শঙ্কর এতক্ষণ বসেই ছিল, এখন শুয়ে পড়ল, ‘আমি কী বলব, তুমিই বলো না! তুমিই তো আমাকে ডেকেছ।’
সুলতানা অবাক হয়ে গেল কথা শুনে। মুখে তার রা সরল না।
তখন লোকটা আবার উঠে বসল, ‘বুঝেছি। তা হলে আমিই বলছি, শোনো। ধরো আমাদের দুজনের মধ্যেই ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে, আমার বেলায় অন্য কথা। যারা এখানে এসে কিছু দিয়ে যায়, আমি তাদের দলের নই। ডাক্তারদের মতো আমাকেও ফি দিতে হয়। একবার আমাকে ডেকে কাজ আদায় করে নিলে ফি আমাকে দিতেই হবে।
সুলতানা ঘাবড়ে গেল কথা শুনে। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই সামলে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি কী কাজ করো?’
শঙ্কর জবাব দিল, ‘তোমরা যা করো, তাই।’
‘কী কাজ সেটা?’
‘তুমি কী করো?’
‘আমি– আমি– আমি তো কিছুই করিনে।’
‘তা হলে আমিও কিছুই করিনে।’
‘এটা একটা কথা হল? একটা কিছু করো নিশ্চয়?’ ‘তুমিও কিছু-একটা করো নিশ্চয়।’
‘হায়-হায় করি।’
‘আমিও হায়-হায় করি।’
‘তা হলে এসো, আমরা দুজনেই এখন হায়-হায় করি।’
‘আমি প্রস্তুত। তবে হায়-হায় করার জন্যে আমি কখনও কাউকে দাম দিই না।’
‘মাথা খারাপ নাকি তোমার? এটা কি লঙ্গরখানা পেয়েছ?’
‘আর আমিও কিন্তু ভলান্টিয়ার নই।’
একটু থেমে সুলতানা বলল, ‘ভলান্টিয়ারটা আবার কী জিনিস?’
‘শুয়োরের ছা।’
‘আমিও তা হলে শুয়োরের ছা নই।’
‘কিন্তু তোমার সঙ্গে খোদাবখ্শ বলে যে লোকটা থাকে, সে নিশ্চয় শুয়োরের ছা।’
‘কেন?’
‘কারণ কয়েকদিন থেকে সে একটা ফকিরের কাছে যাচ্ছে ভাঙা কপালের দাওয়াই আনতে। অথচ সে ব্যাটার নিজের কপালই একেবারে মরচে ধরে যাচ্ছেতাই।’ শঙ্কর হাসল।
সুলতানা বলল, ‘তুমি হিন্দু। তাই আমাদের ফকির-দরবেশদের নিয়ে ঠাট্টা করতে পারছ।’
শঙ্কর আবার হাসল, ‘এখানে বসে হিন্দু-মুসলমানের প্রশ্ন ওঠানোর কোনও মানে হয় না। এটা পতিতালয়। এখানে ঠাকুর-পুরুত, ফকির-দরবেশ সবার মূল্যই সমান।’
‘ওসব বাজে কথা রাখো। থাকবে কি না তাই বলো।’
‘থাকব-না কেন! তবে আগে যা বলছি, সেই শর্তে।’
সুলতানা উঠে দাঁড়াল। দরোজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘যাও, তবে পথ দ্যাখো!’
শঙ্কর নিশ্চিন্ত মনে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘প্রায়ই এই রাস্তায় আমাকে দেখতে পাবে। দরকার পড়লে ডেকো। বিশ্বাস করো, আমি খুব কাজের লোক। এতটুকু ফাঁকি পাবে না আমার কাছে।’
শঙ্কর চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার কথাই ভাবল সুলতানা। কালো পোশাকের কথা এখন সে ভুলেই গেছে।
সুলতানার মনের বোঝা অনেকখানি হালকা করে দিয়েছে শঙ্কর। শঙ্কর যদি আম্বালায় আসত, যে আম্বালায় তার সুখ-সমৃদ্ধির অন্ত ছিল না– তা হলে শঙ্করকে সে অন্যদৃষ্টিতে দেখত। কিন্তু এখানে অন্যরকম দিনকাল। এখানে শান্তি নামক পদার্থটি পলাতক। তাই শঙ্করের কথা তার খুব ভালো লেগে গেছে।
সন্ধ্যায় খোদাবখ্শ ফিরে এলে সে বলল, ‘আজকে সারাটা দিন কোথায় ছিলে?’
খোদাবখ্শ ক্লান্তিজড়িত কণ্ঠে জবাব দিল, ‘পুরনো কেল্লার কাছ থেকে আসছি। দিনকয়েক থেকে এক ফকির সেখানে এসে আস্তানা গেড়েছেন। তাঁর কাছে রোজই যাই।’
‘কিছু বলেছেন তিনি?’
‘না। এখনও তিনি মেহেরবানি করেননি। কিন্তু সুলতানা, তুমি দেখে নিও, আমার এত পরিশ্রম বিফল যাবে না। আল্লা চান তো নিশ্চয় সুফল ফলবে।’
কান্নায় ভেঙে পড়ে সুলতানা বলল, ‘সারাটা দিন তুমি পালিয়ে পালিয়ে থাকো, আর আমি থাকি খাঁচায় বন্দি হয়ে। একটুখানি নড়াচড়া করার জোটুকু পর্যন্ত নেই। মহরম এসে গেছে। আমার কালো কাপড়ের কথা কি তুমি একটিবার ভেবেছ? ঘরে একটি কানাকড়ি নেই। কাঁকন কটা একে একে বিক্রি করে দিলাম। তুমি বলো, এখন কী করব। এমনি করে ফকিরের পিছনে আর কতদিন ঘুরে ঘুরে মরবে? দিল্লি এসে অবধি আল্লাতালাও যেন আমাদের ওপর বিরূপ হলেন। আমার কথা শোনো। এক-আধটা ব্যবসা-ট্যাবসা করো। নইলে কেমন করে চলবে, বলো!’
খোদাবখ্শ শতরঞ্চির উপর ক্লান্ত শরীরটাকে বিছিয়ে দিয়ে বলল, ‘কিন্তু তার জন্যেও তো টাকা দরকার। আল্লার দোহাই, তুমি আর অমন করে কান্নাকাটি কোরো না। আমি আর সহ্য করতে পারছিনে। আম্বালা ছেড়ে এসে সত্যিই বড় ভুল করেছি। কিন্তু আল্লার ওপর ভরসা রেখো। তিনি যা করেন, ভালোর জন্যেই করেন। হয়তো আর কিছুদিন কষ্ট করার পরই –‘
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সুলতানা বলল, ‘যাই হোক, একটা কিছু করো! চুরি করে হোক, ডাকাতি করে হোক– আমার জন্যে শালওয়ারের কাপড় কিছুটা এনে দাও। আমার কাছে সাদা কোর্তা আছে একটা। ওটায় কালো রঙ দিয়ে নিলেই হবে। সাদা একটা ওড়নাও রয়েছে। সেই-যে দীপালির দিন এনে দিয়েছিলে। কোর্তার সঙ্গে সেটাও রাঙিয়ে নিলেই চলবে। শুধু একটা শালওয়ারেরই যা অভাব। যেমন করেই পারো জোগাড় করো! আমার জানের কসম, শালওয়ার একটা এনে দাও!’
খোদাবখ্শ উঠে বলল, ‘তুমি শুধুশুধু বিরক্ত করছ। কোত্থেকে আনব বলো? বিষ কিনবার পয়সাও যে এখন আমার কাছে নেই।’
‘তা আমি জানি না। যেখান থেকে হোক, যেমন করে হোক, সাড়ে চার গজ কালো কাপড় আমার চাই।’
‘দোয়া করো, আজ রাত্রেই যেন দু-তিনটি খদ্দের জুটে যায়।
‘তার মানে তুমি কিছুই করতে চাও না। তাই না? অথচ, ইচ্ছে করলে এ-কাজ তুমি সহজেই করতে পারো। কতই-বা আর লাগত! যুদ্ধের আগে বারো আনা ছিল সার্টিনের গজ। এখন বড়জোর পাঁচ সিকে। সাড়ে চার গজ কাপড়ে এমন আর কী বেশি খরচ পড়বে! ত
