বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল রশিদ। আগে এ-বাড়িতে কত লোকজন থাকত, আর এখন একেবারে ফাঁকা ফাঁকা। দরজায় মাড়সার জাল। বোঝা গেল, এ-বাড়িতে লোকজনের যাতায়াত কম। মাথা থেকে মাকড়সার জাল ছাড়াতে ছাড়াতে এগিয়ে গেল আরও কিছুদূর। উড়ে পালাল একটা চামচিকে। দেয়ালের আস্তর খসে গেছে। ফাটল থেকে গজিয়ে উঠেছে পাকুড়গাছ। উঠোনে কয়েকটা গরু বাঁধা। একজন লোক দুধ দোয়াচ্ছিল। বলে, ‘কেডা?’
কী পরিচয় রশিদের, কেমন করে সে জানাবে। বলবে নাকি, আমি পাথর। আমি শিলায়িত ইতিহাসের জঞ্জাল। তুমি আমাকে চিনবে না। আমাকে চেনে ওই বুড়ো বটগাছ। আমাকে চেনে রূপসা নদী। আমার পরিচয় রূপসার দুই কূলের মাটিতে। সে মাটির সোঁদা গন্ধ এখনও আমার শরীরের পরতে পরতে মিশে রয়েছে। সেই মাটিতে একদিন আমার শেকড় ছিল। শেকড় ছিঁড়ে গেছে। মাটির সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক যার বিচ্ছিন্ন, সে মৃত। আমি মরে গেছি। আমি শিলায়িত প্রস্তর। আমি ইতিহাসের জঞ্জাল।
হাঁটতে হাঁটতে আবার ফিরে এল রূপসা নদীর ধারে। শহরে শহরে এতদিন সে ঘুরে বেড়িয়েছে। এখানে সে আগন্তুক। এখানকার মানুষ নয় শুধু– এখানকার ধান, পাট, গুল্মলতারাও হয়তো তাকে চেনে না। এখানকার মাঝি-মাল্লার গলায় ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া কতদিন শোনা হয়নি। সে আগন্তুক। এখানকার বাতাসও হয়তো তাকে আর চিনবে না।
অথচ, এখানকার মাটি আর বাতাসের টানেই সে চলে এসেছে। খুলনা এসেছিল সরকারি কাজে। কাজ ফুরোলে রোববারের সকালে নৌকায় করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। রূপসা নদী সোজা এখানে টেনে আনল তাকে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি দেখার তার বড় সাধ।
ডাকবাংলোর কাছে পুকুর। সেই পুকুরের ধারে গিয়ে রশিদ বসল। পানিতে ঢিল ফেলল। একইরকম পরিচিত ঢেউয়ের বৃত্ত উঠল, মিলিয়ে গেল।
কারও সঙ্গে দেখা হল না। কোথায় তারা, কে জানে। ফটিক, মানিক, জামাল, রবিউল, পার্বতী। ছোটবেলায় কত তারা একসঙ্গে খেলেছে। ঝগড়া করেছে। পেয়ারাগাছের ডাল ধরে ঝুলেছে। গাছের ডালে বসে কাঁচা কাঁচা পেয়ারা চিবিয়েছে। পার্বতীর যখন সাত বছর বয়েস, তখন তার বাবা বদলি হয়ে গেলেন শান্তিপুর। তার কয়েক বছর পরে দেশ স্বাধীন হল। পার্বতীরা এখন হয়তো ভারতের বাসিন্দা।
ছাব্বিশ বছর পর্যটনের পর আজ এই অবস্থা। ঢাকাতেও ছিল। কিন্তু ঢাকা তার ভালো লাগেনি। ঢাকা যেন ব্যাধিগ্রস্ত। বেদনায় কুঁকড়ে যাওয়া শহর।
বেদনায় কুঁকড়ে গেল রশিদও।
বটগাছের পাতার মতো তার অস্তিত্ব। পাতা ঝরে গেলে তার কথা কেউ মনে রাখে না। বাতাসের ঝাঁপটায় সে এখন পাতার মতোই উড়ে বেড়াচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে বটতলায় এসে দাঁড়াল রশিদ। আহা, এ গাছের ছায়ায় দাঁড়ালে সমস্ত দুঃখ ধুয়ে মুছে যায়। নাপিত চুল কাটছে। জ্যোতিষী তার পুরনো, ময়লা পুঁথি খুলে বসে রয়েছে ভাগ্যসন্ধানীর অপেক্ষায়। রশিদ তাদের মধ্যে গিয়ে বসে পড়ল।
নাপিতের কাঁচি আর মুখ একসঙ্গে চলছে দ্রুতগতিতে। রাজ্যের যত কথা তার পেট থেকে বেরুচ্ছে। ওদিকে জ্যোতিষীর কথায় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। কেউ কেউ বটগাছের গুঁড়িতে মাথা রেখে শুয়ে রয়েছে। দুপুরের রোদ প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়াচ্ছে। আস্ত জিভটা বের করে দিয়ে হাঁপাচ্ছে একটা কুকুর। বটগাছের নিচে ঠাণ্ডা হাওয়া।
নাপিত বলল, ‘রূপসা নদীর ওপরে একটা পুল হচ্ছে।’
‘হুঁহ্!’ জ্যোতিষীর সংক্ষিপ্ত উত্তর।
‘এঞ্জিনিয়ার আইচিল– নদীর পানি মাপে গেচে।’
‘হ্যাঁ, শুনেছি। খুব শিগগির এই গ্রাম একটা শহর হয়ি যাচ্চে।’
‘এখানে বড় বড় দালান উঠপে।’
‘এখানের রাস্তায় হরদম ভোঁ-ভোঁ মটরগাড়ি চলবে।’
‘শুনেচ কিছু, এখানে নাকি একটা বড় কারখানা হচ্চে?’
‘কোথায়?’ প্রশ্ন করল রশিদ।
নাপিত বলল, ‘তুমি যেখানে বসে রয়েচ।’
‘আর এই বটগাছটা?’
নাপিত বড় নিশ্চিন্ত মনে বলল, ‘বটগাচ? কত বটগাচ কাটা হয়ি গেল। আর এটা কাটা পড়লি কি আর মহাভারত অশুদ্ধ হয়ি যাচ্চে!’
মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে! কী আশ্চর্য! রশিদ ভাবতে লাগল, তার তিনপুরুষের এই বটগাছের শেকড়ও তা হলে নড়বে! রূপসার সঙ্গে তার সম্পর্ক চুকেছে। আত্মীয় নেই, জন নেই– ছিল একমাত্র এই বটগাছ, যে তাকে চিনতে পেরেছে, সুশীতল কোলে দিয়েছে ঠাঁই, সে-ও থাকবে না।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
জুয়াড়ি – গোলাম আব্বাস
পুলিশ এত সাবধানে হানা দিয়েছিল যে, তাদের একজনও পালাতে পারল না। পালাবে কোন্ দিকে? আড্ডায় যাওয়ার একটাই সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি পুলিশ আগে থেকেই দখল করে বসেছিল। বাকি থাকে জানালা। কোনও বাহাদুর জানের পরোয়া না-করে যদি জানালা দিয়ে লাফিয়েও পড়ত, তা হলে প্রথমত, তার হাঁটু আস্ত থাকত না; আর যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, বেশি চোট সে পেল না, তা হলেও পালাবার সুযোগ সে পেত না; কারণ আধ ডজন পুলিশের সিপাই নিচেই বাজারে আড্ডার ঘরটিকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। অতএব, তারা সব-কজন জুয়াড়ি, সংখ্যায় দশজন — ধরা পড়ে গেল।
ঘটনাক্রমে, সেদিন যেসব জুয়াড়ি আড্ডায় এসেছিল, তাদের মধ্যে দু-একজন পেশাদার জুয়াড়ি বাদে বাকি সবাই কখনও-সখনওর শখের খেলুড়ে। এমনিতে তারা সম্মানি আর অবস্থাপন্ন লোক। তাদের মধ্যে একজন ছিল কন্ট্রাক্টর, একজন সরকারি কর্মচারী, একজন মহাজনের ছেলে, একজন লরি-ড্রাইভার, আর একজন চামড়ার কারবারি।
