী আশা। এই সিপাইয়েরও নিশ্চয় অসংখ্য ছেলেমেয়ে রয়েছে। এ মাসে তার দিন চলবে কেমন করে?
আমি একটু দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে এইসব দেখছিলাম।
আমি আমার ট্যাকের অনুমতি ছাড়া কাউকে কোনও সাহায্য দেওয়া পছন্দ করি না। আমি যখন আমার ট্যাকের অনুমতি ছাড়া গাড়ি কিনতে পারি না, আমার ট্যাকের অনুমতি ছাড়া সিনেমা যেতে পারি না, আমার ট্যাকের অনুমতি ছাড়া ভালো পোশাক পরতে পারি না, তখন আমার ট্যাকের অনুমতি ছাড়া আমি কেন কারও সাহায্য করতে যাব? বড়লোকদের মধ্যে যাঁরা হাসপাতালে, স্কুলে, কি এতিমখানায় মোটা মোটা চাঁদা দেন, তাঁরা সেই ভালো কাজ তাঁদের ট্যাকের অনুমতি ছাড়া করেন না। কলকারখানার মালিকরা বছর-শেষে আয়-ব্যয়ের জমা-খরচ করে আয়ের সেই অংশটুকুই চাঁদায় ব্যয় করেন, যেটুকু আয়-কর হিসেবে সরকারের পকেটে চলে যাওয়ার কথা।
