নিক্কো বলল, ‘শেখজি, রাগ হল কেন। ওই-যে আমি বললাম, আপনাদের একটা চুলও খসা যাবে না। দেখবেন, গোঁফে তা দিতে দিতে বেরিয়ে যাব– হেঁ হেঁ, গোঁফে তা দিতে দিতে বেরিয়ে যাব।’
কন্ট্রাক্টর বলে উঠল, ‘থাম্ ব্যাটা গল্পবাজ কাঁহিকা।’
ক্ষুণ্ণ আওয়াজে নিক্কো বলল, ‘গল্পবাজ? আমি? ঠিক আছে, যা মন চায় বলে নিন। কিন্তু আমি ফের বলছি– আপনাদের একজনেরও গায়ে আঁচড়টি পর্যন্ত লাগবে না।’
সরকারি অফিসের অ্যাকাউন্টেন্ট লোকটি এমনিতে জুয়াকে ভীষণ ঘৃণার চোখেই দেখে। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন তার বউ ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়, তখন ওই জুয়ার আড্ডা ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার থাকে না। অফিস ছুটি হলে সে সোজা ওইদিকে পা বাড়ায়। প্রতিবারই হারে, আর নিজেকে গালাগালি করে। প্রতিজ্ঞা করে, আর কখনও ও-পথে হাঁটবে না। কিন্তু পরদিন আড্ডায় গিয়ে হাজির হয় সেই-ই সবার আগে। এই ভদ্রলোক নিক্কোর কথা শুনে ইনিয়ে-বিনিয়ে বিলাপ শুরু করলেন, ‘আরে ভাই, আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেল। আমি সরকারি চাকুরে –আমার আর এক কানাকড়িরও ইজ্জত থাকল না। হায়, আমার বউ-বাচ্চার কী হবে! হায়, নিক্কো আমার সর্বনাশ করে দিল!’
নিক্কো বলল, ‘আহ্ মালেক সাহেব, আমার কথা শোনো…!’
বাধা দিয়ে মালেক সাহেব বলে চললেন, ‘ছাই, শোনার আর কী আছে? হায়, কুক্ষণে আমি তোমার মুখ দেখেছিলাম নিক্কো! ভাই রে, আমি হলাম গিয়ে সরকারি চাকুরে। যদি আমার আপিসের লোকের কানে গিয়ে একবার পড়ে, তো বদনামের একশেষ। আরে, চুলোয় যাক তোমার বদনামি। পনেরো বছরের চাকরি আমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। হায়, আমার বিবি-বাচ্চার কী হবে গো!
মহাজনের ছেলে, যে টাকা কামানোর এই সহজ আর মজাদার পদ্ধতি সদ্য আয়ত্ত করেছিল, এতক্ষণ বেশ গম্ভীরভাবে বসেই ছিল। কিন্তু মালেকের এই বিলাপ শুনে এবারে একবারে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। তার দিকে মনোযোগী হল সবাই।
নিক্কো বলল, ‘ধৈর্য ধরো, ছোট শাহজি, ধৈর্য ধরো। তুমি যে দেখি ভাই একেবারে মেয়েলোকের মতো কাঁদতে শুরু করলে–অ্যাঁ? মরদের মতো বুকে সাহস আনো। আরে ভাই, তাছাড়া, ব্যাপারও তো এমন কিছু নয়।’
মহাজনের ছেলে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমার বাবা যদি জানতে পারে, তা হলে একেবারে ঘর থেকে বের করে দেবে।
নিক্কো বলল, ‘আরে ভাই, ছাড়ো ওসব কথা– কেউ তোমাকে ঘর থেকে বের করে দেবে না।
মালেক বলে উঠল, ‘নিক্কো, এ কেমনধারা কাজ তোমার বলো দেখি?’
নিক্কো খুব জোর দিয়ে বলতে লাগল, ‘মালেক সায়েব, আপনি একটুও চিন্তা করবেন না। আপনি আমার কথা বিশ্বাস করুন। আমি আপনাকে বলেছি-না, আপনার গায়ে একটুখানি আঁচড় পর্যন্ত লাগবে না। এমনভাবে কাজ হাসিল করব, যেন মাখনের ভেতর থেকে চুল বের করে আনছি।’
মালেক শোকার্ত কণ্ঠে বলল, ‘হয়েছে ভাই, হয়েছে– এবার থামো। যদি এতই তুমি কাজের লোক, তা হলে পুলিশকে ঢুকতে দিলে কেন?’
নিক্কো বলল, ‘মালেক সাহেব, আমার কথা বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে সত্যি বলছি, আপনার একটি চুলও খসা যাবে না। আসল ব্যাপার কী জানেন, থানার দারোগা আমার আপন লোক। বুঝলেন কিছু? ও আমার খুব খয়ের খাঁ। আপনাদেরও কিছুটি বলবে না। যদি কিছু বলে, তখন আমার মুখের উপর থুতু ছুঁড়ে মারবেন, হ্যাঁ।’
নিক্কোর এই কথা শুনে যত জুয়াড়ি এক মুহূর্ত নীরবে কী ভাবতে লাগল। কেউ কেউ ডুবতে ডুবতে খড়কুটো ধরে বাঁচতে চাওয়ার মতো তার কথা বিশ্বাস করতে চাইল; আবার কারও কারও চেহারা দেখে মনে হল, তারা নিক্কোর কথা বিশ্বাস করা উচিত কি না সে-ব্যাপারে কিছু ঠিক করতে পারছে না। তবে একথা পরিষ্কার বোঝা গেল যে, তাদের রাগ পড়ে আসছে ক্রমশ।
চামড়ার কারবারি শেখজি বলে উঠল, ‘দ্যাখো নিক্কো, এক-আধশো টাকা কিছু নয়– কিন্তু আমার ইজ্জত যেন রক্ষা পায়। এমনিতে ব্যাপার তো এমন কিছুই নয়। আর, খোদ আমার বোনাই হচ্ছে গিয়ে পুলিশের সাব-ইনসপেক্টর। কিন্তু, তোবা তোবা– এটা কাউকে বলার মতোন একটা কথা হল, বলো?’
নিক্কো ভরসা দিয়ে বলল, ‘শেখজি, আপনি একটুও চিন্তা করবেন না। আমি সেই যে বলেছি না, আপনি এটাকে ঠাট্টাই ধরে নিন। আমার দোস্ত মাঝে মাঝে অমন একাধটুকু দিল্লাগি করেই থাকে।’
‘কে?’ মনসুর পানঅলার মুখ থেকে এই প্রশ্ন সবেগে বেরিয়ে এল। সে তার বিপদে এত বড় বড় সব ব্যক্তিকে সাথিরূপে পেয়ে এতক্ষণ যেন নিজের দুঃখ ভুলেই গিয়েছিল।
‘ওই যে আপনার থানার দারোগা সাহেব বাহাদুর– আর কে।’ ওই কথা বলে নিক্কো হেসে ফেলল।
লরি-ড্রাইভার এককোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে নিক্কোকে খেয়াল করে দেখছিল। এখন তার একেবারে কাছে এসে, তার চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত ভদ্রগলায় বলতে লাগল, ‘দ্যাখো নিক্কো, আমাকে সাতসকালে লরিতে শুকনো ফল বোঝাই করে অনেক দূরে নিয়ে যেতে হবে। ঠিকাদার আমার অপেক্ষায় থাকবে। যদি বাপু তোমার সত্যি এখানে কোনও চেনাজানা থাকে, তো এমন কোনও উপায় করো, যাতে সকাল হওয়ার আগেই আমি এখান থেকে খালাস পাই।’
এমনিতেই জুয়াড়িরা সব শেষপর্যন্ত ধীরে ধীরে নিক্কোর কথায় কান দিতে আরম্ভ করছিল, কিন্তু লরি-ড্রাইভার যে-সুরে নিক্কোর সঙ্গে কথা বলল, তাতে সে স্পষ্টতই নিক্কোর সঙ্গীদের কাছে নিক্কোর কদর বাড়িয়ে দিল। নিক্কোও সেটা অনুভব করল এবং নিজের এই সাফল্যে তার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। অবশ্য লরি-ড্রাইভার যে ভদ্রশ্রেণি থেকে আলাদা হয়ে নিজের একার জন্য নিবেদন পেশ করেছে, সেটাকে কেউ ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারল না, বরং সেটাকে লরি-ড্রাইভারের স্বার্থপরতা আর ছোটলোকির পরিচয় বলেই বিবেচনা করল সবাই।
