একদিন সে বলল, ‘ব্যাপার কী বলো দেখি, খোদাবখ্শ! দু মাস হল আমরা এখানে বাসা বেঁধেছি। একটা মরা মাছিও তো মুখে বসল না। ধরে নিচ্ছি, বাজার আজকাল খুব খারাপ। তাই বলে পুরো দু মাসে একটাও খদ্দের জুটবে না!’
খোদাবখ্শও অনেকদিন থেকেই ব্যাপারটা ভাবছে। ভেবে কিছুই কূলকিনারা করতে পারেনি বলেই মৌন সে। কিন্তু এখন সুলতানা যখন নিজেই কথাটা পেড়ে বসেছে, তখন আর চুপ থাকা যায় না। বলল, ‘আমিও অনেকদিন থেকেই ভাবছি, সুলতানা। মনে হয়, যুদ্ধের হুজুগে পড়ে সবাই যার যার ভাবনাচিন্তায় ব্যস্ত; তাই এ-মুখো কেউ হতে চায় না। তাছাড়া, এমনও হতে পারে– ‘
কথা শেষ হওয়ার আগেই সিঁড়ি ভাঙার শব্দ ভেসে এল। সচকিত হয়ে উঠল ওরা দুজনেই। একটু পরেই কড়া নড়ে উঠল। খোদাবখ্শ লাফিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। ভেতরে ঢুকল একটি লোক। এই লোকটিই সুলতানার প্রথম খদ্দের। তিন টাকায় তার সঙ্গে ফয়সালা হয়েছে। এরপর এসেছে আরও পাঁচ জন। অর্থাৎ তিন মাসে ছজন। ছয়জনের কাছে সুলতানা পেয়েছে মাত্র সাড়ে আঠারো টাকা।
ফ্ল্যাটের ভাড়া মাসে বিশ টাকা। কিন্তু এছাড়াও খরচ রয়েছে। পানির ট্যাক্স, ইলেকট্রিক বিল, ঘর-সংসারের আরও অনেক টুকিটাকি খরচ। খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড়, ওষুধ-পথ্য– এসব তো রয়েছেই। অথচ, আয় কিছুই নেই। তিন মাসে সাড়ে আঠারো টাকা এসে থাকলে তাকে কি আর আয় বলা যায়!
সুলতানার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। আম্বালায় তৈরি-করা সাড়ে পাঁচ তোলা ওজনের আটটা কাঁকন একে একে খসে গেল। সর্বশেষ কাঁকনটির পালা এলে বলেছিল, ‘আমার একটা কথা রাখবে? চলো, আমরা আবার আম্বালা ফিরে যাই। এখানে থেকে আর কী হবে, বলো? আমার আর মোটেও ভালো লাগছে না। ওখানে তোমার ব্যবসাটা বেশ চলছিল। যাগ গে, যা হবার হয়েছে। এখন আর এখানে থেকে কাজ নেই। এই কাঁকনটা বিক্রি করে দিয়ে এসো। জিনিসপত্তর আমি সব গুছিয়ে রাখছি। আজ রাত্রের গাড়িতেই রওনা হতে চাই।’
সুলতানার হাত থেকে কাঁকনটা নিয়ে খোদাবখ্শ বলল, ‘না, সুলতানা। আমরা আম্বালা ফিরে যাচ্ছিনে। দিল্লিতে থেকেই যা হোক কিছু একটা করতে হবে। দেখে নিও, তোমার সব কাঁকন আবার ফিরে আসবে। আল্লার ওপর ভরসা রেখো। তিনি সব করতে পারেন। আমাদের একটা ব্যবস্থাও নিশ্চয় তিনি করবেন।’
সুলতানা মৌন। এমনি করে শেষ কাঁকনটাও হাত থেকে চলে গেল। গয়নাহীন হাতটার দিকে তাকাতে গিয়ে তার দুঃখ হল খুব। কিন্তু উপায় কী। হাতের চাইতে পেটের পরিচর্যার ব্যবস্থাটাই আগে করতে হবে বইকি।
পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। ব্যয়ের চেয়ে আয়ের পরিমাণ তখন আরও কমে এসেছে। সুলতানার এখন দুর্ভাবনার পরিসীমা নেই। খোদাবখ্শ এখন সারাদিনমান বাসামুখো হতে চায় না। সে জন্যও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সুলতানা। দু-তিনটি প্রতিবেশিনী অবশ্যি রয়েছে। ইচ্ছে করলেই তাদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করা যায়। কিন্তু অষ্টপ্রহর তাদের কাছে গিয়ে বসে থাকাটা কেমন খারাপ লাগে তার। তাই আস্তে আস্তে তাদের সঙ্গে মেলামেশা একেবারেই বন্ধ করে দিতে হয়। সারাদিন নির্জন কামরায় বসে সে মুহূর্ত গোনে। একান্তই কিছু করার না থাকলে বসে বসে সুপুরি কাটে, নাহয় ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে। কখনও-বা বাইরের বারান্দায় রেলিঙের পাশে দাঁড়িয়ে রেল-শেডের ইঞ্জিনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা, উদ্দেশ্যহীনভাবে
রাস্তার অন্য পাশে মাল-গুদাম। এককোনা থেকে আর এককোনা পর্যন্ত বিস্তৃত। ডান দিকে লোহার ছাদের নিচে বিরাট বিরাট গাঁট সবসময়ই পড়ে থাকে। তাছাড়াও রয়েছে নানানরকমের মালপত্তর। বাঁ-দিকে খোলামাঠ। অসংখ্য রেললাইন সেখানে। রোদ পেয়ে রেলের পাটিগুলোকে চিকচিক করতে দেখলে সুলতানা শুধু শুধু নিজের হাতের দিকেও তাকিয়ে নেয় একবার। দেখে, কেমন করে লোহার পাটিগুলোর মতোই তার হাতের নীলচে শিরাগুলোও দাঁত বের করে রয়েছে। খোলা মাঠটার উপর দিয়ে ইঞ্জিন আর বগি হরদম চলছেই। কখনও আসছে, কখনও যাচ্ছে। ইঞ্জিন আর বগির ছিক্ছিক্, ঝিঁঝিক্ শব্দে এ অঞ্চলটা চব্বিশ ঘণ্টা মুখর।
সাতসকালে উঠে বারান্দায় এসে যখন সে দাঁড়ায়, তখন অদ্ভুত লাগে সামনের দৃশ্য। আবছা কুয়াশা ঠেলে ইঞ্জিন থেকে ভক্তক্ করে গাঢ় কালো ধোঁয়া বেরুতে থাকে। তার পর, আকাশটার দিকে মোটা মানুষের মতো হয়ে উঠতে থাকে একটু একটু করে। ইঞ্জিনের নিচের দিক থেকেও এমনি ধোঁয়া বেরোয়। কিন্তু সে ধোঁয়া মিলিয়ে যায় একনিমিষে। মাঝে মাঝে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গিয়ে দু-একটা বগিকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় ইঞ্জিন। তখন সুলতানার মনে হয়, তার অবস্থাও এমনি। কারা যেন তাকে জীবনের পাটিতে টেনে নিয়ে এসে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছে। এখন সে একা-একাই চলছে ঠিক ওই বগিগুলোর মতো। আর সেই ইঞ্জিনগুলো এখন কোথায়, কে জানে। তার পর হয়তো এমন একদিন আসবে, যখন একা-একা চলার এই খাপছাড়া গতি আস্তে আস্তে নিঃশেষিত হয়ে যাবে। হঠাৎ থেমে পড়বে সে। থামবে এমন এক জায়গায়, যেখানে তার ভালোমন্দ জানতে চাইবার মতো কেউই আর থাকবে না।
উদ্দেশ্যহীনভাবে এমনি ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা রেললাইনের দিকে তাকিয়ে থেকে সে শুধু চিন্তা করে। অবশ্যি চিন্তাটা মাঝে মাঝে অন্যদিকেও মোড় নেয়।
