বেগমের কান্না তবু থামল না। ‘সত্যি বলছি, তোমাকে এখন আমার ঘেন্না করতে ইচ্ছে করছে। আমার কষ্টের কথা তুমি ভাবো না। আমার মনের ভেতরে যে কী হচ্ছে, তা তুমি বোঝো না। আত্মহত্যা করতে মন চাইছে।’
‘শোনো লক্ষ্মীটি, তাই জন্যেই তো বলছি, শরীরটাকে সারিয়ে তোলো। স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে মনও ঠিক থাকবে। কথায় বলে না, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।’
‘না, আমি কিছু শুনতে চাই না। তুমি আমার দু চোখের বিষ। তুমি আমার শত্রু। জীবনে আমার ঘেন্না ধরে গেছে। আমি মরব। আমার আর সহ্য হচ্ছে না। ওয়াক্। আমার বমি আসছে।’
বউকে জোর করে টেনে এনে নিজের কাছে বসাতে চাইল গুড্ডু।
‘উফ্, আমাকে তুমি টেনে-হেঁচড়ে শেষ করে ফেললে। ব্যথা, ব্যথা। উফ্। মলাম, নিষ্ঠুর।’
‘মাফ করে দাও, মাফ করে দাও। অন্যায় হয়েছে। আচ্ছা, এসো। তুমি নিজেই এসো। এসে বোসো। আমার কাছে এসে বোসো। এসো, আমি তোমার মাথা টিপে দিই।’
‘না, না, তুমি আমাকে ছুঁয়ো না। ছুঁলে আমি পাগল হয়ে যাব। স্বার্থপর। নিষ্ঠুর। তোমার কী! আবার মরতে হলে মরব তো আমিই।’
‘দ্যাখো বেগম, তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছ। এত তাড়াতাড়ি ছেলে পেতে কি আমিই চেয়েছিলাম নাকি? তুমিই তো মা হওয়ার জন্যে আল্লার কাছে দোয়া চেয়েছিলে, মনে নেই? তবে যে আমার দোষ দিচ্ছ।’
‘বেশ, বেশ, তোমার কথাই সত্য হল। আমিই চেয়েছিলাম। সব বউই বাচ্চা চায়, তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। আমার ঘাট হয়েছে, স্বীকার করছি। আর আমি চাইনে। এই যে কান ধরছি। তৌবা করছি। অনেক শাস্তি হয়েছে। আর না। ‘
‘আমিই-বা কবে চেয়েছি, না ভবিষ্যতের জন্যে চাচ্ছি। আমিও তৌবা করছি। তৌবা তৌবা। তোমার চাইতে বেশি তৌবা। ডবল তৌবা।’ গুড্ডু ক্লাউনের মতো কান ধরে কয়েকবার ওঠবোস্ করল।
‘বাহ্, কারও জান যাচ্ছে, আর তুমি তাই নিয়ে করছ আমার সঙ্গে ফাজলামি। সারারাত ঘুম আসে না ভয়ে, তা তুমি জানো?’ বেগম একেবারে বাচ্চাছেলের মতো জোরে জোরে কাঁদতে আরম্ভ করে দিল।
‘এই নাও, এখন আবার কী হল? তুমি আমাকে পাগল করে ছাড়বে দেখছি।’ কান্না থামানোর চেষ্টাস্বরূপ গুড্ডু তাকে বুকের কাছে টেনে আনতে গেল।
উফ্, মেরে ফেলল রে, মেরে ফেলল। তোমাকে-না বললাম, আমাকে ছুঁয়ো না। তোমার হাতের ছোঁয়া আমার গায়ে কাঁটার মতো বিঁধছে। তুমি যদি আমার মনে শান্তি দিতে চাও, তা হলে দোহাই তোমার, তুমি আমাকে ছুঁয়ো না।’
‘আশ্চর্য, তুমি আমাকে শুধু শুধু লজ্জা দিচ্ছ। যাই বলো, আমি যে জানোয়ার নই, এতদিনে অন্তত তোমার তা বোঝা উচিত ছিল। আমি তোমার মনে শান্তিই দিতে চাই। আমি চাই, তুমি সেরে ওঠো, সুস্থ হয়ে ওঠো।’
‘ছাই। তোমাকে আমি চিনি না মনে করেছ! একটুখানি ঢিলা দিলেই হল। তোমার কী। মরব তো আমি। আমার শরীরে একফোঁটা রক্ত নেই। কেমন করে যে বেঁচে রয়েছি, ভাবতেও অবাক লাগে। সারাক্ষণ মাথা ভোঁ ভোঁ করে। উঠতে গেলে ঘুরুনি, বসতে গেলে ঘুরুনি। এখন পর্যন্ত সোজা হয়ে হাঁটতে পারি না। পেটে ছুরির দাগ কোনওদিনও মিটবে না।’ আবার কাঁদতে শুরু করে দিল বেগম।
এমনি সময়ে পাশের ঘরে বেবিরও কান্নার রব শোনা গেল।
বেগম হাঁক ছাড়ল, ‘আয়া, বেবিকে নিয়ে এসো!’
‘আয়া, বেবিকে এনো না।’ তারও চাইতে জোরে বলল গুড্ডু।
‘কেন অত দেমাক দেখাচ্ছ? দুধ দেব না বাচ্চাকে? না-খেয়ে মরবে নাকি? দুধ তো ছাই পায়!’ বিড়বিড় করে চোখ মুছল বেগম।
‘মরুক। মরলেই বাঁচি। বুকের দুধ কেন দেবে। ডাক্তারে বলেনি টিনের দুধ খাওয়াতে?’
‘মুখ সামলে কথা বলো, নইলে ভালো হবে না কিন্তু। আমার বাচ্চা কেন মরবে। যে ওর মৃত্যু চায়, সেই মরুক। অতটুকু বাচ্চার সঙ্গে তোমার এত হিংসামি কেন, শুনি?’
‘অমন বেহুদা ছেলে তো আমি কোথাও দেখিনি। সারারাত কাঁদবে, আর তোমাকে ঘুমোতে দেবে না। সেইজন্যেই তো তোমার মেজাজটা আরও তিরিক্ষি হয়েছে। শুকিয়ে শুকিয়ে কাঠ হচ্ছ।’
‘থাক, অত দরদ দেখাতে হবে না। শত্রু, হাড়-শত্রু, আবার দরদ দেখাচ্ছেন। আমি ওকে ন-মাস পেটে ধরেছি। তুমি কী বুঝবে তার জ্বালা। আর, থাকতে হত যদি হাসপাতালে, পেট কেটে বাচ্চা বের করতে হত যদি, তা হলে বুঝতে।’
‘এইজন্যেই তো বাঁদরটার ওপর আমার এত রাগ। বেটা নচ্ছার, মায়ের পেটে ছিলি কেন– বাপের পেটে থাকতে পারিসনি?’ গুড্ডু হাসি সংবরণ করতে পারছিল না।
‘দেখাও-না রাগ, যত পারো দেখাও। কিন্তু আমার তো ওই একটাই বাচ্চা, একটাই মানিক। এই মানিকটাই আমার জীবনের আশা-ভরসা। আমার চোখের মণি। কিন্তু আর আমি ছেলেমেয়ে চাই না। আবার আমাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে মেরে ফেলতে চাও নাকি? আমি মরলে তোমার আর কী ক্ষতি। আর একটাকে ঘরে তুলবে। তাকে দিয়ে সেপাই-বাহিনী তৈরি করে নিও। যত খুশি।’ আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল বেগম।
গুড্ডু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, কী ভাষায় সে সমবেদনা জানাবে। সমস্যা হয়তোবা জটিল, কিন্তু তার সমাধান কঠিন নয়। নিজেই সে বিজ্ঞের মতো সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে নানাভাবে। কিন্তু তার প্রত্যেকটি কথারই উল্টো অর্থ করছে বেগম।
ততক্ষণে চা ঠাণ্ডা পানি হয়ে গেছে। চা আর খাওয়া হল না। কাজেই গুড্ডু একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেটে দ্রুত কয়েকটা টান দিয়ে ভাবতে লাগল। কত সাধ বুকে পুষে অফিস থেকে সে বাসায় ফিরেছিল। কিন্তু বিকেলটা একদম মাটি হয়ে গেল। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে সে নিজের চুলে আঙুল বুলোতে লাগল।
