খুশিতে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে আয়া এল একটা প্যারামবুলেটার ঠেলতে ঠেলতে, তার মধ্যে বাচ্চা।
‘আচ্ছা, তাই বলো, কিনে ফেলেছ!’ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গুড্ডু একেবারে দাঁড়িয়েই পড়ল। ‘আহা, এরকম বউ ক-জনের ভাগ্যে জোটে। যার জোটে, তার ঘর স্বর্গতুল্য।’ ছেলেকে কোলে নেওয়ার জন্য সে হাত বাড়াল। কিন্তু বাপের কোলে গিয়ে সে বেজায় চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তার পর মায়ের কোলে মায়ের গায়ের গন্ধ শুঁকে সে চুপ করল কোঁ-কোঁ করে।
চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে প্যারামবুলেটার দেখতে লাগল গুড্ডু। আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। হাতল ধরে ঠেলা মেরে দেখল। স্প্রিঙের গতিতে চাপ দিয়ে দেখল।
‘ভারি সুন্দর তো। কত পড়ল?’
যার কাছে জানতে চাওয়া, সে ছেলেকে দুধ খাওয়াচ্ছে তন্ময় হয়ে। কাজেই উত্তর এল আয়ার কাছ থেকে। ‘একশো চল্লিশ টাকার গাড়ি কিনলেন বেগম সায়েব। আমি বললাম, পঞ্চাশ টাকা দিয়ে এই ছোট গাড়িটা নাও। তা উনি বললেন, একদম ছোট্ট চেয়ার বলে মনে হচ্ছে। তখন আমি বললাম, মাঝারি নাও চার কুড়ি টাকা দিয়ে। তা-ও উনার পছন্দ হল না। উনি বললেন, এতেও তো একটামাত্র বাচ্চা বসতে পারবে। দুটো হলে তখন তো দুজনে ঝগড়া বাধবে কি না, বলো। বড়টা জেদ করবে, ছোটটাকে মারতে যাবে, তখন? আমি বললাম, তা ঠিক বলেছ বেগম সায়েব। তার পর, উনি বললেন, বড় দেখে নাও, যেন একসঙ্গে দু-তিনটে বেবি বসতে পারে।’
গুড্ডু প্রথমে অবাক হল। তার পর, সামলে নিয়ে হাসবার চেষ্টা করল। তার পর, ফিফিক্ করে হেসে ফেলল। তার পর, হঠাৎ বিকট জোরে অট্টহাসি জুড়ে দিল ছাদ ফাটিয়ে।
সংযুক্ত কায়দায় বেবিকে দুধ খাওয়াচ্ছিল বেগম। গুড্ডুকে এই প্রথম তার এত অনবদ্য, এত প্রিয়, এত খাঁটি বলে মনে হল –নীল সমুদ্রের কিনারায় একঝাঁক সাদা ফেনার মতো শুভ্র, পবিত্র।
অনুবাদ : নেওয়ামাল বাসির
কালো শালওয়ার – সাদত হাসান মান্টো
দিল্লি আসার আগে সে থাকত আম্বালা ফৌজি ক্যাম্পের কাছে। জনাকয়েক গোরা সৈনিক তার খদ্দের। তাদের সঙ্গে মেলামেশা করে দশ-পনেরোটি ইংরেজি কথা সে আয়ত্ত করতে পেরেছিল। সাধারণ আলাপ-আলোচনায় এসব কথা প্রয়োগ করত না কখনও। কিন্তু দিল্লি এসে অবধি ব্যবসা যখন একেবারেই মন্দা, তখন প্রতিবেশিনী তমন্চা জানকে একদিন সে বলল, ‘দিস্ লাইফ ভেরি ব্যাড।’ অর্থাৎ এ জীবন বড় দুর্বিষহ। কারণ, এখানে পেট ভরার উপায়টুকু পর্যন্ত নেই।
আম্বালা-ক্যাম্পে তার ব্যবসা ভালোই চলত। কষে মদ খেয়ে গোরারা আসত তার কাছে। তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেই আট-দশটি গোরার মনোতুষ্টি ঘটিয়ে বিশ-ত্রিশ টাকা উপায় করে নিতে পারত সহজেই। দেশি খদ্দেরের চাইতে গোরারাই বরং ভালো। গোরাদের কথা সুলতানা খুব কমই বুঝত। আর এই না-বুঝতে পারাটাই শাপে বর ছিল তার পক্ষে।
গোরারা কসেশন চাইলে মাথা নাড়িয়ে সে বলে দিত, ‘সায়েব, তোর কথা কিছুই বুঝি-টুঝি না।
আর, বেশিরকম হেস্তনেস্ত করতে চাইলে মাতৃভাষায় খুব খানিক গালাগালি দিত সে। তবু বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকলে বলত, ‘সায়েব, তুই একটা আস্ত প্যাচা, হারামজাদা, শুয়োর। বুঝলি?’
কড়া গলায় না-বলে কথাগুলো বলত খুব নরম করে। আর, তার পরই ফিক্ করে হেসে দিত। তাই-না দেখে হেসে ফেলত গোরারাও। সুলতানার তখন মনে হত, হ্যাঁ, সত্যি সত্যি তারা প্যাঁচাই বটে।
কিন্তু দিল্লি এসে অবধি কেউ তার ছায়া মাড়ায়নি। গোরা না, কেউ না। ভারতের এই বিরাট শহরটিতে তিন মাস হল তার আসা। সুলতানা শুনেছে, এই শহরেই নাকি বড়লাট থাকেন। গ্রীষ্মকালে তিনি যান শিমলায়
একজনও আসেনি, একথা ঠিক নয়। এসেছে। এই তিন মাসে মাত্র ছ’জন। আল্লা সাক্ষী, মিথ্যে নয়– ছয়টি খদ্দেরের কাছে সে কামাই করেছে সাড়ে আঠারোটি টাকা। তিন টাকার বেশিতে কেউ রাজিই হতে চায়নি। সুলতানা প্রথম পাঁচজনকে রেট বলেছিল দশ টাকা। কিন্তু কী আশ্চর্য, তাদের প্রত্যেকেই জবাব দিয়েছে, তিন টাকার বেশি এক পয়সাও দিতে পারবে না।
কেন জানি তাদের সবাই একবাক্যে সুলতানাকে তিন টাকার যোগ্যি বলেই মনে করল। তাই ছয়জনের জন এলে সে নিজেই বলল, ‘দ্যাখো বাপু, এক টাইম থাকতে হলে তিন টাকা লাগবে। এক আধলাও কম হবে না। থাকতে হয় থাকো, নাহয় চলে যাও।’
কথা শুনে লোকটি আর তর্ক না করে মেনেই নিল।
অন্য কামরায় গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে লোকটা কোট খুলছে– সুলতানা তার কাছে হাত পাতল, ‘একটা টাকা দাও দিকিনি দুধের জন্যে।’
বাড়তি এই একটা টাকার দাবি মানল না সে। কিন্তু কী মনে করে পকেট থেকে নতুন রাজার একটা চকচকে আধুলি বের করে দিল। টুপ্ করে আধুলিটা নিয়ে সুলতানা ভাবল, যাগ্ গে, যা এল তাই সই।
পুরো তিন মাসে মাত্র সাড়ে আঠারো টাকা।
বাসাভাড়া মাসে বিশ টাকা। বাসা নয়, মালিকের ভাষায় ওটার নাম ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটের পায়খানাটা চমৎকার। শেকল ধরে একটুখানি টান দিলেই সমস্ত ময়লা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। আর, সে কী হড়হড় গড়গড় শব্দ! বাব্বাহ্। প্রথমদিকে সুলতানা রীতিমতো ভয় পেয়ে যেত এই শব্দ শুনে। প্রথম যে দিন সে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে আসে এই পায়খানায়, সেদিন তার মাজায় ভয়ংকর ব্যথা। তাই, ওঠার সময় ঝোলানো শেকলটা ধরে উঠতে গেল। সে ভেবেছিল ওঠার সুবিধের জন্যই বুঝি-বা এই বিশেষ ব্যবস্থাটি করা হয়েছে। উঠতে যাতে কষ্ট না হয়, তার জন্যই বুঝি-বা শেকলের ব্যবস্থা। কিন্তু যেই-না উঠতে যাওয়া, অমনি হঠাৎ উপরে কিসের যেন ভীষণ শব্দ আর সঙ্গে সঙ্গে বেজায় হইচই করে নিচের দিকে পানির বন্যা। ভয়ে আঁতকে উঠে সুলতানা শেষপর্যন্ত চেঁচিয়েই ফেলেছিল।
