ভাড়া নেওয়ার সময় লালা পিন্ডি দাস বুঝিয়ে দিলেন, ভাড়াটা তিনি অগ্রিম নিয়ে থাকেন। কারণ, এই হল তাঁর নিয়ম।
আমি বললাম, আপনি যথার্থই বলেছেন। নিয়ম-কানুন যার নেই, তাকে কেউ শ্রদ্ধা করে না।
কথাটা শুনে লালা পিন্ডি দাস ফুলে উঠলেন। তাঁর দাঁত বেরিয়ে পড়ল। দেখলাম, দাঁতগুলো ময়লা। লোকটি যদি আমার দেওয়া বিশটি টাকা থেকে এক টাকার টুথপেস্ট কিনে আনে, তা হলে দাঁতগুলোর উন্নতি ঘটতে পারে। কিন্তু আবার ভাবলাম, অন্যের দাঁতের মধ্যে আমার নাক গলানো উচিত নয়। প্রত্যেকেরই আপন আপন নিয়ম-কানুন আছে।
অতএব, আমার কামরা-বাস শুরু হল। কামরাটা বেশ। অর্থাৎ, আলো-হাওয়া আসে এবং চব্বিশ বর্গইঞ্চি মাপের চতুষ্কোণ একটি জানালাও আছে। শোবার, থাকার, রান্না করবার, কাপড় ধোওয়ার, লেখাপড়া করার এবং মুগুর ভাঁজবার সমস্ত ব্যবস্থা এই একটি কামরার ভেতরেই রয়েছে। একটি ইলেকট্রিক্ বাল্বও লাগানো ছিল। লালা পিন্ডি দাস সেটা সন্ধেবেলায়ই খুলে নিয়ে গেলেন। বললেন, বাল্বটা আগের ভাড়াটের। সে অগ্রিম ভাড়া না-দিয়েই ঘর ছেড়ে দিয়ে গেছে। আপনি যদি বাল্বটা রাখতে চান, তা হলে সাবেক ভাড়াটের ভাড়াটা চুকিয়ে দিন।
কিন্তু আমি ভাবলাম, সে লোকটা ভদ্র, না বদমায়েশ কেমন মানুষ, তা কে জানে। না জেনে-শুনে তার ভাড়া আমি কেমন করে দিই। সুতরাং, লালা পিন্ডি দাসের কথায় রাজি হলাম না। নিজের জন্যে নতুন বাল্ব কিনে নিয়ে এলাম।
লালা পিন্ডি দাস আমার এই বাল্বটি দেখবার জন্যে ঘরে এসে ঢুকলেন, বললেন, কত পাওয়ারের আনলেন?– তার পর, চোখ পাতরে বাল্বটি দেখতে লাগলেন, যাতে আমি মিথ্যে না-বলতে পারি।
আমি কিন্তু সত্যি কথাই বললাম, ষাট পাওয়ারের।
: কথা কি, জানেন, মশাই– আমি এই ইলেক্টরি-ফিলেক্টিরির ব্যাপারে একটু পষ্ট-বক্তা। এটা ষাট পাওয়ারের বাল্ব। বেশি কারেন্ট টানবে।
আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম, আজ্ঞে, তা তো নয়। ষাট পাওয়ারই টানবে, বেশি টানবে না।
: তাই যদি হয়, তা হলে তো আপনাকে বাল্ব পিছু এক টাকার জায়গায় দু টাকা দিতে হবে।
আমি মন্তব্য করলাম, আমি কিন্তু এক টাকা দেওয়াই ভালো মনে করি।
: তা হলে আপনাকে তিরিশ পাওয়ারের বাল্ব আনতে হবে।
: কিন্তু লালাজি, পড়াশোনা করা আমার পেশা। এবং পড়াশোনার জন্যে বেশি আলো চাই। নইলে অকালেই অন্ধ হয়ে যেতে হয়।
: তা হলে দু টাকা করে দেবেন। এই সঙ্গে একথাটাও নিবেদন করে রাখি– নটার পর নিচে থেকে ইলেক্টরির মেন সুইচ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এটা আমার নিয়ম।
: কিন্তু লালাজি, আমারও একটা নিয়ম আছে। সে হল, আমি রাত একটা পর্যন্ত লেখাপড়া করি। সারাটা জগৎ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে থাকি। মানে, কবিতা লিখি, গল্প লিখি, আর সারা দুনিয়ার ব্যথা নিজের বুক থেকে বের করে কাগজের উপর ঢেলে দিই। তাই জন্যে―
তাই জন্যে বেশি তর্ক করেও লাভ নেই। আমার নিয়ম অসংগত বলে প্রমাণিত হল, আর লালা পিন্ডি দাসের নিয়মটাকেই মেনে নিতে হল সংগত বলে। তার পর আমি বাজার থেকে একটা কেরোসিনের কুপি কিনে নিয়ে এলাম। পিন্ডি দাসজি আমার বিজলির তার কেটে দিয়ে গেলেন। আর, আমি সুখে-স্বচ্ছন্দে ঘরটায় বাস করতে লাগলাম।
এমনিভাবে হেসে-খেলে চার-পাঁচটা দিন কেটে গেল। ইতোমধ্যে আমার মনে হতে লাগল, লালা পিন্ডি দাস আর আমার সম্পর্ক শুধু ভাড়া দেওয়া-নেওয়াতেই নয়, মানুষ যখন প্রথম কুঁড়েঘর বানিয়ে বাস করতে শেখে, সেই পাথর আর তীর-ধনুকের যুগে পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে সম্পর্কটি।
ঘরে যে জানালাটি ছিল, সেইটির আমার আলো-হাওয়ার অদ্বিতীয় উৎস। সুতরাং, আমি জানালাটা বেশি করে খুলে রাখি। লালা পিন্ডি দাস যখন সেটা পরপর পাঁচ দিন খোলা অবস্থায়ই দেখলেন, তখন একদিন সকালবেলা আমার অফিসে বেরোবার সময় ইশারা করে আমায় ডাক দিলেন। তার পর নসিহত করলেন, জানালাটার সামনে কয়েকজন মানী লোক থাকেন। সুতরাং, আপনার মতো লোকের পক্ষে জানালাটা সবসময় খোলা রাখা উচিত নয়।
আমি বললাম, লালা পিন্ডি দাসজি, দুজন মানী লোকের মধ্যে কখনও ঝগড়া হওয়া সম্ভব নয়। জ্যামিতির হিসাব বলে, দুটো সমান্তরাল রেখা কোনওদিনই পরস্পরের সঙ্গে মিলতে পারে না।
কিন্তু জ্যামিতি বস্তুটি বোধহয় লালা পিন্ডি দাসজির মাথায় একেবারেই ঢোকে না। আমার কথাটা তাই ভালো লাগল না তাঁর। ভাবলাম, ওঁকে বুঝিয়ে বলি, সামনের বাড়িতে কোনও ভদ্রমহিলা থাকেন না, থাকে ষাট বছরের এক বুড়ি। সে রোদ্দুরে বসে উকুন মারে।– কিন্তু লালা পিন্ডি দাসকে একথা বলার অর্থ তো আমি এদিক-ওদিক তাকিয়ে থাকি, এই অভিযোগটা মেনে নেওয়া। সুতরাং আমি নীরব থেকে ষাট বছরের রূপসীর প্রেমের পথটা নিজেই বন্ধ করে ফেললাম। অর্থাৎ জানালাটা বন্ধ করে দিলাম। অন্যের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করা এমনিতেও আমার স্বভাবের বাইরে। তার ওপর, জানালা বন্ধ করায় লালা পিন্ডি দাসের চোখে আমার যে সম্মান বেড়ে গেল, সেটুকু উপরি লাভ।
জানালা বন্ধ হওয়ায় আলো-হাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল। তিন-চার দিন ভয়ানক রাগ হতে লাগল আমার। সে রাগ কমতে কমতে ক্রমে এসে ঠেকল বিস্ময়ে। কয়েকবার ইচ্ছে হল, লালা পিন্ডি দাসকে বলে দিই, জানালা খোলাই থাকবে। আমার যা করতে চান, করুনগে। কিন্তু আবার ভাবলাম, পাড়ার লোকে আমায় ঝগড়াটে ঠাওরাবে। সুতরাং সামনাসামনি লালা পিন্ডি দাসের সঙ্গে লেগে পড়াটা আর উচিত মনে করলাম না। ফলে আলো-হাওয়া ছাড়াই আমি জ্যান্ত থাকবার চেষ্টা করতে লাগলাম। কোনও এক প্রাচীন কবির সেই বিখ্যাত লাইনটি এই অবস্থায় আমায় যথেষ্ট সাহস জোগাতে লাগল– ‘হিম্মত করে ইনসান তো কিয়া হো নেহি সতা!’
