: খুব দেখেছি ভেবে। চুলো আর ধোঁয়ায় কামরার দেয়ালে আর ছাদে কালি পড়ে যাবে। কামরার তখন দু পয়সার মূল্যও থাকবে না।
: তা হলে বলুন, আমি কোথায় রান্না করব?
: চুলোটা বাইরে গলিতে রেখে দিন। সেইখানেই রান্না করবেন।
প্রস্তাবটা বেশ। সত্যি, কামরার দেয়াল এবং ছাদে কালি পড়লে লোকের কোমল অনুভূতি এবং রুচিবোধে লাগবেই। অথচ, আমি হলাম কি না একজন শিল্পী। এরকম কাজ করবার সময় আমার অন্তত ভেবে দেখা উচিত ছিল। লজ্জায় তাই মাথা নত করে লালা পিন্ডি দাসের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। তার পর, চুলো উঠিয়ে গলিতে নিয়ে গেলাম।
দিনদুয়েক গলিতে হোটেল খুলে দেখলাম, লোক আসতে-যেতে মিটমিট করে হাসে। কয়েকজন মহিলাকে আঙুল তুলে ইশারা করতেও দেখলাম। অতএব, চুলোটা আবার ঘরে এনে রাখলাম। ঠাণ্ডা, উত্তাপহীন চুলো একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে এককোণে চুপসে পড়ে রইল। তার পর থেকে আর লালা পিন্ডি দাসকে জানাইনি, তোমার ঘরের মান বাঁচাবার জন্যে আমি নিজের স্বাস্থ্য বলি দিচ্ছি। এর জন্যে মাঝে মাঝে প্রতিদান দেব কিন্তু।
আস্তে আস্তে আমার মনে হতে লাগল, আমি ঘরটা ভাড়া নিইনি, ঘরটাই আমায় ভাড়া নিয়েছে। কারণ, ক্রমে ক্রমে এমন সব ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে, যার ফলে ঘর আর আমার মধ্যে দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হচ্ছে। চৌকিখানায় টান দিলেও ঘরটা কেঁপে ওঠে, আর লালা পিন্ডি দাস তাঁর ঘরের মেঝে থেকে ইট খসে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকেন। দরজা বন্ধ করবার সময় ‘মুড’ এসে গেল, একটু-বা জোরেই বন্ধ করে দিলাম। অমনি লালা পিন্ডি দাসের বুকে হাতুড়ির ঘা পড়ল। তার পর, তিনি নিচে থেকেই হাঁক ছাড়লেন: দরজাটা ভাঙছে কে? ক্যালেন্ডার টাঙাবার জন্যে দেয়ালে পেরেক ঠুকতে গেলাম। সে পেরেক গিয়ে ঢুকল যেন লালাজির মাথায়। গরমের দিন এলে ঘুমোনোর জন্যে রাত্তিরে গলিতে যেতে হয়। কারণ, ছাদে ঘুমোন স্ত্রী-পরিবারঅলা মানী লোকেরা। এবং এ নিয়ম চলে আসছে লালা পিন্ডি দাসের পিতৃদেবের আমল থেকে। অতীতের সুস্থ বিধি-নিষেধ অমান্য করতে গেলে আমার নিজেকেই অপরাধী বলে মনে হতে থাকে।
অবশেষে পরিস্থিতি একদিন সংকটজনক হয়ে দাঁড়াল। আমি লালা পিন্ডি দাসের সামনে সকল কথা ঢেলে দিলাম।
ঘটনাটি হল : সেদিন যথারীতি রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরলাম। সদর দরজাও তখন যথারীতি বন্ধ। এবং এই দরজা দিয়ে ঢুকেই আমাকে সিঁড়িতে উঠতে হবে। অতএব, যথারীতি আমি দরজা খুলে দেওয়ার জন্যে লালা পিন্ডি দাসকে ডাক দিলাম। লালাজি বিড়বিড় করতে করতে নিচে নেমে এলেন। কটমট করে আমার দিকে চেয়ে বললেন, এত রাত তক্ কোথায় ছিলেন?
: ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্প করছিলাম।
: তা হলে বাউণ্ডুলেপনাও করেন বুঝি!
: আজ্ঞে, না। পুলিশ আজ পর্যন্ত এ অপরাধে গ্রেফতার করেনি।
: কিন্তু এটা ভদ্রলোকের কাজ নয়, এ আমি আপনাকে বলে দিলাম –আমার বাড়িতে এসব চলবে না। দয়া করে আপনি অন্তত নটার মধ্যে ফিরে আসবেন। নইলে দরজা খোলা হবে না। বুঝলেন?
: আজ্ঞে হ্যাঁ। ভবিষ্যতে আর এমন ভুল হবে না। আমার শোবার ব্যবস্থা আমি অন্য জায়গায় করে নেব।
এই স্পষ্ট কথার পর আর আমার নিজের ঘরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। আমি এক সরাইখানার মালিকের সঙ্গে আলাপ করলাম। সে আমায় রাত প্রতি ছ’আনায় শোবার জায়গা এবং চৌকি দিতে রাজি হয়ে গেল। তার পর বিছানাটা নিজের ঘর থেকে উঠিয়ে সরাইখানায় নিয়ে এলাম।
দুসপ্তাহের মধ্যেই অবস্থা অন্যরকম হয়ে গেল। এখন আমি মাসে একবার করে লালা পিন্ডি দাসের বাড়ি গিয়ে মাসিক বিশ টাকা ভাড়া তাঁর হাতে দিই, আর, নিচে দাঁড়িয়েই করুণ চোখে একবার কামরাটার দিকে তাকিয়ে নিয়ে সরাইখানায় ফিরে আসি। কিন্তু কামরাটি আমি কেন ভাড়া নিয়ে রেখেছি– বিশেষ করে, তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক যখন কার্যত প্রায় ঢুকেই গেছে,–একথার মীমাংসা আজও করতে পারলাম না।
এবং মজার ব্যাপার হল, এরপর থেকে লালা পিন্ডি দাস একটিবারও খুঁতখুঁত করেননি আমার কাছে। বরং, দেখা হলেই শুধু বলেন, আপনি ভারি ভদ্র ভাড়াটে।
অনুবাদ : আতোয়ার রহমান
মেয়েলি হিসাব – হাজেরা মস্রূর
গুড্ডু সাহেব এইমাত্র ঘরে ফিরলেন! ভালো চাকরি করেন। কিন্তু পুরনো অভ্যাস সাইকেল চালানোর –সেটা এখনও ছাড়তে পারেননি।
চাকর এসে সাইকেলটা ধরে নিল।
অফিস থেকে বাসা কম হলেও দু মাইলের পথ। তার ওপর যা গরম পড়েছে। এই গরমে এই দু মাইল পথ সাইকেল চালিয়ে আসা মানে রীতিমতো ব্যায়াম করা। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ে। সারা গায়ে ঘাম ছুটে যায়। সে-সময় গুড্ডু সাহেব বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিলেন, তখন এক বন্ধু পরামর্শ দিয়েছিল, ‘বিয়ে না করে, বলছি একটা কার কিনে ফ্যালো। আর, যদি কার না-কিনতে চাও, তা হলে মেষ পোষো। এইভাবে সাইকেল চালালে খাঁটি মোষের দুধ খাওয়া দরকার, বুঝেছ?’
কিন্তু গুড্ডু কারও কেনেনি, মোষও পোষেনি। অবশ্য বউ একটা ঘরে তুলেছে। ঘরে ফিরেই তার প্রথম কাজ বউকে খোঁজা
চাকরকে জিগ্যেস করল, ‘ও কোথায়?’
‘ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। বলেছেন, আপনি আসার আগেই ফিরবেন।’
‘তা ফিরলেন কই, আমি তো এসেছি।’
‘তাই তো বলে গিয়েছিলেন।’
ক্লান্ত শরীরটাকে সোফার উপর বিছিয়ে দিল গুড্ডু। এই সময় এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে করছে। বউয়ের হাতের চা। চাকরের হাতের চা খেয়ে গুড্ডু সাহেব আরাম পান না। ভাবল, হয়তো এখনই এসেই পড়বে।
