তাদের মধ্যে দু জন নির্দোষ লোকও ছিল। একজন হচ্ছে মনসুখ পানঅলা। সে কদাচিৎ খেলত বটে, কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় সে ওখানে খেলার উদ্দেশ্য নিয়ে যায়নি আদৌ। দোকানে এক বন্ধুকে বসিয়ে রেখে সে দশটাকার নোটের ভাংতি নিতে এসেছিল। ভাংতি নেওয়া হয়ে গিয়েছিল, তার পর সে চলেও যাচ্ছিল, এমন সময় এক খেলুড়ের পাতির ওপর তার নজর গিয়ে পড়ল। সেই পাতি ছিল অসম্ভবরকমের ভালো। সেই খেলুড়ে কী চাল চালে, তাই দেখার জন্যে সে সামান্য একটু দাঁড়িয়েছিল, আর তখনই পুলিশ এসে হাজির। ব্যস্, আর যায় কোথায়।
অন্যজন এক বৃদ্ধ দলিল-লেখক। সে কন্ট্রাক্টরকে খুঁজতে খুঁজতে আড্ডা পর্যন্ত এসে হাজির। কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে তার অনেক দিনের পরিচয়। সে চাইছিল, কন্ট্রাক্টর তার ছেলেকেও একটা কোনও ছোটখাটো কন্ট্রাক্টারির কাজ জুটিয়ে দিক। দলিল-লেখক কন্ট্রাক্টারকে কদিন থেকে এমন জায়গা নেই, যেখানে খোঁজ করেনি। শেষে যদি তাকে পেল তো এমন জায়গায় যে, সেখানে খেলার মধ্যে না তার সামান্য ফুরসত ছিল, না এত লোকের সামনে মনের কথা খুলে বলার উপায় ছিল। কন্ট্রাক্টর খেলায় একেবারে মশগুল। আর দলিল-লেখক ভাবছিল, আহা, যদি এখন এই খেলা একটুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে যায় আর বাকি সবাই উঠে একটু বাইরে চলে যায়! কিন্তু তেমন কোনও সম্ভাবনা সে দেখতে পেল না। আর, ওদিকে কন্ট্রাক্টরও খেলেই চলেছে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা ধরে। শেষে দলিল-লেখক নিরাশ হয়ে চলে যাওয়ার কথাই ভাবছিল। এমন সময় পুলিশ এসে জুয়াড়িদের সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে গেল।
ওই দু জন নির্দোষ হওয়ার পক্ষে বহু প্রমাণ উপস্থিত করল, কিন্তু কোনও কথাই শুনল না পুলিশ। বাকি সবাই পুলিশের এই আকস্মিক হানায় এমন হতভম্ব হয়ে পড়ল যে, কারও মুখ থেকে একটা রা সরল না। সিপাইরা আগে খুব সাবধানে সবাইকে আড্ডা থেকে নিচে নামাল। তার পর তাদের চারদিকে দেখে পাহারা দিয়ে পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল থানায়।
অবশ্য, ভাগ্য ভালো, তখন বেশ রাত হয়েছে। কুয়াশার জন্য বেশি লোকের নজর তাদের ওপর পড়েনি। আর, এরা কোটের কলার বা পাগড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে দ্রুত পা চালিয়ে অল্পসময়ে থানায় গিয়ে উঠল। সেখানে দারোগা সাহেবের নির্দেশে সবাইকে বন্ধ করে রাখা হল গারদে।
গারদের নির্জনতায় যখন তারা মজা-দেখা মানুষের বিদ্রূপভরা চোখ, সিপাইদের কড়া দৃষ্টি আর কঠোর ধমক থেকে রেহাই পেল, আর চেনাজানা মানুষের চোখে চোখ পড়ে যাওয়ার ভয় থাকল না, তখন সবার আগে তাদের সবার মনোযোগ আড্ডার মালিকের ওপর গিয়ে পড়ল। সে-ও সবার সঙ্গে গারদে আটকা পড়েছে। প্রত্যেকে তাকেই সর্বনাশের হেতু বলে মনে করতে লাগল। তাই, যত রাগ গিয়ে পড়ল তার ওপর। এই লোকটা যদি সতর্ক থাকত, তার ঘরটাকে অমন হাট করে না-রাখত, জানা নেই শোনা নেই, একে-ওকে-তাকে ঢুকতে না-দিত, আড্ডার বাইরে একজনকে নজর রাখার জন্য বসিয়ে রাখত, তাছাড়া পুলিশের লোকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখত, তা হলে তাদের আজ পড়তে হত না এই কঠিন দুর্দশার মুখে।
আড্ডার মালিকের নাম যে কী ছিল, আল্লাই জানেন। সবাই তাকে ‘নিক্কো’ বলে ডাকে। মাঝারি লম্বা, ক্ষীণ শরীর। বড় বড় চোখে সুর্মা টানা। ছোট ছোট পাকা গোঁফ। মুখে বসন্তের আধো-আধো দাগ। অতিরিক্ত পান খাওয়ার ফলে দাঁত কাঁচে লাল। কোঁকড়া চুল সবসময় আমলা তেলে চোবানো। বাঁ-দিকে টেরি কাটা, ডানদিকের চুল কপালে ভিড় জমানো। গায়ে মখমলের কোর্তা, তাতে সোনার বোতাম। গলায় ছোট একটি সোনার তাবিজ–কালো ডোরে ঝোলানো। তার গায়ের কোর্তা প্রায়শ পরিষ্কারই থাকে, কিন্তু ধুতি থাকে ময়লা, শীতকালে এই পোশাকের উপর থাকে জরি-পাড়ের পুরনো এক লাল দোশালা। তার চলনে-বলনে হুলোবেড়ালের ফুর্তি। একজন পুরনো ঘাগু জুয়াড়ি যতটুকু সময়ে একবার তাস ফেঁটে বেঁটে দিতে পারে, সেই সময়ে সে অন্তত দুবার তাস ফাঁটা-বাঁটা শেষ করে।
এই হানার জন্য নিক্কো আগে থেকেই তৈরি ছিল। পুলিশের হানা দেওয়ার সময় থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত সে দুই ঠোঁট এক করে চুপ মেরে ছিল। এতবড় ঝক্কি-ঝামেলায় তার আচরণ যেন একটা তৃতীয় ব্যক্তির সমান। কিন্তু এবার যখন চারদিক থেকে তার ওপর তীব্রদৃষ্টির আক্রমণ শুরু হল, তখন সে নড়েচড়ে বসে যেন আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে নীরবে একটি মধুর হাসি ছাড়ল। সেই হাসির মধ্যে যেন কিছু গোপন কৌতুক লুকিয়ে রয়েছে। সেই হাসি তার ঠোঁটে লেগে থাকল অনেকক্ষণ ধরে। সে ধীরে-সুস্থে নিশ্চিন্তভাবে সবার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। তার পর গভীর আত্মবিশ্বাসের সুরে বলল, ‘আপনারা একদম চিন্তা করবেন না। আমি আপনাদের একেবারে ঠিক কথাটি বলছি, আপনাদের মাথার একটি চুলও খসা যাবে না। আমার ওখানে গত পাঁচবছরে এমন কাণ্ড আর কখনও হয়নি। কী বলে, আপনারা এটাকে ঠাট্টা ধরে নিন গো বাবু, ঠাট্টা।
জুয়াড়িরা সবাই নিক্কোর এই কথা শুনল। কিন্তু তাতে কারও রাগ একবিন্দুও পড়ল না। কেউ ঘাড় নাড়ল, কেউ মুখ ঘুরিয়ে নিল।
কন্ট্রাক্টর বলল, ‘হুঁ, ঠাট্টা ধরে নেব –না? আহা, প্রাণ জুড়িয়ে দিলে!’
চামড়ার কারবারি লাফিয়ে উঠে বলল, ‘তোবা তোবা! তুমি তো ভারি মজার লোক হে! এখানে লাখ টাকার ইজ্জত ধুলোয় গড়াগড়ি যাচ্ছে, আর তুমি বলছ কি না ঠাট্টা?’
