যেমন তাড়াতাড়ি আসা, তেমনি চলে যাওয়া। প্যান্টের ভাঁজ ভেঙে গেছে অনেক জায়গায়। চুলগুলো এলোমেলো ছড়ানো। যেন এখনই বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছে সে। সুলতানা মোড়কটা খুলে ফেলল। সার্টিনের কালো শালওয়ার। আনওয়ারির কাছে যেমনটি দেখে এসেছে।
শঙ্করের কাছে ব্যবসায়ী পরাজয়ের কথা, দুল হারানোর কথা একনিমিষে সে ভুলে গেল। শালওয়ারটা পেয়ে আর শঙ্করের প্রতিশ্রুতি রক্ষা দেখে সুলতানা ভুলে গেল সমস্ত দুঃখ-বেদনার কথা।
দুপুরবেলায় লন্ড্রি থেকে নিয়ে এল রাঙানো কোর্তা আর ওড়নাখানা। কোর্তা, ওড়না, শালওয়ার পরে সবে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় দরজায় আবার খট খট শব্দ।
আনওয়ারি ভেতরে ঢুকে কাপড় তিনটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোর্তা আর ওড়নাখানা তো রঙ করিয়েছ। কিন্তু শালওয়ারটা দেখছি নতুন। কবে বানালে?’
সুলতানা বলল, ‘আজ সকালেই দিয়ে গেল দরজি।’ আনওয়ারির কানের ওপর চোখ পড়তেই সে আবার বলল, ‘দুলজোড়া কোথায় পেলে?’
আনওয়ারি বলল, ‘আজই আনিয়েছি।’
তার পর, সুলতানা আর আনওয়ারি–দুজনেই চুপ মেরে গেল কিছুক্ষণের জন্য।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
আত্মীয় – গোলাম মোহাম্মদ
রূপসা নদীর ওই পারে নতুন নতুন বাড়ি উঠছে। নারিকেল, খেজুর, সুপারিগাছ– যারা এতদিন আত্মীয়ের মতো জড়াজড়ি করে ছিল, তারা আর নেই। নতুন বাড়ি আরও অনেক তৈরি হচ্ছে। এখানে-সেখানে ইঁটের পাঁজা। শিক আর গৃহনির্মাণের অন্যান্য সামগ্রী স্তূপাকারে পড়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও বড় বড় ক্রেনে কাজ চলছে।
পরিবর্তন হয়নি শুধু গোলাকার পাকা চত্বরের কাছের ওই বটগাছটার। ওর অসংখ্য ঝুরি মাটি ফুঁড়ে কাণ্ডে পরিণত হয়েছে। মাটির সঙ্গে ওদের বহুকালের আত্মীয়তা এখনও অটুট রয়েছে আগের মতোই। রশিদের দাদা বলতেন, অমুক সনে তাঁরা যখন আজমগড় থেকে এখানে এসে বসতি করেছিলেন, তখন বটগাছটার উঠতি বয়েস।
রূপসা নদীর সঙ্গে রশিদের আশৈশবের পরিচয়। এখনও এই নদীর পানিতে ঢেউ ওঠে। এখনও এ নদীর বুকে যৌবনের উন্মাদনা। নদীর এই পারে নতুন তিনটা ঘাট হয়েছে বটে, কিন্তু মাঝিরা আগের মতোই উচ্চসুরে গলা চড়িয়ে ভাটিয়ালি গায়, জেলেরা মাছ ধরে।
কতদিন আগের কথা! রশিদ দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। রূপসাকে কতকাল দেখা হয়নি। এই রূপসার পানিতে সে কত ডুব দিয়েছে, সাঁতার কেটেছে। আহা, এই রূপসা তার জননীর মতো। রূপসার দুই কূলের মাটি তার গায়ের সঙ্গে মিশে রয়েছে। এই মাটি ছেড়ে সে পূর্বপাকিস্তানের কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। এ মাটি তাকে আর চিনতে পারবে না। রশিদের দু গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
নতুন নতুন বাড়ি উঠেছে। এইসব বাড়ি এখানকার চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। আরও অনেক নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। এখানে-সেখানে ইটের পাঁজা। লোহার শিক আর অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী স্তূপাকারে পড়ে রয়েছে। আত্মীয়ের মতো জড়াজড়ি করে ছিল যেসব নারিকেল, খেজুর, সুপারিগাছ, তারা আর নেই। রয়েছে শুধু পুরনো বটগাছটা, যার অসংখ্য ঝুরি মাটি ফুঁড়ে কাণ্ডে পরিণত হয়েছে। এই বটগাছ না থাকলে জায়গাটা চেনাই দায় ছিল।
রাস্তাগুলো আগের মতোই এখনও কাঁচা। এই রাস্তা দিয়ে কত ছুটোছুটি করেছে রশিদ। ছুটতে ছুটতে এক রাস্তার শেষ মাথায় ছিল পেয়ারাগাছ। সে গাছের গন্ধ যেন এখনও তার নাকের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে। অনেকদিন বাড়ি থেকে রাগ করে সে পালিয়ে গেছে। পালিয়ে গিয়ে বসে থেকেছে ওই পেয়ারাগাছের ডালে। বাবা তাকে খুঁজতে খুঁজতে এসে গেছেন পেয়ারাগাছ পর্যন্ত। বলেছেন, ‘খুলনা যাবা না? নামো, নামো, তাড়াতাড়ি করো।
মনে পড়ছে, ওই রাস্তাতেই খেজুরগাছে মাটির হাঁড়ি বাঁধা থাকত। শীতের সন্ধ্যায় খেলতে খেলতে ওরা সবাই মিলে ছিটকেল দিয়ে হাতের তাক ঠিক করত। কে আগে ভাঙতে পারে রসের হাঁড়ি। বেশির ভাগসময় রশিদই জয়ী হত। হাঁড়ি ভাঙতে পারলে টপটপ করে রস পড়ত। আর, তাই ওরা খেত আকাশপানে মুখ উঁচিয়ে, জিভ বের করে।
ওরা সব কোথায় গেল, কে জানে। হয়তো দেখা পেয়ে যাবে, হয়তো পাবে না। আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল রশিদ। ওই-যে তাদের সেই পুরনো স্কুল। আর একটু এগিয়ে গেলে পড়বে তার বাপ-দাদার ভিটেবাড়ি।
আহা, সেই বাড়ির এই অবস্থা! দেখলে বুক ফেটে যায়। এই বাড়ির জন্যই চাচা ঝগড়া করে লাহোর চলে গিয়েছিলেন। তিনি একাই দাদার সমস্ত সম্পত্তি হাতাতে চেয়েছিলেন। বাবা চুপ থাকতেন, কিছুই বলতেন না। কিন্তু চাচা তবু ঝগড়া বাধাতেন। বাবা বলেছিলেন, এ সম্পত্তিতে তাঁর কোনও লোভ নেই। তিনি সব সম্পত্তি চাচাকে ছেড়ে দিতে পারেন। কিন্তু রহিমা ফুফু বিধবা। তাঁকে বঞ্চিত করা কিছুতেই উচিত হবে না। তার পর চাচা লাহোরে থাকতে থাকতেই রহিমা ফুফু মারা গেলেন। বাবা ছিলেন রেলের ইঞ্জিনিয়ার। রূপসা থেকে তিনি বদলি করিয়ে নিলেন। বহু কষ্টে চাচার ঠিকানা জোগাড় করে লিখলেন: তুমি যদি এই বাড়ি চাও তো রূপসা ফিরে এসো। আমি চলে যাচ্ছি। আমার সমস্ত সম্পত্তি তোমার জন্য ওয়াজেদ আলীর কাছে রেখে গেলাম।
তার পর, ত্রিশ বছর পার হয়ে গেছে। রশিদ জানে না, কী হয়েছে। বাবা আর কোনওদিন ফিরে আসেননি। তিনি কোনওদিন কারও কাছে খোঁজ নেওয়ারও চেষ্টা করেননি।
