ইতোমধ্যে নিক্কোর গলায় আরও বেশি আত্মবিশ্বাস জমে উঠেছে। সে খুব সম্ভ্রমের সঙ্গে লরি-ড্রাইভারকে বলল, ‘মীর্জাজি, ভাই রে, অত ভেবো না, অত ঘাবড়িয়ো না– তারও ব্যবস্থা হয়ে যাবে।‘
হঠাৎ দলিল-লেখক ফুঁসে উঠে বলল, ‘ব্যবস্থা হবে, না ছাই হবে। মিরজা, তুমিও দেখছি ওই হামবাটার কথায় কান দিতে শুরু করলে। যে ভোগান্তিতে পড়েছ, তাতে বাপু তোমার নিজেকেই ভুগতে হবে।’
নিক্কো দলিল-লেখকের এই অপ্রত্যাশিত আক্রমণ ক্ষিপ্রভাবে প্রতিরোধ করল। সে খলখলিয়ে হাসতে লাগল। তার পর বলল, ‘নাও, বড়মিয়ার কথা শোনো। উনি বলছেন, ব্যবস্থা নাকি হবে না। আরে বাপু, এখানে যে হর্ মাস মাল-কড়ি খাওয়ানো হচ্ছে, তার কী? ভাইসব, আপনারা শুনুন, আমি আবার বলছি, এটাকে আপনারা ঠাট্টাই ধরে নিন। আমি হিন্দুর মাইরি আর মুসলমানের কসম খেয়ে বলছি, কারও একটা সামান্য চুলও খসা যাবে না। ব্যাপারটা হচ্ছে, থানার দারোগা– আপনাদের আমি আর কী বলব—’
বলতে বলতে সে হেসে ফেলল। তার পর আবার বলল, ‘বলেছি না, উনি আমার আপন লোক? এই– আপনারা আর ছাড়া পেলেন বলে। কিন্তু হ্যাঁ, কাউকে বলবেন-টলবেন না যেন কথাটা। তা হলে কিন্তু সব ফেঁসে যাবে, এই বলে দিলাম। আমাকে কিন্তু তখন দোষ দিতে পারবেন না। আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে– মানে– থানার দারোগা– আপনাদের কাছে আর লুকোনো কেন– মানে, আমার সঙ্গে আত্মীয়তা রয়েছে। শুনলেন তো? কী বড়মিয়া, এবার শান্তি হল মনে? এইটুকু বোঝেন না, যদি এইরকম ধারা ব্যাপার না থাকবে, তো গেল পাঁচবছর ধরে এই এতবড় শহরে এতবড় কারবার আমার চলছে কেমন করে?’
নিক্কো চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। ততক্ষণে তার ইজ্জতের ইমারত আগের থেকেও বেশি দৃঢ় হয়ে উঠছে।
এই জুয়াড়িদের মধ্যে একজন ছিল, যার চেহারায় দুঃখ বা চিন্তার কোনও চিহ্ন দেখা যায়নি। এতসব কাণ্ডর মধ্যেও সে চুপচাপ বসে। সে একটা আটাশ বছরের কৃশ, ক্ষীণাঙ্গী যুবক। পোশাক-আশাক আর হাবভাব থেকে তাকে চমৎকার বেপরোয়াই মনে হচ্ছে। অনেকদিন আগে একবার এই লোকটা বোকার মতো চাল চেলে একটা মোটা অঙ্কের টাকা হেরে বসেছিল। ব্যস্, সেইদিন সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, যেদিন সেই হেরে যাওয়া টাকা আবার জিতবে, সেদিন থেকে সে আর কখনও জুয়ার নাম মুখে নেবে না। আড্ডায় আসার এক ঘণ্টা আগে সে কোনও পার্কে গিয়ে বসে ভালো করে খেলার পরিকল্পনা ছকে নেয়। নানারকমের চাল পর্যন্ত মনে-মনে ঠিক করে রাখে। খেলেও খুব সাবধানে। কখনও মাথা গরম করে না বা উত্তেজিত হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার হারা টাকার পরিমাণ প্রতিদিন বেড়েই চলেছে আর সেইসঙ্গে তার ঋণের পরিমাণও।
এই লোকটার মনে জেল, জরিমানা বা অপমানের জন্য চিন্তা একটুও ছিল না। অবশ্য একটা দুশ্চিন্তা তার ছিল। সেটা হচ্ছে, এরা হল গিয়ে সব ভীতুমার্কা লোক– এ যাত্রা বেঁচেই যাক আর ফেঁসেই যাক, হয়তো এরা আর আড্ডামুখো হবে না। আর, আড্ডামুখো না হলে তার হেরে যাওয়া টাকাগুলো আর উশুল হবে না কোনওদিন।
এদিকে নিক্কো অবস্থা সম্পূর্ণ আয়ত্তে এনে ফেলেছে। যদিও রাত কাবার হওয়ার আগে সে যে খালাস পাওয়ার কোনওরকম ব্যবস্থা করতে পেরেছে, এমন নয়; তবু সে প্রত্যেককে কোনও-না-কোনওভাবে বিশ্বাস করিয়ে ছেড়েছে যে, থানার দারোগা তার নিকট না হলেও দূরের কোনও আত্মীয় তো বটেই– তাই সকাল হলেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। সুতরাং, সবাই মেঝের উপর, সিপাইরা যে পুরনো, ছেঁড়া, দুর্গন্ধযুক্ত কম্বল এনে দিয়েছিল, তাই বিছিয়ে শুয়ে পড়ল হাত-পা ছড়িয়ে।
‘ওহো, বিরাট ভুল হয়ে গেছে!’ নিক্কো হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠল। তার পর বিছানা ছেড়ে উঠে বসল।
অন্ধকারে সব জুয়াড়ি জিগ্যেস করল, কী হল, কী হল –কোনও খারাপ খবর নয় তো?
নিক্কো বলল, ‘ভাই, যদি জানতাম এখানে রাত কাটাতে হবে, তা হলে তো সঙ্গে তাস নিয়ে আসতাম আর সারারাত মজা করে খেলতাম। যদি বলেন তো এখনি কোনও সিপাইকে পাঠিয়ে দিয়ে তাস আর মোমবাতি আনিয়ে নি?’
‘না না বাবা, কাজ নেই– থাক্!’ অনেকেই একসঙ্গে আপত্তি করে উঠল।
নিক্কো, একদম বেপরোয়া হয়ে বলতে লাগল, ‘আপনারা জানেন না– তা হলে কিন্তু ভারি জোর তামাশাখানা হত। সকালবেলা যখন থানার দারোগাকে শোনাতাম, সেও খুব হাসত।’
পরদিন বেলা ন’টার কাছাকাছি একজন সিপাই এসে গারদের দরোজার বাইরে ছিদ্রের কাছে দাঁড়িয়ে উঁচুগলায় হাঁক পাড়ল, ‘এ জুয়াড়ি, তোমরা ওঠো! দারোগা সাহেবের সামনে তোমাদের হাজিরা হবে –ওঠো!’
জুয়াড়িয়া অনেকক্ষণ থেকেই এই হুকুমের প্রতীক্ষায় ছিল। সবার দৃষ্টি একসঙ্গে নিক্কোর ওপর গিয়ে পড়ল। নিক্কো চোখ বেঁকিয়ে বিশেষ ঢঙে হাসল।
পাঁচ মিনিট পর এই দশজন মানুষকে থানার ছোট মাঠটিতে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, তার পর আধঘণ্টা পার হয়ে গেল, কিন্তু থানার দারোগা সাহেবের ছায়া পর্যন্ত দেখা গেল না। এই এতক্ষণ ধরে নিক্কো সর্বক্ষণ ইয়ার্কি-মশকরা, রসিকতা আর হাসি-ঠাট্টা দিয়ে তার সাথিদের মশগুল রেখেছিল। কিন্তু এক ঘণ্টা যখন পার হয়ে গেল, অথচ থানার দারোগা সাহেবকে দেখা গেল না, তখন সব জুয়াড়ি ঘাবড়ে গেল। তাদের মুখের হাসি গেল মিলিয়ে। সবার মুখ কালো হয়ে উঠল। একটা দুর্ভাবনা আর সন্দেহের স্রোত তাদের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। দুশ্চিন্তায় মুখ কালো করে তারা বারবার নিক্কোর দিকে অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল –উত্তরে নিক্কো প্রত্যেককে হাত দিয়ে সবুরের ইশারা করতে লাগল। ইতোমধ্যে দু-তিনজন সিপাই জুয়াড়িদের কাছ দিয়ে টহল দিয়ে চলে গেছে আর নিক্কো প্রত্যেককে ‘খানসাহেবজি! খানসাহেবজি!’ বলে ডেকে চেষ্টা করছে দৃষ্টি আকর্ষণের। কিন্তু তারা না নিক্কোর ডাকের জবাব দিয়েছে, না তার দিকে ফিরে তাকিয়েছে।
