সারাটা বাড়িতে মাত্র একটা পায়খানা। জানা গেল, সে পায়খানা শুধু যারা সপরিবারে থাকে, তাদেরই জন্যে রিজার্ভ করা। যাদের বউ নেই, তারা চলে যায় মাঠে। লালা পিন্ডি দাস আমায় কয়েকবার শোনালেন, বাড়িটা তৈরি করবার সময় তাঁর পিতৃদেবের সঙ্গে সপ্তাহের পর সপ্তাহ এই ব্যাপার নিয়ে মিটিং হয়েছিল যে, মাসিক বিশ টাকা তক্ ভাড়াঅলা কামরা শুধু একলা মানুষদের দেওয়া হবে কি না। শেষে যখন কয়েক সপ্তাহের তর্কবিতর্কের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, এসব ঘরে একলা মানুষদেরই রাখা হবে, তখন তাদের জন্যে পায়খানা তৈরি করবার প্রশ্নই আর ওঠেনি।
ভদ্রতার এই স্তরে পৌঁছে লালা পিন্ডি দাস তাই নিতান্তই পিতৃভক্তের মতো জানিয়ে দিলেন, পিতৃদেবের সঙ্গে যে চুক্তি করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে তিনি যেতে পারবেন না।
কিন্তু হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তিটা আমার মাথায় ঢুকল না। এর সঙ্গে পিতৃদেবের চুক্তির কী সম্পর্ক আছে, বাবা! এ তো ভাড়াটের প্রয়োজনের প্রশ্ন।
যুক্তিটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না দেখে বেশ কিছুক্ষণ পর লালা পিন্ডি দাস ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, লেখাপড়া শিখেছ, না ঘাস কেটেছ?
আমি উত্তর দিলাম, ঘাস কাটা মনে না-করে এটাকে মানুষের দুর্বলতা ভেবে নিয়ে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।
সাত-সকালে যখন মাঠে যাই, তখন মনে হতে থাকে, সত্যি সত্যিই ঘাস কাটতে যাচ্ছি। মাঠে যাওয়ার সময় সাবান, তোয়ালে, টুথব্রাশ ইত্যাদিও নিয়ে যেতে হয়। কারণ, বাসা থেকে আধ মাইল দূরে কুয়োও আছে। স্নানটাও সেখান থেকে সেরে আসতে হয় আমায়। কুয়োয় স্নান করতে যাওয়ার শুরুটা হয় এইভাবে :
একদিন লালা পিন্ডি দাসের বাড়িতে নিচের তলা থেকে এক বালতি জল ভরে এনে নিজের ঘরে স্নান করছিলাম। হঠাৎ নিচে থেকে গালাগালি শুনতে পেলাম, অভদ্র কোথাকার! লজ্জাও করে না!
আমি-যে কোনও অভদ্রতা করছিনে, এ তো জানা কথাই। সুতরাং, যথারীতি গুনগুন করে ‘পিয়া মিলন কো জানা’ গানখানা গাইতে গাইতে স্নান করতে লাগলাম। : চিড়িয়াখানা খুলে রেখেছে ওপরতলায়! বলি, তোমরা কি মানুষ, না গাধা? এটা যে গলি, তোমার বাবার ইমারত নয়, এটুকুও মাথায় ঢোকে না?
মনে হল, কথাটা যেন আমার উদ্দেশেই বলা হচ্ছে। জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকাতেই দেখি, সাদা কাপড় পরা এক বাবুজি আমার কামরার দিকে ঘাড় উঁচিয়ে গালাগালি দিচ্ছেন। তাঁর সাদা কাপড়-জামা ময়লা জলে যাচ্ছেতাই রকম ভিজে গেছে। দোষটা আমার, না সাদা পোশাকঅলার– এর আশু মীমাংসা করা আমার পক্ষে শক্ত। একটু পরেই লালা পিন্ডি দাস এসে মুশকিল আসান করলেন এবং প্রমাণ করে দিলেন, দোষটা আমারই।
আমি বললাম, আপনার টিনের নালিটা যদি ভাঙা না-হত, তা হলে দোষটা কখনও আমার ঘাড়ে পড়ত না।
লালাজি চণ্ডমূর্তি ধারণ করে বললেন, টিনের নালির কোনও দোষ নেই, দোষ জলের, যে জল আপনার গা থেকে গড়িয়ে ওই সাদা পোশাক-পরা ভদ্রলোকের কাপড়ে গিয়ে পড়েছে। আপনি যদি এখানে স্নান না করতেন, তা হলে জলও–
আমি বুঝিয়ে বললাম, কিন্তু মশাই, কামরাটা–
লালাজি ফোঁস করে উঠলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, কামরাটা থাকবার জন্যে, স্নান করবার জন্যে নয়। কারণ, এটা বাথরুম নয়, কামরা।
আমি বললাম, বাথরুমটা কোথায়?
উত্তর পেলাম, বিশ টাকায় বাথরুম পাওয়া যায় না, শুধু একটা কামরা পাওয়া যায়।
: তা হলে স্নান হবে কোথায়?
এই ‘কোথায়’-এর উত্তরে লালা পিন্ডি দাস আমায় কুয়ো দেখিয়ে দিলেন। সে কুয়োর কাছে টিনের নালিও নেই, সাদা পোশাক-পরা লোকের যাতায়াতও নেই। তবু, আমার মাথায় কিছুই ঢুকতে চায় না। টিনের নালি ভেঙে গেলে তা মেরামত করবার দায়িত্ব লালা পিন্ডি দাস ছাড়া আর কার? আবার নালির সঙ্গে যদি লালাজির সম্পর্ক চুকে গিয়ে থাকে, তা হলে কামরার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রয়েছে কী করে?
কিন্তু এসব উদ্ভট কল্পনা। নালির সঙ্গে লালা পিন্ডি দাসের সম্পর্ক নিশ্চয়ই চুকে গেছে। কিন্তু কামরার ছাদ আর দেয়ালের সঙ্গে সম্পর্ক এখনও ভালোমতোই রয়েছে। কামরার প্রতিটি ইটেও তাঁর ভালোবাসার ছাপ আছে। ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম পরে।
মাস দুই-তিন নিরাপদে কেটে যাওয়ার পর আমার মনে হল, বাজারের তন্দুর আর হোটেলের খাবারে আমার স্বাস্থ্যে ঘুণ ধরে যাচ্ছে। সুতরাং, ঠিক করলাম, নিদেনপক্ষে স্ববজি-তরকারিটা আমার বাড়িতেই রান্না করে নেওয়া উচিত। তার পর বাজার থেকে কয়লা আর চুলো কিনে এনে এক সন্ধেয় কাজ শুরু করে দিলাম!
অবাক কাণ্ড! নতুন কিছুর গন্ধ পেলেই লালা পিন্ডি দাসজি চুপচাপ কানে তালা লাগিয়ে ফেলেন। চুলোর ধোঁয়া দেখে তিনি ভাবলেন, আগুন লেগেছে। তার পর বাড়িতে আগুন লাগবার আগেই আমার ঘরে শুভাগমন করে বললেন, এসব কী হচ্ছে?
আমি সোজা কথায় বুঝিয়ে দিলাম, চুলো জ্বলছে।
: তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু বলি, এটা কি বাড়ি, না হোটেল? জানেন, কামরাটা আপনি ভাড়া নিয়েছেন, কিনে নেননি?
শুনুন কথা! কামরাটা আমি কিনে নিয়েছি বলে কখনও দাবি করিনি। জানিনে, লালা পিন্ডি দাসজি এই মিথ্যে অভিযোগ আমার ঘাড়ে কেন চাপাচ্ছেন! অভিযোগটা শুনে ভারি রাগ হল আমার। বললাম, লাল-পিন্ডি দাসজি, বাজারের খাবার খুব ক্ষতি করে। আপনি আমার স্বাস্থ্যটার কথা একটু ভেবে দেখুন।
