ডাক্তার সাহেব কয়েক মুহূর্ত মাথা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে থাকলেন। পরে নিঃশব্দ চরণে তাঁর কামরায় গিয়ে ঢুকলেন।
8
বাসায় প্রত্যাবর্তনের সময় আমি সারা পথ নিশ্চুপ ছিলাম। ঘোড়া সহিসদের আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ ডাক্তার সাহেব সহৃদয় হয়ে কুকুরকে স্ট্রেচারে করেই নিয়ে যেতে হুকুম দিয়েছেন। দুটো আর্দালিও সাথে করে দিলেন। আর্দালিগুলো বড় আমুদে ছিল। সারাপথ নানারকমের গান গেয়ে তারা আমার মনোরঞ্জনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমি সারা পথ নিশ্চুপ ছিলাম।
মধুমতী খুব খুশি হল। সে আর্দালিদের বিশ টাকা বখশিশ দিয়েছে। আর্দালিরা চলে গেলে সে আমার কপোলে তার কপোল সংযুক্ত করে আমাকে পুরস্কার দিল। পরে সে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার কুকুরের প্রতি মনোযোগ রাখল। আর আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম, তখন আমার মনের ভেতর তুমুল ঝড় বইছিল।
সে আমাকে উদাস দেখে বলল, ‘তুমি তো এমন গুম হয়ে আছ, যেন আমার সমুদ্র বেঁচে যাওয়াতে তুমি একটুও খুশি হওনি।’
‘না, তা নয়।’ আমি মৃদুস্বরে বললাম।
‘তো কী!’ সে ভয় পেয়ে গেল।
আমি তাকে হাসপাতালের সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম।
ঘটনা শুনে সে হঠাৎ মাথা ঝাঁকি দিয়ে বলল, ‘উন্মাদ হলে নাকি! এ জংলিরা তো হর হামেশা ব্যাঘ্রের শিকারেই পতিত হচ্ছে এবং আরও কত হবে। অতীতে এরকম আরও কত
কেস হয়েছে এবং কত হাজার হাজার লোক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করছে। আর এখন, আমরা কথা বলার এ মুহূর্তেও না জানি এক মিনিটে কত হাজার লোকের মৃত্যু হচ্ছে। এরকম যদি হিসাবই করতে থাক তাহলে পৃথিবীতে কোনোকিছুই করতে পারবে না শ্রীরাম।
এরপর সে আমার হাত ধরে বাইরে বাংলোর বারান্দায় নিয়ে এল। চোখ-জোড়া বিস্ফারিত করে বলল– ‘এস এখানে বসি। এ ঠাণ্ডা হাওয়ায় বসে চা পান করতে করতে তোমার কণ্ঠ থেকে কিটসের প্রেমের কবিতা শুনি। আহ্! কিটসের প্রেমের কবিতা কী নরম আর মোলায়েম। ঠিক আমার কুকুরের লোমের মতো।
আমার মন প্রফুল্ল রাখার জন্য সে অনেকক্ষণ পর্যন্ত একথা সেকথা অনেক কথা বলল। কিন্তু আমার মন তবুও সারাক্ষণ বিষণ্ন হয়েই রইল। মনকে স্বাভাবিক রাখার জন্য অনেক চেষ্টা করলাম। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে, অবশেষে আমি নিশ্চুপ নির্লিপ্ত অবস্থায় বসে ছিলাম। সে এক আশ্চর্য জড় পদার্থের মতো নীরব, নিথর। সে আমার সমস্ত অনুভূতি শক্তিকে পুরো নিজের আয়ত্তাধীন করে নিয়েছে। আমি না কিছু বলতে পারছি, না কিছু চিন্তা করতে পারছি।
চা এলে সে নিজ হাতে আমার জন্য চা তৈরি করল এবং বিস্কিটের প্যাকেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল– ‘নাও, খাও।’
আমি নীরবে প্রত্যাখ্যান করলাম। সে জোর করে একখানা বিস্কিট আমার মুখে পুরে দিল। বলল, ‘খেতে হবে। খাও।’
অগত্যা বিস্কিট খেতে শুরু করলাম। এ-সময় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমি আপন মনেই বিস্কিট খেয়ে যাচ্ছি। আমার চোয়ালও স্বাভাবিকভাবে নড়ছে। বিস্কিট খেতে খেতে হঠাৎ আমার অনুভব হল, যেটা আমি খাচ্ছি সেটা না পানসে, না মিষ্টি। বরং সে বিস্কিট নোনতা বলেও মনে হল না। মনে হল যেন সেটা খসখসে একখণ্ড মাংসের টুকরো।
হঠাৎ জোরে আমার বমি এল এবং আমি ওখান থেকে দ্রুত উঠে চলে এলাম। পেছন থেকে মধুমতী আমাকে শুধু ডাকতেই থাকল।
৫
না না, আপনারা ভুল বুঝেছেন। আমি সারদাকে বিয়ে করিনি, আমি মধুমতাঁকেই বিয়ে করেছি।
এটা তো কত আনন্দের কথা। তখন আমি ছিলাম একজন অনভিজ্ঞ অপরিণামদর্শী যুবক মাত্র। জীবনের হিসাব-নিকাশের খাতায় তখন আমি পাকাপোক্ত ছিলাম না। এখন আমি একজন সাফল্যবান পুরুষ। একজন বড় কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক। এখন যত লোক যেভাবেই মারা যাক-না কেন, আমার বিস্কিটের স্বাদ কিন্তু পরিবর্তন হয় না।
অনুবাদ : আখতার-উন-নবী
ভাড়াটে বাড়ি – ফিকর তওনসভি
ইতিবৃত্তটি বলি, শুনুন। শহরে আমার চাকরির ব্যবস্থা আধপাকা হয়ে গেলে ভদ্দরলোকদের মতো আমিও একটা কামরা ভাড়া নেওয়াই যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করলাম। কামরা ভাড়া নেওয়ার আরও একটি বিশেষ কারণ হল, আমার পৈতৃক ভিটে মাত্র একটি। ইতিহাস এবং রাজনীতির সঙ্গে বাবা-মা’র কোনওরকম সম্পর্ক না-থাকলেও তাঁরা সে বাড়ি হিন্দুস্থানে করেননি, করেছিলেন পাকিস্তানে। এবং পৈতৃক বাড়ি পাকিস্তানে হলে হিন্দুস্থানে কামরা ভাড়া নিতে হবেই, এ তো জানা কথাই।
কিন্তু এ তো হল ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া। ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়াটাও এক আজব চিজ এই দুদিনের দুনিয়ায়। সংক্ষেপে বলি। এ ব্যাপারে একদিন রেল কোম্পানির রিটায়ার্ড গুড্ড্স ক্লার্ক লালা পিন্ডি দাসের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আমার। তিনি আমায় অন্যান্য ভাড়াটেদের সাথে তিনতলায় একটা কামরা দিয়ে দিলেন। ভাড়া মাসে বিশ টাকা। লালা পিন্ডি দাসকে বললাম, আপনি দেবতুল্য মানুষ।
তিনি একটু হেসে বললেন, আপনিও খুব ভদ্রলোক, মনে হচ্ছে।
আমি বললাম, যখন যেমন তখন তেমন
লালা পিন্ডি দাস আমায় প্রথমদিনের অতিথি বিবেচনা করে যথেষ্ট খাতির-যত্ন করলেন আমার। অর্থাৎ, এক গ্লাস জল খাওয়ালেন এবং একটা বিড়ি বাড়িয়ে দিলেন। আর, আমি এই খাতির-যত্নের প্রতিদানে বিশ টাকা ভাড়া অগ্রিম দিয়ে দিলাম। আমাদের সম্পর্ক এমন নিবিড় হয়ে উঠল, যেন বাঘে-ছাগলে এক ঘাটে জল খাচ্ছে।
