সিপাই আবার বলল, ‘দ্যাখো বাপু, তোমরা কিন্তু দেরি করছ। আমাকে বাধ্য হয়ে তোমাদের তা হলে গারদেই বন্ধ করে দিতে হবে।’
এই কথার ওপরও জুয়াড়িরা ইতিউতি করছে, এমন সময় হঠাৎ মাটিতে কারও দড়াম করে পড়ার আওয়াজ শোনা গেল।
সে নিক্কো। নিক্কো ততক্ষণে ধুতি খুলে মাটির উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে। তাকে ওই অবস্থায় দেখে মনসুখও সাহসে বুক বাঁধল। সেও নিক্কোর অনুসরণ করল। অ্যাকাউন্টেন্ট মালেক এদিক-ওদিক দেখছিল, এমন সময় সিপাই এসে পেছন থেকে ঘাড়ে ধরে তাকে জবরদস্তি নিচে বসিয়ে দিল। সে তখন নিরুপায় হয়ে নিজের পাতলুনের বোতাম খুলে ফেলল।
সিপাইয়ের এই ব্যবহার দেখে তখন অন্যান্য জুয়াড়ি আপনাআপনি মাটিতে শুয়ে পড়ল। শুধু চামড়ার কারবারি শেখজি রইলেন দাঁড়িয়ে। তাঁর দুইচোখে অশ্রু টলমল করে উঠল। তাঁর চেহারা দেখে বোঝা গেল, তিনি কী সাংঘাতিক মনঃকষ্ট ভোগ করছেন। তাঁর হাত বারবার কোমরবন্ধে গিয়ে ঠেকছে, কিন্তু গিয়ে আটকে থাকছে সেখানেই।
এইরকম সম্মানিত ও ভদ্র-চেহারার মানুষটিকে এইভাবে শোক করতে দেখে সিপাইজির মনে লাগল। সে সেখান থেকে ইচ্ছা করে সরে গেল। শেখজি মন শক্ত করলেন। পাগড়ির আঁচলে চোখ মুছলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের চারদিকে দেখলেন। শেষে একান্ত বাধ্য হয়ে তিনিও থানার দারোগার হুকুম তামিল করলেন।
একপ্রান্তে ছিল লরি-ড্রাইভার। সর্বপ্রথম তারই জুতো মারার পালা। সে উঠে দাঁড়ালে নিক্কো জোরে গলা ঝাড়ল। তার পর বলল, ‘মীর্জাজি, সামলে। সবাই বলতে গেলে আপন লোক, হ্যাঁ। দেখে মনে হবে খুব জোরে হাত পড়ছে, কিন্তু — বুঝলে কথা?–’
লরি-ড্রাইভারের মাত্র পাঁচ পর্যন্ত গোনা হয়েছিল, এমন সময় সেই সিপাই থানার অফিসঘর থেকে বেরিয়ে হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল। কাছে এসে সে বলল, ‘দারোগা সাহেব বলছেন, তোমরা যদি ঠিকভাবে জুতো না-চালাও, তা হলে, আমি আমার সিপাইদের দিয়ে জুতো লাগাব।’
এই কথা বলে আবার চলে গেল।
জুয়াড়িরা ভেবে দেখল, নিজেরা আসে জোরে জোরে জুতো খাওয়াই ভালো। সেই অনুসারে, বিশ মিনিটের মধ্যে প্রত্যেককে প্রত্যেকের দশ জুতো করে মারা হয়ে গেল। তখন তারা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে কাপড় ঝেড়েঝুড়ে পরে নিল। তা করতে করতে সেই সিপাই আবার এসে বলল, ‘যাও, এবারের মতো দারোগা সাহেব তোমাদের মাফ করে দিলেন। যাও, আর কখনও জুয়ো খেলো না।’
এরা সব থানা থেকে এমনভাবে বেরুল, যেন নিজের কোনও অতি নিকট-আত্মীয়কে কবর দিয়ে গোরস্তান থেকে বেরুচ্ছে। থানা থেকে বেরিয়ে তারা চুপচাপ মাথা হেঁট করে একশো গজের মতো হেঁটে গেল। তার পর নিক্কো হঠাৎ খুব জোরে হেসে উঠল। এত জোরে হাসতে লাগল যে, হাসতে হাসতে তার কোমর বেঁকে গেল। তখন সে বলল, ‘কী! দেখলে? না চালান, না মোকদ্দমা, না জেল, না জরিমানা। বলেছিলাম না– এটাকে তোমরা ঠাট্টাই ধরে নাও।’
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
পথে যেতে যেতে – আনওয়ার
কাল আমি যা দেখেছি, তা আমাকে অবাক করে দিয়েছে। পুরো ঘটনাটা আগের কালের কোনও কাহিনি আর নাটকের মতো চোখের সামনে দিয়ে ঘটে গেল। আগের কালের কাহিনি আর নাটকের তিনটি অংশ থাকত : বন্দনা, কাহিনি, উপসংহার। মূল কাহিনির সঙ্গে বন্দনা আর উপসংহারের কোনও সম্পর্ক থাকত না। কেননা, বন্দনায় থাকত স্তব বা প্রশস্তি আর উপসংহারের মধুর পরিণতি। উদাহরণস্বরূপ, ‘হৃদয়ের ক্ষত’ নামক একটি নাটক থেকে তার বন্দনা-অংশটি লক্ষ করুন :
যবনিকা উঠল। সখীরা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে হাত-ধরাধরি করে সারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখা গেল। (আজকাল তো অভিনেত্রীদেরই দেখা যায়, কিন্তু সেকালে শুধু সখীরাই থাকত। যেসব পুরুষ-অভিনেতা মাথায় পরচুলা বেঁধে আর বুকে ক্রিকেটের বল বেঁধে বালিকার অভিনয় করত, তাদের বলা হত সখী।) সখীদের সমবেত গান শুরু হচ্ছে :
বিশ্বপিতা দীনের দয়াল প্ৰভু হে– এ–এ- এ।
অভাজনে নিবেদনে
ত্যাগ কোরো না কভু হে– এ- এ–।
এবার নাটকের উপসংহার-অংশের পরিচয় লাভ করুন। নায়ক-নায়িকা প্রেমে ব্যর্থকাম হয়ে আত্মঘাতী হয়েছে। কিন্তু তার জন্য আপনার মনঃকষ্টের কোনও কারণ নেই। শেষ দৃশ্যে তাদের আবার জীবিত দেখা যাচ্ছে। প্রেমিক-প্রেমিকা স্বর্গে একে অপরের বক্ষলগ্ন হয়ে বসে রয়েছে। লাল আর সবুজ সব চাঁদের আলোর ঝরনাধারায় তাদের উপর কাগজের পুষ্প বর্ষিত হচ্ছে। দর্শকরা হাততালি দিচ্ছে।
কিন্তু আমি এখানে একটা গল্প শোনাতে বসেছিলাম। আমার উদাহরণ আগের কালের সব কাহিনির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া চাই। আমি বলছিলাম, পুরো ঘটনাটা আমার সামনে আগের কালের কাহিনি আর নাটকের মতো ঘটে গেল। আসলে কথাটা ঠিক নয়। আগের কালের কাহিনির শুরুতে বন্দনা থাকত। আমার গল্পে কোনও বন্দনা নেই। আমার গল্প শুরু থেকে শুরু হচ্ছে না। আমার গল্প মাঝখান থেকে শুরু হচ্ছে। আমার গল্প হচ্ছে এইটুকু :
সাদা ময়লা বোরকায় আচ্ছন্ন এক বুড়ি এক বাস্টপে নামল। বাস্ ছেড়ে দিল। বুড়ি সেই বাসের পিছু পিছু ছুটতে লাগল।
আগের কালের গল্প কীভাবে শুরু হত? শুরু হত এইভাবে :
এক যে ছিল রাজা। তার ঘোড়াশালে ঘোড়া, হাতিশালে হাতি।
না, আমার গল্প আগের কালের গল্পের মতো নয়। একালে কোথায় রাজা! কোথায় এত হাতি-ঘোড়া! এখন তো লোকে সবাই মিলে নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিয়ে বলে : এসো হে, তুমি আমাদের দেশ, জাতি আর সভ্যতা-সংস্কৃতির রক্ষণাবেক্ষণ করো– আমরা তোমায় মাইনে দেব। আর অমনি সে মাথা হেলিয়ে জনসেবার জন্যে কোমর বাঁধে। রাজা-বাদশার গল্প আর রইল কই। একালের গল্প তো আপনার-আমার সবার গল্প। একালের গল্প বিজ্ঞানী, দার্শনিক, শিল্পী, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, কিষান আর মজদুরের গল্প। গল্প আর একালে দরবারে বা মহলে বন্দি নেই। গল্প একালের পথে-ঘাটে ছড়িয়ে রয়েছে।
