কিন্তু যখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ডিপ্লোমা পেলাম তখন একদিন আমার বাবার ডাক পড়ল লালা বিহারীলালের চেম্বারে। তাঁর ফার্মেই বাবা একাউন্টেন্টের পদে বহাল ছিলেন। এঁদের উভয়ের মধ্যেই যেসব কথাবার্তা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, আমার বিয়ে সারদার সাথে নয় বরং মধুমতীর সাথেই হবে– যে লালা বিহারীলালের একমাত্র মেয়ে এবং সে বড় সুন্দরীও। এখন আমাকে মধুমতীর হৃদয় জয় করতে নৈনিতালে যেতে হবে। যদি মধুমতীর হৃদয় জয় করতে পারি বা নিদেনপক্ষে মধুমতী আমার বিরোধিতা না করে তাহলে লালা বিহারীলাল আমাকে তাঁর জামাতা বানিয়ে নেবেন।
‘কিন্তু সে হিসাব কষা আমাদের পক্ষে ঠিক হবে না।’ আমি আপত্তি করলাম। আমি আপত্তি করতাম না, কিন্তু সে সময় আমার মানসপটে সারদার লাজনম্র মুখমণ্ডল বারবার উদিত হচ্ছিল। যেন অশ্রুতে তার চোখের কোণ সিক্ত হয়ে গেছে। আমি যে কী বলব– তখন আমরা আমাদের ঘরের পর্দার রং পর্যন্ত প্রায় পছন্দ করে রেখেছিলাম।
তাই আমি জোর দিয়ে বললাম ‘দেখুন বাবা, লালা বিহারীলাল কোটিপতি। তাঁর শান-শওকত এবং তাঁর পদমর্যাদার সাথে খাপ খাইয়ে তিনি আর একজন কোটিপতি বর ঠিক পেয়েই যাবেন। এতে কোনো কষ্ট হবে না তাঁর।’
‘তিনি এরকম জামাতা চান না যার পিতা কোটিপতি।’ বাবা বলতে থাকলেন- ‘অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে কোটিপতি ছেলে শ্বশুরের টাকা বাবার ব্যবসায় জড়িয়ে ফেলে। এতে ব্যাপারটা তালগোল পাকিয়ে যায়। সম্পর্ক, সদ্ভাব নষ্ট হয়। এক বাক্সের টাকা অন্য বাক্সে গিয়ে পৌঁছয়। প্রাণের যে একটা আকর্ষণ থাকে তা জটিল আকার ধারণ করে। লালা বিহারীলাল এরকম জটিলতা চান না। তাই তিনি আগ্রহ প্রকাশ করলেন যেন তুমি আজই নৈনিতাল যাত্রা কর এবং মধুমতীর হৃদয়মন জয় করতে চেষ্টা কর। অবশ্য তোমাকে বেশি চেষ্টা করতে হবে না। লালা বিহারীলাল নিজেও যথেষ্ট চেষ্টা করবেন। এদিকে আবার তিনি আজকাল কনস্ট্রাকশন লাইনেও যাতায়াত করছেন। যদি ঘরের জামাতা ইঞ্জিনিয়ার হয় তাহলে দেখ তো ঠিকাদারিতে কত টাকা উদ্বৃত্ত থেকে যাবে? একটু চিন্তা কর বাবা, এরপর তুমি কী থেকে কী হয়ে যাবে। তাছাড়া আমার বৃদ্ধ অবস্থার দিকেও একটু লক্ষ কর, তোমার মা’র ভগ্ন চেহারাখানার দিকেও একটু তাকাও। আর সে যৌতুকও হিসাব কর– যে যৌতুক তোমার তিনজন অবিবাহিতা বোনকে বিয়ে দিতে খরচ হবে। আর সে মোটা অঙ্কও আনা পাইয়ে হিসাবে কর– যে অঙ্ক তোমার ছোট চার ভাইকে পড়ালেখার বাবদ তোমাকেই খরচ করতে হবে। ঠিকমতো হিসাব মিলিয়ে দেখ বাবা।
আমি ঠিকমতোই হিসাব মিলিয়ে দেখলাম অর্থাৎ নৈতিতালে যাব বলেই স্থির সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমার সিদ্ধান্ত শুনে সারদা অশ্রু বিসর্জন দিল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আমাকে জিগ্যেস করল সে, রামজি, এটা কীরকম হিসাব?’
আমি বললাম– ‘এটাকে হায়ার মেথামেটিক্স (Higher Mathematics) বলে।’
২
সারদার শ্যামল লাজনম্র মুখমণ্ডল মধুমতীর তুলনায় কিছুই না। মধুমতী মালার মতো উজ্জ্বল তেজোদীপ্ত সুন্দর হীরার মতো জ্বলজ্বল করছিল এবং হীরার মতো শক্তও ছিল। তার ঠোঁট যেন পদ্মারাগমণি, চক্ষু নীল, কপোল রক্তিম এবং দাঁত মোতিমালার মতো। সে হাসবার সময় মনে হত বুঝি মুখের চালুনি থেকে পরিষ্কার পুষ্পরাগমণির দানা ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ছে। একদিন সে হাসার সময় আমার ইচ্ছে হল তার মুখের কাছে রুমাল বিছিয়ে দিই এবং পুষ্পরাগমণির সব দানা কুড়িয়ে নিই। কিন্তু পরে এই ভেবে বিরত থাকলাম যে পাছে সে আপত্তি করে এবং আমার হিসাবে গণ্ডগোল হয়ে যায়।
মধুমতাঁকে কলেজজীবন থেকেই চিনতাম আমি। সে রুক্ষ মেজাজ এবং হাকিমানা স্বভাবের ছিল। কখনো কাজ-কাম করত না, পড়ালেখাও তেমন করত না সে। অথচ প্রতি বছর পাস করে যেত। কারণ এ কলেজ তার বাবা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কথায় কথায় অধ্যাপকদের সে হাসি-ঠাট্টা করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত। একদিন কেমিস্ট্রির এক অধ্যাপক তাকে জিগ্যেস করলেন (তিনি এ কলেজে নতুন যোগ দিয়েছিলেন তাই মধুমতাঁকে চিনতেন না। না হয় তিনি জিগ্যেসও করতেন না।)–
‘ইস্পাত কী দিয়ে তৈরি করে?’
‘লোহা দিয়ে তৈরি করে।’ মধুমতী বলল।
‘হাঁ হাঁ, লোহা দিয়েই তৈরি করে কিন্তু কীভাবে তৈরি করে?’
‘ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে।’
‘ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে কিন্তু কীভাবে তৈরি করে?
‘কারখানায় তৈরি করে।’ মধুমতী দুর্বল কণ্ঠে বলল।
‘আর তা তো বুঝলাম, কিন্তু তৈরি কীভাবে করে।’ অধ্যাপক রাগতস্বরে বলে উঠলেন– ‘ কীভাবে?’ জোর দিয়ে জিগ্যেস করলেন।
‘এটা বড় খারাপ কথা অধ্যাপক সাহেব’– মধুমতী বলতে থাকল– ‘আপনার সব প্রশ্নের জবাব এভাবে কেবল আমি দিতেই থাকব? কেমিস্ট্রির অধ্যাপক আপনি, আমি নই।’
কিন্তু তখন আমি মধুমতাঁকে দেখতাম কেবল দূর থেকেই আর এখন তার সাথেই চলাফেরা করছি হাতে হাত মিলিয়ে। দেয়ালের পার্শ্বে ছোট পাহাড়ি রাস্তার উপর চন্দ্রালোক অন্ধকার ছায়ার চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। পরিবেশ তখন একটা কঠিন প্রশ্নের মতো স্তব্ধ হয়ে আছে। এ-সময় মধুমতীর কটিদেশ আমার সঙ্কোচহস্তের নিষ্পেষণে রত। তখন আমাদের যেন এক অদৃশ্য হস্ত চোখের নিমিষে একবিন্দুতে পরিণত করে ফেলেছে।
