‘আচ্ছা, দেখছি চেষ্টা করে।’ খোদাবখ্শ উঠে পড়ল, ‘এখন আর মনখারাপ কোরো না। আমি চট করে হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসছি।’
হোটেল থেকে খাবার এনে দুজনে তাই গিলল কোনওরকমে। তার পর শুয়ে পড়ল।
সকালবেলায় বিছানা থেকে উঠে খোদাবখ্শ রওনা দিল পুরনো কেল্লার দিকে। সুলতানা একলা পড়ে থাকল বিছানায়। কিছুক্ষণ শুয়ে শুয়ে আইঢাই করল, কিছুক্ষণ ঘুমাল, কিছুক্ষণ উঠে টহল দিল ইতস্তত।
দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে কোর্তা আর ওড়নাটা নিয়ে নিচে দিয়ে এল লন্ড্রিতে। ধোলাই ছাড়া কাপড়-রাঙানোর কাজও হয় সেখানে। তার পর ঘরে ফিরে এসে সুলতানা ফিল্মের পত্রিকা পড়তে লাগল। ইতঃপূর্বেই সে দেখেছে, এমন ছবির কাহিনি আর গান রয়েছে তাতে। পড়তে পড়তে আবার ঘুম এল তার। চারটে বাজলে তবে ঘুম ভাঙল। গোসলটা সেরে নিয়ে, একটা গরম চাদর গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। প্রায় এক ঘণ্টা এমনি করে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকল সে।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রাস্তায় আর দোকানে আলো জ্বলেছে। জৌলুশ চারদিকে। একটু একটু শীত পড়েছে। কিন্তু সুলতানার তেমন খারাপ লাগছে না শীতটা। রাস্তায় পায়েহাঁটা লোকজন আর গাড়ি-ঘোড়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। হঠাৎ শঙ্করকে দেখতে পেয়ে সে চমকে উঠল। রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে তেমনি সুলতানার দিকে তাকিয়ে সে হাসছে। সুলতানা অজ্ঞাতসারে হাতটা একবার নাড়ল। শঙ্কর উপরে এসে গেলে সুলতানা চিন্তিত হয়ে পড়ল। কোন্ কথাটা বলবে তার সঙ্গে– চিন্তা এই সমস্যা নিয়ে।
অথচ, সে তাকে ডাকতে চায়নি। শুধুশুধু হাতছানি দেওয়ার কী এমন দরকারটা ছিল!
ওদিকে শঙ্কর নিতান্ত নিশ্চিন্ত। এটা যেন তারই নিজের বাড়ি। প্রথমদিনের মতোই আজও সে কোলবালিশটা মাথার নিচে রেখে শুয়ে পড়ল। নিশ্চিন্ত মনে।
সুলতানাকে কিছুই বলতে না দেখে শঙ্কর নিজেই কথা পাড়ল, ‘হাজার বার এমনি করে তুমি আমায় ডাকতে পারো, আবার হাজার বার ফিরিয়েও দিতে পারো– আমি কিছুই মনে করব না।‘
সুলতানা দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘না, বোসো। আজকে আর আমি তোমাকে ফিরে যেতে বলব না।’
মুখের মধ্যে স্বভাবসিদ্ধ হাসি ফুটিয়ে শঙ্কর বলল, ‘তা হলে আমার শর্ত তুমি মেনে নিচ্ছ বলে মনে করতে পারি।’
সুলতানা হাসল, ‘কিসের শর্ত? কোন্ শর্ত? আমাকে তুমি বিয়ে করতে চাও নাকি?’
‘বিয়ে? কী যে বলো! আমরা কি আর বিয়ে করার লোক! বিয়ে কি আর আমাদের পোষায়! বাদ দাও যতসব বাজে কথা। এখন কিছু কাজের কথা হোক।’
‘তুমিই বলো-না, কী বলব।’
‘তুমি মেয়েমানুষ। এমন কিছু বলো, যাতে মনে একটু ফুর্তি পাই। এই দুনিয়ায় ব্যবসায়ী কথাটাই সবকথা নয়। ব্যবসা ছাড়াও আরও অনেককিছুই রয়েছে বলবার মতো, শুনবার মতো।’
এমন কথা সুলতানা আর কখনও শোনেনি। তাই শঙ্করকে খুব ভালো লেগে যায় তার। সে বলল, ‘আমার কাছে কী চাও তুমি?’
‘সবাই যা চায়, তাই। তার চাইতে বেশি কিছু না।’ শঙ্কর উঠে বসল।
‘তা হলে আর পাঁচজনের সঙ্গে তোমার তফাতটা কোথায়?’
‘অনেক অনেক তফাত –আকাশের সঙ্গে পাতালের যেমন তফাত। তবে, তোমার-আমার মধ্যে কোনও তফাত নেই। তাছাড়া, এমন অনেক কথা আছে, যা বোঝানো যায় না, নিজের থেকেই বুঝে নিতে হয়।’
সুলতানা কিছুক্ষণ চিন্তা করল শঙ্করের কথাটা। তার পর না-বুঝেই বলল, ‘আমি বুঝেছি। ‘
‘তা হলে বলো, এখন কী করতে চাও।’ শঙ্কর উঠে দাঁড়াল। এমনি শুধুশুধু হাসতে থাকল সে। তার পর আবার বলল, ‘আমার নাম শঙ্কর! ভারি অদ্ভুত নাম, তাই না? এসো, ভিতরে যাই।’
শঙ্কর আর সুলতানা শতরঞ্চি-বিছানো কামরাটায় এসে ঢুকল। ওরা দুজনেই হাসছে। কে জানে, কিসের এই কলকণ্ঠ হাসি।…
.
শঙ্কর যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এমন সময় সুলতানা বলল, ‘শঙ্কর, আমার একটা কথা রাখবে?’
শঙ্কর বলল, ‘কথাটাই আগে শুনি।’
‘তুমি হয়তো ভাববে, আমি দাম উশুল করতে চাই। কিন্তু–’
‘বলোই-না, থামলে কেন?’
–তুমি তো জানোই, মহরম এসে গেছে। কিন্তু আমার কাছে এমন পয়সা নেই যে, একটা কালো শালওয়ার তৈরি করতে পারি। আমার পানে কেউ তো মুখ তুলে চাইল না। একটা কোর্তা আর ওড়না ছিল, তাই রঙ করতে দিয়েছি।’
‘মানে, তুমি বলতে চাও, আমার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে শালওয়ার তৈরি করবে, তাই না?’
সুলতানা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘না, না, আমি তা বলতে যাব কেন? সম্ভব হলে তুমিই একটা শালওয়ার যদি এনে দিতে!’
শঙ্কর হাসল, ‘আমার পকেটে পয়সা-কড়ি খুব কমই থাকে। তবু চেষ্টা করব। মহরমের পয়লা তারিখে শালওয়ার পেয়ে যাবে। কেমন, এখন খুশি তো?’
সুলতানার দুলদুটির দিকে তাকিয়ে সে আবার বলল, ‘দুলদুটি আমাকে দিতে পারো, সুলতানা?’
‘এ নিয়ে তুমি কী করবে? চাঁদির মামুলি দুল বৈ তো আর না। বড়জোর টাকা পাঁচেক দাম।’
‘আমি তো তোমার কাছে দুলদুটোই চেয়েছি। দাম শুধোইনি। বলো, দেবে?’
‘এই নাও।’ দুল খুলে শঙ্করকে দিয়ে দিল সুলতানা। দুলদুটি চলে যাওয়ায় মনে-মনে দুঃখ হল তার। কিন্তু শঙ্কর এতক্ষণে চলে গেছে সেখান থেকে।
সুলতানা আদৌ ভাবতে পারেনি, শঙ্কর তার কথা রাখবে। আট দিন পরে, মহরমের ঠিক এক তারিখে, সকাল ন’টায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে সুলতানা দরজা খুলে দেখল, শঙ্কর।
খবরের কাগজের মোড়কটা সুলতানার হাতে তুলে দিয়ে শঙ্কর বলল, ‘সার্টিনের শালওয়ার। এক-আধটু লম্বা হতে পারে। এখন তা হলে চলি, কেমন?
