‘ব্যস্, এখন মুখ ভার করে বসে পড়লেন।’ বেগম আবার বাণী বর্ষণ আরম্ভ করে দিল। ‘আমার কথা বুঝবে কেমন করে তুমি। যাক। আমি তোমাকে ঠেকিয়ে রাখতে চাই না। আমি জানি, এই অবস্থায় তুমি আমার ওপর খুশি হতে পারো না। তুমি কেন, কোনও পুরুষই পারবে না। আমার কপাল মন্দ। আমি হতভাগী। তুমি আর একটা বিয়ে করে নাও। আমি তোমার বাড়ির এককোনায় আমার ছেলেকে নিয়ে পড়ে থাকব। তুমি খুশি থাকলেই আমিও খুশি।’ বেগমের রুগ্ণ চেহারায় যেন রাশি রাশি অভিমানের আলো ঝিলিক দিয়ে গেল।
‘শোনো কথা! আশ্চর্য মেয়ে তুমি। তুমি নিজেই নিজেকে কষ্ট দিয়ে কী মজাটা পাচ্ছ! এই সময় আমার আবার বিয়ে করার প্রশ্ন উঠল কেমন করে!’
উঠতে আর বাকিই-বা থাকল কোথায়। ন্যাকা সাজবার চেষ্টা কোরো না। অকেজো একটা বউ নিয়ে তুমি কদিনই-বা ঘর করবে। এ প্রশ্ন আজ না-উঠলেও একদিন উঠবে। তুমি হলে পুরুষজাত। দয়ামায়া বলে কি কোনও জিনিস আছে তোমাদের মধ্যে!’
‘আশ্চর্য, দু বছর আগে যখন বিয়ে করিনি, তখন বুঝি আমি মরে যাচ্ছিলাম।’
‘হুঁহু, তখনকার কথা আর এখনকার কথা এক নাকি?’
‘কেমন করে বোঝাই বলো তোমাকে। বলছি, এসব কথা ভেবো না। রাত-দিন এই চিন্তা করো বলেই তো তোমার রক্ত শুকিয়ে যাচ্ছে।’
‘করব-না চিন্তা! আমার কী অবস্থা, তা আমিই জানি। একদিকে বছর বছর- ইয়ে, আর অন্যদিকে
‘বছর বছর ছেলেমেয়ে কে চেয়েছে। আমি কি চেয়েছি নাকি যে, বারে বারে এককথা শুনিয়ে যাচ্ছ? আমি বলছি, আমি আর ছেলেমেয়ে চাই না, চাই না, চাই না– এখন হয়েছে তো।’
‘তুমি না-চাইলেও ছেলেমেয়ে হতে পারে। আর, আমার তাতেই মৃত্যু। হবে না বললেই হয় না। কোনও গ্যারান্টি নেই। ‘
‘গ্যারান্টি নেই? তা হলে সায়িন্স কীজন্যে এসেছে?’
‘অসম্ভব। তুমি আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা কোরো না।’
‘আচ্ছা, বেশ। এসো, আমরা তা হলে প্রতিজ্ঞা করি। আমরা দু জন বন্ধুর মতো জীবন-যাপন করব। এখন হয়েছে তো?’ যেন স্বর্গীয় প্রকৃতির বাণী ছাড়ল সে, যার ওপর আর কোনও কথা চলতে পারে না। বলেই সে খুব জোরে হাত চেপে ধরল বেগমের
‘আবার! আবার আমাকে ছুঁলে! একটু আগে কী বলেছ?’
‘কেন, বন্ধু বন্ধুকে ছুঁতে পারে না নাকি?’
‘তা হলে থাক, অমন বন্ধুত্বে আমার কাজ নেই। ছোঁয়াছুঁয়ির বন্ধুত্বকে আমার ভয় লাগছে।’
‘নিশ্চিন্ত থাকো বন্ধু, কোনও ভয় নেই। আমরা প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ নই। আজকে ছোঁয়া মানা। কালকে এক ঘরে থাকা মানা। পরশু বলবে, আমি তোমাকে পর্দা করে চলব। আমাকে বিশ্বাস করো, অত সন্দেহপ্রবণ হয়ো না।‘
‘বেশ, তা হলে প্রতিজ্ঞা করো।‘
‘প্রতিজ্ঞা করলাম। তোমাকেও একটা প্রতিজ্ঞা করতে হবে।’
‘কী?’
‘যে, সময়মতো ওষুধ খাব। ভালোভাবে খাওয়াদাওয়া করব। প্রত্যেক দিন তোমার সঙ্গে বেড়াতে বেরুব। কোনও দুশ্চিন্তা করব না। ইত্যাদি ইত্যাদি।’
‘অর্থাৎ, আমি আজকাল পাগল আছি, যেন তাড়াতাড়ি মাথাটা ঠিক হয়ে যায়, তাই না? তার পর যেন বেশ ভালোভাবেই আমাকে নিয়ে
‘না, কক্ষনো না। আর একটা কথা। বেবিকে নিয়ে বেশি মাথা ঘামিও না। এখন থেকে অত আদর করলে একদম বিগড়ে যাবে। বড় হলে কোনও কাজের ছেলে হবে না।
‘বা বা, এখন তুমি মা-ছেলের ব্যক্তিগত ব্যাপারে অনাবশ্যক অনধিকার চর্চা করছ। আমার ওই একটাই ছেলে। ওর কোন্টা ভালো, কোন্টা মন্দ, তা আমি ভালো করেই জানি।’
‘তা হলে বাপ বুঝি ছেলেকে ভালোবাসে না?’
‘বাসে কি না-বাসে, কে জানে। তবে মায়ের মতো নয় নিশ্চয়। ন’মাস পেটে ধরে যদি ভালোবাসতে পারতে, তবেই হত ভালোবাসা। তোমার কথায় আমার কলজেটা ফেটে যাচ্ছে।’ বেগম আবার ফোঁপাতে আরম্ভ করল।
‘এই নাও, আবার শুরু হয়ে গেল। আমি মাফ চাচ্ছি। যত খুশি আদর করো, ওর বারোটা বাজাও, আমি আর কিছুই বলব না। সত্যিই তো, আমি যখন ন’মাস পেটে ধরিনি, তখন ওকে ভালোবাসার আমার কী অধিকার।’
‘এ-পর্যন্ত ভালোবাসার কী পরিচয় দিয়েছ শুনি। বলেছিলাম, একটা প্যারামবুলেটার কিনে দাও, বেবিকে বেড়াতে নিয়ে যাব। সবসময় কোলে করে নিয়ে বেড়ালে ছেলের অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু দিয়েছ কিনে আজ পর্যন্ত? আজকে নাহয় আয়া আছে। ওর কী ভরসা। কালকে যদি চলে যায়, তখন আমাকেই তো নিয়ে টেনে টেনে বেড়াতে হবে। হবে কি না, বলো?’
‘আমি কি আর দেব না বলেছি, না দিতে চাইনি? এ মাসের বাজেট টাইট। তাছাড়া, সময় পাচ্ছি কোথায়। দশটা-পাঁচটা অফিস করি, তার পর ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরি। কখন কিনব বলো। তা তুমিও তো পারতে একটা প্যারামবুলেটার কিনে আনতে। আনোনি কেন?’
‘হ্যাঁ, একেই বলে ভালোবাসা। সত্যিকারের ভালোবাসা হলে সময়ের অভাব হত না। আমি রুগী মানুষ, আর আমাকেই ঠেলতে চাও বাজারে। হ্যাঁ, শেষপর্যন্ত আমাকেই আজকে যেতে হল বাজারে প্যারামবুলেটার খুঁজতে।’ বেগমের চোখ আবার ভিজে এল।
‘ও, তাই বলো। বাজার গিয়েছিলে, সেইজন্যে ফিরতে এত দেরি। তা প্যারামবুলেটার আনলে না কেন? দেখে রেখে এসেছ বুঝি পছন্দ করে! ঠিক আছে, পয়লা তারিখে গিয়ে নিয়ে আসব, কেমন?’
‘তোমার সব কাজ পয়লা তারিখে।’
বেগমের কথায় আর কান না দিয়ে গুড্ডু হাঁক ছাড়ল, ‘আয়া, বেবিকে নিয়ে এসো, আমি ওকে ভালোবাসব।’ ভালোবাসার যেন অনেক স্টক জমা হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি খালাস করতে চায় সে।
