অকস্মাৎ বন্ধু দমে গেল। নিতান্তই নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল, ‘আচ্ছা ভাই চেষ্টা করব। তুমি বরং এক কাজ কর, পরশু আমার সাথে দেখা কর। আজ আমার একটা জরুরি কাজ আছে। বাবা আজকাল দোকান থেকে উঠতেই দেন না।’
আবার পথে নামলাম আমি। চাঁদনি এসেই দেখি সমস্ত আকাশ মেঘে ছেয়ে ফেলেছে এবং মিউনিসিপ্যাল পার্কের সব গাছপালা ঠাণ্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।
সেখান থেকে সোজা আমজাদের ওখানে এলাম। তার বাবা জুতোর ব্যবসা করেন। তাদের বাড়ি ছিল হিলিমারান। গিয়ে দেখি দালানে দস্তরখান পাতানো। তাতে পরোটা, তরকারি, গাজরের হালুয়া এবং শুকনো ফল সাজানো। চায়ের কেটলি থেকে গরম গরম ধোঁয়া উড়ছে। আমজাদও এককালে আমার সহপাঠী ছিল। তার সাথে আমার বেশ ভাবও ছিল। প্রথমেই আমি বেশ ডাঁটের সাথে নাস্তা-পর্বটা শেষ করলাম। পরে আমজাদকে বললাম– ‘বন্ধু পঁচিশটা টাকা ধার দে, আট-দশ দিনের মধ্যে দিয়ে দেব।’
সে বলল– ‘হাঁ, হাঁ,… কিন্তু ব্যাপারখানা কী, টাকার এমন কী প্রয়োজন হয়ে পড়ল হঠাৎ!’ পরে যখন সব অবস্থা জানালাম তখন তার কণ্ঠস্বরও মালাইয়ের বরফের মতো মোলায়েম আর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। বলল, ‘আজকাল পয়সার একটু টানাটানিতে আছি নির্মল। টাকা-দুটাকা চাস তো দিয়ে দিই!’
পুরনো দিল্লি থেকে নয়াদিল্লি পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম। প্রায় দুপুরের দিকে হরবচনের কুঠিতে গিয়ে পৌঁছলাম। হরবচন সিংয়ের পিতা ‘গভর্নর অব ইন্ডিয়া’র ডিপুটি সেক্রেটারি। হরবচন পড়ত দিল্লি কলেজে। কিন্তু টেনিস টুর্নামেন্টেই তার সাথে আমার বেশ হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। ডবল টেনিসে সে আমার পার্টনারও ছিল। আর আমরা বরাবরই জয়লাভ করেছিলাম।
কিন্তু হরবচন ঘরে নেই। বাইরে গেছে। জিগ্যেস করে জানতে পেলাম চিমসফোর্ড ক্লাবে টেনিস প্র্যাকটিস্ করতে গেছে। সুতরাং ক্লাবে গিয়ে দেখি হরবচন টেনিসের বদলে কার্ডরুমে বসে বসে ‘রামি’ প্র্যাটিস্ করছে।
‘হ্যালো নির্মল-বয়।’ সে চেঁচিয়ে উঠল– ‘এস বস, বল কী পান করবে!
আমি বললাম, ‘তোমার সাথে নিরালা কিছু কথা বলতে চাই।
রাউন্ড শেষ করে সে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে এল। –‘কেন, কী ব্যাপার!
তাকেও আমি সমস্ত ঘটনাটা জানালাম।
‘Sorry old boy–’সে বলল, –‘তা চাকরি এখানে একদিনের মধ্যে পাওয়া দুষ্কর। সুপারিশের জোরেও অন্তত এক মাস ধরবে গিয়ে। আমি বলি, বরং বাড়ি ফিরে যা। মিরাটের ভাড়ার প্রয়োজন হলে আমিই দিচ্ছি।’
আমি বললাম, ‘নো, থ্যাঙ্কয়ু হরবচন।’
‘আচ্ছা আমি চলি, আমার পার্টনার অপেক্ষা করছে।’
ক্লাব থেকে বেরিয়ে দেখি শুধু মেঘে ছেয়ে ফেলেনি, দু-এক ফোঁটা করে পড়তেও
শুরু করেছে।– সামনে একখানা খালি ট্যাক্সি যচ্ছিল। আমাকে দেখে ড্রাইভার গতি কমিয়ে দিল।
‘ট্যাক্সি বাবুজি!’
‘হাঁ, তা তো চাই!’
‘যাবেন কোথায়!’
‘মিরাট।’
‘এতদূর যাওয়া-আসা পঞ্চাশ টাকা লাগবে।’
আমি বললাম, ‘তা-ও দিয়ে দিতাম, কিন্তু আজ শনিবার, ব্যাংক বোধহয় বন্ধ হয়ে গেছে।’ বলতে বলতে আমি সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম।
ড্রাইভার তখন তার সঙ্গীকে বলল, ‘বন্ধু গরমে মানুষ পাগল হতে শুনেছি, শীতে পাগল আজই দেখলাম।’
ওখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমি এমপ্লয়মেন্ট একচেঞ্জে এসে পৌঁছলাম। সব অফিস ঘুরলাম। দোকানপাট সব জরিপ করলাম, কিন্তু একজন বি.এ.পাস সুস্থসবল বুদ্ধিদীপ্ত যুবকের জন্য কোনো চাকরি নেই। সন্ধ্যাও ক্রমশ ঘনিয়ে আসতে লাগল, সাথে সথে ঠাণ্ডা ও বাড়তে শুরু করল। টেম্পারেচার নামতে থাকল আর আমার হৃৎকম্প বাড়তে থাকল।
এখন রাত অর্ধেক চলে গেছে। ক্যানাট-প্যালেসে একরাশ নীরবতা জমাট বেঁধে আছে। শিমলা থেকে আগত ঠাণ্ডা হওয়ায় গা শিরশির্ করছে। বলা হয়েছে কোল্ড ওয়েভ (Cold wave ) আসবে। বোধহয় এসে গেছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোনিয়ার ভয় আছে। বুকেও একরকমের ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। আমি এবং আমার আত্মা এই বরফমাখা নিস্তব্ধতায় উলঙ্গ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছি, কিন্তু আত্মার তো নিউমোনিয়া হতে পারে না!
‘বাবু–!’
দৃঢ় অথচ চাপা একটা কণ্ঠস্বর বলদেবের চিন্তার সূত্র ছিন্ন ভিন্ন করে দিল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল বারান্দার আরেকটি থামের আড়ালে একটি ভিখারিনি বসে বসে ঠাণ্ডায় কাঁপছে।
‘ম্যাচ আছে বাবু–?‘
বলদেব পাতলুনের পকেটে হাত ঢোকাল। সিগ্রেট তো সেই কখন শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ম্যাচ-বাক্সে এখনো গোটা দু-তিনেক কাঠি রয়ে গেছে। ম্যাচটা নিয়ে সে ভিখারিনির দিকে ছুঁড়ে দিল।
ভিখারিণি ম্যাচ জ্বালাল। এক মুহূর্তের জন্য তার চেহারায় আলো চমক মেরে গেল। কুচকুচে কালো, যেন সাপ। সমস্ত দেহে কয় মাসের ময়লার আস্তরণ জমেছে কে জানে। মাথায় একরাশ ধুলো মাখা।– ‘তওবা তওবা, কী বিশ্রী।– বলদেব ভাবল, এখান থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে হয়।
বিড়ির ক্ষীণতম অগ্নিকণা ভিখারিনিটির প্রকম্পিত দেহে যেন নবজীবনের সঞ্চার করল। বলদেব দেখল, এখন সে আর কাঁপছে না। নিশ্চিন্তে একটা টান মেরে ধোঁয়া উদ্গীরণ করতে করতে বলল– ‘বাপরে বাপ, কী ভয়ানক ঠাণ্ডা। কী বল বাবু, বিড়ি খাবে।’
বলদেব ভাবল, না করে দেয়, ভিখারিনির ময়লা ঠোঁট-স্পর্শ-করা বিড়ি।
কিন্তু ভিখারিনিটি আবার তাড়াতাড়ি বলে উঠল ‘এটাই তো সবচাইতে শ্ৰেষ্ঠ প্ৰতিদান বাবু, তোমার ম্যাচ আমার বিড়ি– এ নাও।’– বললেই সে বিড়ির প্যাকেট তার দিকে ছুঁড়ে দিল এবং নিজেও সরে এসে তার পাশে বসল। ম্যাচে আগুন ধরিয়ে সে বলল, ‘নাও, বিড়ি জ্বালাও।’
