‘যাও, তাঁকে বলোগে, মধুমতী মেমসাহেবের কুকুরও এসেছে।’
আর্দালি অদৃশ্য হলে আমি করিডোরে পায়চারি করতে করতে রুগীদের অবস্থা পরিদর্শন করতে থাকলাম। দুজন বৃদ্ধ থেমে থেমে পালাক্রমে কাশতে লাগল। একজনের কাশি বন্ধ হলেই অন্য জনের শুরু হয়। তাদের উভয়ের মধ্যে কেমন যেন একটা সমঝোতা মনে হচ্ছিল। ছিপছিপে ধনুকের মতো একটা শিশু মা-র কোলে বসে এক নাগাড়ে কেঁদে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেন এ শিশু পৃথিবীতে পদার্পণ করার পর থেকে কিছুই খায়নি। আর বেচারি মা-ও যেন তার ক্ষুধার ওষুধ করতে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। একজন লোক পুরো বেঞ্চের উপর শুয়ে বেদনার জ্বালায় বারবার কেবল ঝাঁকিয়ে উঠছে। তিনজন লোক তাকে সান্ত্বনা দিতে লেগে আছে। তাদের জিগ্যেস করে জানতে পেলাম রাত থেকে লোকটার বেদনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সামনে অগ্রসর হয়ে দেখলাম একটা যুবকের ক্ষত-বিক্ষত দেহ পড়ে আছে। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। খাটের নিচে রক্ত জমে শক্ত হয়ে গেছে। তাকে জংলি বাঘে আক্রমণ করেছে বলে মনে হল। কাঁচা মাংসপিণ্ড– এবং পায়ের হাঁটু থেকে চামড়া খসে পড়ে গেছে। তার চেহারার রং নীল হয়ে গেছে, চক্ষু মুদ্রিত ছিল। তার স্ত্রী এবং বাবা হতবুদ্ধি হয়ে কখনো এ আর্দালির কাছে কখনো ও আর্দালির কাছে গিয়ে হাতজোড় করতে লাগল। ডাক্তারকে দ্রুত খবর দিতে বারবার অনুনয়-বিনয় করতে লাগল।
এ-সময় হঠাৎ বড় ডাক্তার তাঁর প্রকোষ্ঠ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। দুজন আর্দালি বিনীত চরণে তাঁর পেছনে এল। আর্দালি হাতের ইশারায় আমাকে দেখিয়ে দিলে ডাক্তার তাড়াতাড়ি আমার কাছে এলেন।
‘কই, সমুদ্র কোথায়?’ তিনি আমাকে জিগ্যেস করলেন।
‘সমুদ্র তো বোম্বাইতে।’ আমি জবাব দিলাম– ‘পাহাড়ের উপর হ্রদ হয়, সমুদ্র হয় না।’
পরের বুঝলাম সমুদ্র আসলে মধুমতীর কুকুরের নাম। কুকুরের নামের দিকে এতদিন লক্ষ করিনি বলে আমাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য লজ্জিত হতে হল। এরপর আমি ডাক্তারকে বললাম– ‘সমুদ্র বাইরে আছে। তার দেহের ওজন খুব বেশি। কোলে করে এখানে আনা সম্ভব নয় বলে ওখানে আছে। তাছাড়া বাহকরাও অনেক পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে।’
‘কোনো চিন্তা নেই।’ ডাক্তার সাহেব জোরে আর্দালিকে হুকুম করলেন– ‘স্ট্রেচার বাইরে নিয়ে যাও এবং মধুমতী মেমসাহেবের কুকুরকে এক্ষুনি ভেতরে নিয়ে এস।’
দুজন আর্দালি তখনি স্ট্রেচার নিয়ে বাইরে পা বাড়াল।
বৃদ্ধ বাবার ঠোঁট-জোড়া শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, তার উত্তোলিত হস্তদ্বয় ভয়-ভীতিতে কাঁপছিল। বৃদ্ধ প্রায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল– ‘ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলেকে বাঁচান। তাকে বাঘে আক্রমণ করেছে।
‘এক্ষুনি দেখছি।’ ডাক্তার সাহেব তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন এবং সামনে কয়েক কদম অগ্রসর হয়ে করিডোরের বাইরে যেতে লাগলেন। তখন আর্দালিদের সাবধানতার সাথে স্ট্রেচারে করে কুকুরকে আনতে দেখে থমকে দাঁড়ালেন কয়েক মুহূর্ত এবং পরে ক্ষিপ্রগতিতে ডাক্তার সাহেব স্ট্রেচারের কাছে গিয়ে কুকুরের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে লাগলেন।
‘হ্যালো সমুদ্র–পুয়র ডাগি, You have been hurt. What a shame! বটে, ডন্ট ওরি… You. We will set. Right in a minute ‘ এবং পরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন– ‘Brave dog! Heirsa!‘
আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কুকুর তার মাতৃভাষা বোঝে না?’
ডাক্তার সাহেব গর্বের সাথে বললেন, ‘শুধু ইংরেজি বোঝে।’ তিনি এমন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন যেন আমি দু-পা বিশিষ্ট কোনো এক নীচু বংশের কুকুর আর কি।
কুকুরের স্ট্রেচার বাঘে আক্রমণ-করা যুবকের খাটের পাশ দিয়ে নিয়ে যাবার সময় যুবকের স্ত্রী ডাক্তারের পা জোড়া ছুঁয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘শুধু এক পলক তাকে দেখুন ডাক্তার সাহেব, ভগবানের দোহাই! শুধু এক পলক।’
‘এক্ষুনি আসছি, এক্ষুনি আসছি।’ ডাক্তার সাহেব ঘাবড়ে গিয়ে পা সরিয়ে নিলেন এবং স্ট্রেচারের সাথে সাথে অপারেশন রুমে প্রবেশ করলেন।
প্রায় এক ঘণ্টা পর আমরা অপারেশন রুম থেকে বেরুলাম। সমুদ্রের সব ক্ষতস্থানে সেলাই করে দেয়া হয়েছে। পায়ের হাড় জোড়া লাগিয়ে প্লাস্টার করে দেয়া হয়েছে।
‘আর কোনো ভয় নেই।’ ডাক্তার সাহেব আমাকে বললেন। পরে তিনি সমুদ্রের থুতনিতে হাত দিয়ে আদরের সাথে বললেন– ‘Brave dog. ‘ .
কুকুর খুব কষ্টে দম ফেলল এবং চোখ মুদে শুয়ে থাকল।
আর্দালিরা আবার কুকুরকে স্ট্রেচারে তুলে সবরকমের সাবধানতা অবলম্বন করে নিয়ে যেতে লাগল। দ্বিতীয়বার আমরা করিডোর দিয়ে গমন করার প্রাক্কালে ডাক্তার সাহেব আমাকে বিদায় সম্ভাষণ দিয়ে যুবকের খাটের দিকে চলে যেতে লাগলেন। আমি আর স্ট্রেচারের সাথে যেতে পারলাম না। ডাক্তারের পেছনে পেছনেই হাঁটতে শুরু করলাম। ডাক্তার সাহেব যুবকের নাড়ি পরীক্ষা করতে লেগে গেলেন।
‘ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলে’– বৃদ্ধ বাবা ঝাঁকিয়ে উঠল– ‘যে-কোনোরকমেই হোক আমার বাদলের প্রাণ বাঁচিয়ে দিন।’
‘কিন্তু এ তো মরে গেছে!’ ডাক্তার সাহেব মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদৃকণ্ঠে বললেন।
যতদিন আমি এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকব সে বৃদ্ধের চেহারা ভুলতে পারব না। বৃদ্ধ একবার আমার দিকে একবার ডাক্তার সাহেবের দিকে তাকাতে লাগল। তখন তার চোখ থেকে অশ্রুর প্লাবন বয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সে বড় কষ্ট করে অশ্রু রোধ করতে চেষ্টা করল। তার চেহারায় কয়েক দিনের গজিয়ে ওঠা দাড়ি এবং তার চেহারায় এত ফাটল ছিল, যেরকম চাষ করা জমিতে থাকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেসব ফাটল দিয়ে ঘামের স্রোত বয়ে যেতে লাগল। ঝড়ে পাওয়া পাতার মতো তার চেহারা কাঁপতে লাগল। প্রথম কয়েক মুহূর্ত তার কণ্ঠ থেকে কোনো আওয়াজই বেরুল না। কিছুক্ষণ পরে তার কণ্ঠ থেকে এক আওয়াজ বেরুল– সে আওয়াজ বজ্রের মতো ফেটে পড়ল। সে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘কিন্তু একটু আগেও সে জীবিত ছিল ডাক্তার সাহেব! আমার বাদল…।’
