জ্বলন্ত কাঠি নিয়ে তার হাতখানা বলদেবের চেহারার কাছে এসে থামল। আর আশ্চর্য হয়ে তার চেহারা দেখতে থাকল। সে আশ্চর্য হয়ে ভাবছিল– এই ময়লা অথচ রেশমি জামাপরা লোকটি ভিখারিদের এই বিড়ম্বিত জীবনে কীভাবে এসে পড়ল। এবার বলদেব তার চেহারাখানা অতি নিকট থেকে দেখার সুযোগ পেল। কালো রং, একরাশ ময়লার নিচে এবং তার ছোট ছোট চকচকে চোখজোড়ার নিচে এমন একরকমের চাপা আগুন ছিল– যা ম্যাচের ক্ষীণ আলোয় আরো জ্বলে উঠল। উদ্গতবক্ষে যৌবনের স্বভাবজাত সাক্ষী দুটো ঈষৎ কাঁপছে। এবং তার দেহ থেকে এক অদ্ভুত গন্ধের আমেজ ছড়িয়ে পড়ছে– যার ভেতর ময়লা, ঘাম, দারিদ্র্য, যৌবন, কামনা এবং আমন্ত্রণ সবকিছুই মিশে একাকার হয়ে গেছে–। তারা উভয়ে একে অন্যকে দেখতে থাকল। এমনকি ম্যাচের কাঠি জ্বলতে জ্বলতে ভিখারিনিটির আঙুল পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিল। তারা উভয়ে আবার সেই একরাশ কালো অন্ধকারে হারিয়ে গেল। আর বলদেব একটা উষ্ণ নিশ্বাসের তপ্তস্পর্শ অনুভব করল নিজের চেহারায়। কিন্তু পরমুহূর্তে আবার ম্যাচ জ্বলে উঠল এবং বলদেব একটা বিড়ি জ্বালল।
স্ব-স্ব থামে ঠেস দিয়ে তারা বিড়ি ফুঁকতে লাগল। চারিদিকে ছড়ানো কালো অন্ধকারে তাদের বিড়ির ক্ষীণ অগ্নিকণাকে দেখতে মনে হচ্ছিল যেন আকাশের সব নক্ষত্র ডুবে গেছে, শুধুমাত্র দুটি নক্ষত্র একে অন্যের দিকে তাকিয়ে জোনাকির মতো টিম টিম করে যেন ক্ষীণ আলো বিকিরণ করছে। একটা টান দেয়ার জন্য বলদেব হাত উপরে তুলে দেখল আঙুল কাঁপছে। মস্তক স্পর্শ করে দেখল মাথা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। বিড়িতে কষে একটা টান দিয়ে দেখল বুকে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে– নিউমোনিয়া? কথাটা মনে পড়তেই তার সমস্ত দেহ প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠল।
‘বাবু।’
‘উঁ।’
‘তোমার খুব ঠাণ্ডা লাগছে তাই না?’
‘না তো!’
কিন্তু সে মুহূর্তে কে জানে কোথা থেকে বরফমাখা এক ঝটকা বাতাস এসে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবং তার বুকের ঈষৎ ফাঁক দিয়ে যেন তীক্ষ্ণ চাকুর মতো বিদ্ধ হল।
‘বাবু, তুমি তো ঠাণ্ডায় বেশ কাঁপছ!
‘না, এমন কিছু না।’
কিন্তু কথাটা বলার সময়ও তার ঠোঁটজোড়া কেঁপে উঠল। দাঁত ঠক্ঠক্ করে উঠল।
‘বাবু এ ঠাণ্ডা বড় খারাপ, নিউমোনিয়া হবে যাবে।’
‘হতে দাও।’
এবার ঠাণ্ডা তার শিরায় শিরায় গিয়ে বুকের নিশ্বাস চূর্ণ করতে থাকল। তার জ্ঞানবুদ্ধি এক অদ্ভুত হতাশার মাঝে বিলীন হয়ে যেতে লাগল আস্তে আস্তে। বহু কষ্টে তার ক্ষীণকণ্ঠ বলে উঠল।
‘এখন আর এছাড়া উপায়-বা কী।
‘আমার কাছে চলে এস বাবু।’
বহুকষ্টে চোখজোড়া খুলে সে ভিখারিনির দিকে তার নিষ্প্রভ দৃষ্টি ছেড়ে দিল। ভিখারিনিটি ছেঁড়া শাড়ি জড়িয়ে একটা কাপড়ের পুঁটলির মতো জড়সড় হয়ে পড়ে আছে।
‘তোমার কাছেও তো কম্বল নেই।’
‘কম্বল নেই, তা আমি তো আছি বাবু।’
জ্বর আর বিশীর্ণ পাঁজর– এ মুহূর্তে সে কোনো কিছুর ইশারাই বুঝতে সমর্থ নয়। কিন্তু বিষাক্ত বরফমাখা আরেক ঝট্কা বাতাস এসে তাকে আক্রমণ করল। আর বলদেবের বোধশক্তি এক বিরাট চিৎকারের মাঝে হারিয়ে গেল।
‘কোল্ড ওয়েভ– কোল্ড ওয়েভ– কোল্ড ওয়েভ–’
‘বিষাক্ত ঠাণ্ডার ফণা আসছে– ইনফ্লুয়েঞ্জা– নিউমোনিয়ার ভয়– নিউমোনিয়া, মৃত্যু– ‘
‘কোল্ড ওয়েভ– কোল্ড ওয়েভ কোল্ড ওয়েভ—’
এবং সেই বোধশক্তির মধ্যে আরেকটি বোধশক্তি, কোটি মানুষের নাসিকাধ্বনির চিৎকার, কিন্তু সেই চিৎকারে ঠাণ্ডা নেই। বিষ নেই। আছে ওষুধ, বিশীর্ণতা নেই– আছে জীবন সঞ্জীবনী নিশ্বাসের স্পর্শ।
এবং বলদেব অনুভব করল যেন কোমলতায় ভরা, উষ্ণতার ভরা এবং প্রেমময়তায় ভরা একখানা লেপের ভেতর সে ডুবে যাচ্ছে। এবার আর তার জীবনে কোনো কোল্ড ওয়েভের ভয় নেই।
অনুবাদ : আখতার-উন-নবী
মধুমতী – কৃষণ চন্দর
১
প্রথম থেকেই আমার মনটা ছিল রোমান্টিক এবং সূক্ষ্ম অনুভূতিশীল। উড়ন্ত পাখি, উন্মুক্ত নীল আকাশ, রামধনুর প্রস্ফুটিত রং আমি পছন্দ করতাম। আর পছন্দ করতাম যে-মেয়ে হাসলে গালে টোল পড়ে এবং যে নদী পাথরের সাথে হুমড়ি খেয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু আমার পিতৃদেব আমার সব আকাঙ্ক্ষায় বাধা দান করলেন। (তাঁর নাম গোবিন্দ রাম) তিনি বললেন, ‘বাবা শ্রীরাম, এ পৃথিবীটা রং-তামাশার ওপর নির্ভর করে চলে না। এটা হচ্ছে বিজ্ঞানের যুগ, এ পৃথিবীটা এখন বিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করে চলে। তাই তোমাকে কবি নয়, বরং ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে।’
অঙ্কশাস্ত্রের প্রতি বরাবরই আমার বিমুখতা ছিল। প্রায়শ আমি ভাবতাম– হা খোদা, এই দুই আর দুইয়ে চার কেন হয়! পাঁচ কেন হয় না? তিন অথবা আড়াই হয় না কেন? এক হয়ে যায় না কেন? যেরকম কখনো কখনো মানুষ জীবনে এক হয়ে যায়। কিন্তু অঙ্কশাস্ত্রে তা হয় না। কখনো হয় না। আপনি হাজার বার চেষ্টা করে দেখুন, হবে না। কিন্তু যেহেতু আমাকে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে সুতরাং আমি অঙ্ক শিখতে আমার জীবনের সর্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করলাম। ডিপ্লোমা উপাধি নেয়ার সময় আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্টও হলাম। এ খবরে সবচাইতে বেশি খুশি হয়েছিল সারদা– যার সাথে শৈশবে বাগদান হয়েছিল, এবং যাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। আমরা একসাথে খেলতাম, একসাথে পড়তাম এবং সাথে সাথে আমরা এ সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছিলাম যে, আমরা ঘর গড়ব– যেখানে শুধু আমরাই থাকব। সন্তান-সন্ততির সংখ্যা কত হবে এবং তাদের কী কী খাওয়ানো যাবে এবং কী করে গড়ে তোলা যাবে তারও একটা হিসাব ঠিক করে রেখেছিলাম।
