শেষে যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের দু ঘণ্টা কেটে গেল আর তাদের পা ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইল, তখন একটা কালো গাড়ি থানায় এসে ঢুকল। সেই গাড়ি থেকে থানার দারোগা সাহেব বেরিয়ে এলেন। আর, তাঁর সঙ্গে কয়েকজন সিপাই। দারোগা সাহেবের হাতে কাগজপত্র আর সিপাইদের ঘাড়ে বন্দুক। খালিহাতে তাদের ফিরতে দেখে মনে হল, যে কাজ নিয়ে তারা সাতসকালে বেরিয়েছিল, সে কাজে তারা সফল হয়নি– আর সেই কাজ নিশ্চয়ই খুব জরুরি, জবরদস্ত কাজ। তাই দারোগা সাহেবকে বড় চিন্তিত দেখাচ্ছে।
নিক্কো দূর থেকেই দারোগা সাহেবকে দেখে উছলে উঠল। বলল, ‘ওই-যে এসে গেছে আমার আপন লোক। ব্যস্, আর ভয় নেই– দু-তিন মিনিটেই সব ঝামেলা চুকে যাবে।‘
এইকথা বলে নিক্কো দূর থেকেই থানার দারোগাকে লম্বা একটা সালাম ঠুকল। দারোগা সাহেব হয় তাকে দেখতেই পেলেন না, কিংবা জ্ঞাতসারেই তার দিকে নজর ফেরালেন না। তার পর, তিনি চলে গেলেন পুলিশ-ব্যারাকের দিকে।
দলিল-লেখক বিদ্রূপভরা আওয়াজে বলল, ‘নিক্কো, আমি বুঝতে পারছি, দারোগা তোমাকে দেখতে পাননি, না হলে নিশ্চয় তোমার সালামের জবাব দিতেন।
নিক্কো বলল, ‘আরে, কী যে বলো মিয়া- দারোগা আমার সালামের জবাব দেবেন নাকি? আর বাপু, তিনি এখন রোয়াবে আছেন, রোয়াবে। কী বুঝলে? থানার দারোগাগিরি, কী বলে, তোমার চাট্টিখানি কথা নয়। দেখছ-না, আমাদের সঙ্গে যদি ভদ্রভাবে কথা বলছেন তো সিপাইগুলোকে কেমন তম্বি করছেন। আর এই সিপাই হারামজাদারা যে কী চিজ, সে তো দেখছই। ওরা হচ্ছে ভেল্কিঅলাদের বাঁদর। যতক্ষণ চোখের সামনে লাঠি রয়েছে, ডুগডুগির তালে তালে নাচবে। আর যেই ভেল্কিঅলা একটু ঢিলে দিয়েছে, তো অমনি লেগে যাবে, মুখ ভ্যাঙচাতে তখন বাঁদর মাথায় চড়বে।’
পাঁচ মিনিট পর দারোগা সাহেব কয়েকজন সিপাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এলেন। জুয়াড়িদের পাশ দিয়ে হেঁটে থানার ফটকের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার পর, সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সিপাইদের সঙ্গে কথায় মগুল হয়ে পড়লেন।
এদিকে থানার অফিসঘরে টেলিফোন বেজে উঠল। একটু পরেই একজন সিপাই ছুটতে ছুটতে দারোগা সাহেবের কাছে গেল। দারোগা সাহেব যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন নিক্কো তাঁকে আর একবার সালাম ঠুকল। দারোগা সাহেব মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালেন, তার পর দ্রুত পা চালিয়ে, চলে গেলেন অফিসের দিকে।
নিক্কো বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলল, ‘বলেছিলাম না, আমার সালামের জবাব দেবে না? কী, জবাব দিল?’
সব জুয়াড়ি চুপ করে থাকল।
নিক্কো আবার বলতে লাগল, ‘একদিনের কথা। থানায় শুধু ও আর আমি রয়েছি ধারে-কাছে কোনও সিপাই ছিল না। তখন কী হল, শোনো। এত মজার মজার কথা শোনাল যে, হেসে একেবারে পেট ফুলে গেল।’
প্রায় আধঘণ্টা ধরে থানার দারোগা সাহেব অফিসের ভেতরেই রইলেন। এরা আবার অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। এমন সময় সকালের সেই সিপাই অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা এদের কাছে এসে কঠোর গলায় বলতে শুরু করল, ‘এ জুয়াড়ি, তোমরা শোনো। দারোগা সাহেবের হুকুম, তোমরা সবাই যার যার ধুতি-পাজামা খুলে মাটির উপর এক লাইনে উবু হয়ে শুয়ে পড়ো। তার পর, একদিক থেকে একজন করে উঠে প্রত্যেককে দশ ঘা করে জুতো লাগাও। জুতো লাগানো হলে অন্যদিকে উবু হয়ে শুয়ে পড়ো। মোট কথা, এইভাবে সবাই সবাইকে একে একে দশ ঘা করে জুতো লাগাও।’
দারোগা সাহেবের এই আদেশ এতই অপ্রত্যাশিত যে, সব জুয়াড়ি হতভম্ব হয়ে গেল। তার পর, সেই অবস্থায় তাকিয়ে রইল সিপাইয়ের মুখের দিকে।
‘প্যাচার মতো সব আমার মুখের দিকে দেখছ কী? হুকুম যদি বুঝতে পেরে না-থাকো, তো আর একবার শুনিয়ে দি?’
এইকথা বলে জবাবের অপেক্ষা না করে সেই কথাগুলোই সিপাই আবার বলে গেল। তখন দলিল-লেখক আর মনসুখ পানঅলা পাগলের মতো ছুটে গিয়ে সিপাইয়ের পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তারা সমস্বরে কাকুতি-মিনতি করে বলল, ‘খান সাহেব, আমরা একেবারে নির্দোষ। এরা সবাই সাক্ষী, আমরা একদম কোনও দোষ করিনি। পুলিশ যখন এল, তখন আমরা খেলছিলামও না–আর খেলার মতলবে সেখানে আমরা যাইনি। আমরা নির্দোষ। খোদা জানেন, আমরা বিলকুল নির্দোষ।’
সিপাই বলল, ‘আমার কিছু করার নেই– দারোগা সাহেবের এই হুকুম।’
ওরা আবার বলল, ‘খানসাহেবজি, বড্ড মেহেরবানি হয় যদি আপনি আমাদের তরফ থেকে হুজুরের কাছে একটু হাতজোড় করে বলেন, আমরা দুজনা বিনাদোষে ধরা পড়েছি। এঁরা সবাই তার সাক্ষী।’
সিপাই বলল, ‘আমি সাক্ষী-টাক্ষী বুঝি-না, বাপু –দারোগা সাহেব সক্কলের জন্যে এই হুকুম দিয়েছেন। হ্যাঁ, আর একটা কথা। উনি বলেছেন যদি ওরা রাজি না হয় তা হলে ওদের সবাইকে আবার গারদে পুরতে হবে। দ্যাখো বাপু, দেরি করা চলবে না। আমাকে এক্ষুনি দারোগা সাহেবের সঙ্গে বাইরে যেতে হবে। গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। তোমরা যদি দেরি করো, তা হলে তোমাদের আবার গারদে বন্ধ করে দিয়ে যাব।’
দলিল-লেখক আর মনসুখ দুজনে নিরুপায় হয়ে আবার লাইনে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের এই পরিণাম দেখে কোনও জুয়াড়ির আর মুখ-খোলার সাহস হল না। দুশ্চিন্তায় আকুল হয়ে তারা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কী করা যায়, তাদের মাথায় তা আসছে না। তাদের চোখ বারবার নিক্কোর ওপর পড়ছে। নিক্কো তাদের দিকে তাকিয়েও দেখছে না। তার দৃষ্টি থানার অফিসঘরের দেয়ালের দিকে। সেই দৃষ্টি বুঝি দেয়াল ভেদ করে থানার দারোগাকে খুঁজে বের করতে চাইছে।
