গুড্ডু ভাবল, এই সুযোগে গোসলটা সেরে নেওয়া যাক। নলের পানির শব্দের সঙ্গে মিশে গেল যেন কারও গলার আওয়াজ। এসেছে বোধহয়। নল বন্ধ করে শুনবার চেষ্টা করল গুড্ডু। না, মনের ভুল। কেউ আসেনি তো।
গোসল সেরে বেরুল। চা রাখা ছিল তেপায়ার উপর। ইভনিং-ইন-প্যারিসের গন্ধ মেখে নিয়ে চায়ের দিকে তাকাল। চা এখনও যথেষ্ট গরম। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে কিছু ক্ষতি নেই। হয়তো ততক্ষণে এসে যাবে। সকালের খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে বিছানায় সটান শুয়ে পড়ল।
পড়তে পড়তে একটা অদ্ভুতদর্শী শিশুর খবরের দিকে নজর গেল তার। কিন্তু বেশিক্ষণ সে-খবর মনটাকে আটকে রাখতে পারল না। এ-পর্যন্ত একটিই ছেলে পেয়েছে সে। তাতেই বউয়ের স্বাস্থ্যটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। অপারেশন করতে হল বলে। নইলে হয়তো এমন হত না।
কে বলেছে সন্তান উৎপন্ন করতে। না হলেই-বা কী ক্ষতি ছিল! স্বাস্থ্যটা তো তা হলে এইভাবে জাহান্নামে যেত না। আর, খবরের কাগজে রোজ রোজ এইরকম খবর। বানরের মতো দেখতে। মাথায় শিং রয়েছে। নাহয়, চারটা হাত, দুটো মাথা নাহয়, পিঠে পিঠে জোড়া লেগে রয়েছে। দুটো বাচ্চা। চারটা হাত, দুটো পা। বিয়ে করলেই এইসব ঝঞ্ঝাট।
আহা, বেগমের কী অবস্থা! হাসপাতালের সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল গুড্ডুর। তিন দিন যাবৎ কেবল চিৎকার করল। শেষে অপারেশন করতে হল। কীরকম আতঙ্কজনক হয়ে উঠেছিল ওর চেহারাটা। হাসপাতাল থেকে যে ফিরল, সে যেন বেগম নয়, বেগমের প্রেতাত্মা। তৌবা। সন্তান জন্ম দেওয়া যেন একটা প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়। যদি মরে যেত, তা হলে! গুড্ডুর দুচোখ আপনা-আপনি ভিজে এল।
কী করছে এতক্ষণ ধরে ডাক্তারের কাছে। নাকি সেখান থেকে আবার অন্য কোথাও গেছে। টাঙায় চাপতে কতদিন নিষেধ করেছে। তাতে শরীর আরও খারাপ হয়ে যায়। ট্যাক্সিতে গেলে শরীরটা আরাম পায়। না, ওই এক বাতিক। পয়সা বাঁচানোর এত ঝোঁক। কী হবে এত টাকা-পয়সা জমিয়ে। জান্ আগে, না পয়সা আগে। আসুক, আজকে ভালোভাবে শুনিয়ে দেবে চাট্টি কথা।
কিন্তু আরও অনেক দেরি করে বেগম যখন ঘরে ফিরল, ওর বিবর্ণ, মলিন মুখ দেখে গুড্ডুর মুখে রা সরল না। বকার কথা একদম ভুলে গেল সে। বাইরে আয়ার কোলে বেবি কাঁদছিল ট্যা-ট্যা করে।
গুড্ডু আদর করে বেগমকে বিছানায় শোয়াতে গেল। কিন্তু বেগম মুখে কোনও কথা না বলে নাক ঝাপ্টা দিয়ে সে আদর প্রত্যাখ্যান করল। সরে বসল গিয়ে সোফার উপর। তার কপালে, নাকের নিচে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। নিঃশ্বাস বয়ে যাচ্ছে জোরে জোরে।
বেগমকে সুন্দরী বলা যায় না। আদৌ না। কিন্তু গুড্ডুর চোখে সে অপরূপা। এতদিন হয়ে গেল, তবু চেয়ে চেয়ে চোখের পিয়াস মেটে না তার। এত যে ভেঙে পড়েছে, যাকে দেখলে এখন তালপাতার সেপাই বলেই মনে হয়, তবু গুড্ডুর কাছে সে স্বর্গের অপ্সরা। গুড্ডু কাছে বসে, মোলায়েম করে হাত ধরে, বেগমের শাড়ির আঁচল দিয়ে তার মুখের ঘাম মুছে দিতে চাইল, কিন্তু বেগম ঝট্কা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল তার। ঝাপ্টা মেরে হাত সরিয়ে দিল গুড্ডুর।
গুড্ডুর খারাপ লাগল না। এইরকম দেখে দেখে তার সয়ে গেছে। এখন কিছু মনে করে না সে এই ব্যবহারকে।
গুড্ডু চা তৈরি করতে শুরু করে দিল। ‘নাও খাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’
‘না।’
‘কেন?’ গুড্ডু নিজের কাপটাও নামিয়ে রাখল।
‘ভালো লাগছে না।’
‘বেশ, অল্প-একটু খেয়ে নাও, দু চুমুক।’
কয়েক চুমুক খেল বেগম।
‘ডাক্তার কী বললেন?’
‘রক্ত হচ্ছে না।’
গুড্ডুর খুব রাগ হল। ‘রক্ত হবে কোত্থেকে। টনিক-ওষুধ সব ড্রেনে ফেলেছে। দুধ খাবে না, ডিম খাবে না। গোত দেখলে বমি আসে। শাক-শবজির গন্ধ পর্যন্ত সহ্য করতে পারো না। তা আর খাবে কী। একটুখানি চলাফেরা করতে বলব, তা-ও করবে না। তুমি নিজেই মরতে চাও, তা কে কী করবে, বলো রাগ করলে কী হবে, আমার কথার উত্তর দাও। ওষুধ যদি না-খাবে তো ডাক্তারের কাছে রোজ রোজ কীজন্যে যাচ্ছ? সেই-যে বেবি পেটে থাকার সময় ডিম-দুধ-গোশ্ত খাওয়া ছেড়েছ তো ছেড়েছই– এখনও গন্ধ লাগে। মা কি সাধে বলেন, নখ়া কোরো না। আমার কথা নাহয় না-ই শুনলে, কিন্তু মুরুব্বি মানুষের কথা তো শুনতে হয়। বেশি বললে তো আবার কাঁদতে শুরু করে দেবে।
ঘুরে দেখে, বেগম তার বলবার আগেই কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে।
ঠোঁট ঝুলিয়ে বাচ্চাছেলের মতো সে কাঁদছে।
‘ব্যস্, খারাপ লেগে গেল আমার কথা। শহরে আরও তো পাঁচটা মেয়েমানুষ আছে। পাড়া-প্রতিবেশীদের দেখেও তো লোকে শেখে।’
‘হুঁ, আমি বুঝি আর পাঁচটা মেয়েলোকের সমান হলাম। তার চাইতে গরু-মোষের সঙ্গে তুলনা দিলেও তো পারতে। গরু-মোষও মার খেলে শিং দিয়ে গুঁতো মারে।’
‘ও, আমি বুঝি তোমাকে মেরেছি, তাই না? অবাক করলে।’
‘তোমার মুখের কথাই মারের চাইতে কি কম? পুরুষ হয়েও শাশুড়ি-ননদের মতো গালাগালি করতে তোমার মুখে বাধে না! আশ্চর্য।’
‘আশ্চর্য? বেশ, আমার অন্যায় হয়েছে, মাফ করে দাও। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একটু কথাতেই অমনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠো কেন, বলো তো?’
‘উঁ– বড় এসেছেন মনস্তত্ত্ববিদ্–। শরীরের চিকিৎসা শেষ হয়েছে, এখন মনের চিকিৎসা করবেন।’
‘লক্ষ্মী বেগম, তুমি আমাকে মাফই করে দাও। ঘাট হয়েছে, স্বীকার করছি।’ বকলেও যা, সহানুভূতি জানালেও তাই। ভাবল গুড্ডু।
