অগত্যা তার কুঠি থেকে নেমে এলাম। তখন রোদ পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। সম্মুখের পার্কের পাতায় ঠাণ্ডা বাতাস ঈষৎ কাঁপন তুলেছে। আমার শরীরেও সে বাতাস এক অদ্ভুত শিরশির জাগিয়ে তুলল। এবং এই প্রথমবারের মতো আমার মনে পড়ল ঘর থেকে আমি কোট অথবা পুলওভার ছাড়াই বের হয়েছি।
গতকালের ঘটনা মাত্র। কাল– ত্রিশ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেছে। আর এখন আমি মিরাট থেকে মাত্র চল্লিশ মাইল দূরে নয়াদিল্লিতে। কিন্তু এই সময়ের ব্যবধান আর দূরত্বের ব্যবধান আমার গোটা পৃথিবীটাই পাল্টে দিয়েছে।
কালকেও আমি ছিলাম এক ধনীপুত্র, একজন নিশ্চিন্ত যুবক। সমাজের স্বীকৃত আর সম্মানিত ব্যক্তি। পিতারা নিজের পুত্রের সামনে আমার বুদ্ধিমত্তা এবং যোগ্যতার প্রশংসা করত। প্রতিটি মা-ই নিজের কন্যাকে আমার কাছে বিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। কলেজের কত মেয়ে আমার নামে পাগল ছিল। দুটো কথা বলার জন্য কত ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিত। আমার আজ–! আজ আমি একজন বেকার, আশ্রয়হীন ভবঘুরে–! যার পকেটে না আছে পয়সা না আছে শরীরে একখণ্ড গরমবস্ত্র। আর যে কিনা ক্যানাটপ্যালেসের বারান্দায় থামের কাছে ঠাণ্ডা পাথরের বিছানায় বসে বসে কাঁপছে। দাঁত কড়কড় করছে। শিরায় শিরায় রক্ত জমে যাচ্ছে। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে জড়িয়ে আসছে… হতেও পারে এটা আমার একগুঁয়েমিরই ফল। ফিরে গিয়ে যদি বাবার পায়ে পড়তাম তাহলে নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমা করে দিতেন। তখন আমিও হয়তো-বা একসময় পশমি ড্রেসিং গাউন পরে আতসদানের কাছে বসে বসে ব্যান্ডি পান করতাম। কিন্তু আতসদানের উষ্ণতার চেয়েও বেশি প্রয়োজন আমার প্রেমের উষ্ণতার। আমি তারই প্রত্যাশী। আমার দেহের চেয়েও বেশি কাঁপছে আমার হৃদয়। কেননা দেহে অন্তত একটা গেঞ্জি এবং একটা জামা আছে। কিন্তু গত ত্রিশ ঘণ্টায় আমার হৃদয় থেকে এক এক করে সমস্ত কাপড় খুলে ফেলেছি। এবং এখন সে স্বভাবতই বস্ত্রহীন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যুগের বরফমাখা বাতাসে কাঁপছে।
মিরাট থাকলে বাবার দুর্নাম বাড়বে, অতএব দিল্লি চলে এলাম। স্টেশনে থার্ডক্লাস ওয়েটিংরুমে রাতটা কোনোরকমে কাটালাম। এবং এই প্রথম অনুভব করলাম গরিব আর সাধারণ মানুষ থার্ডক্লাসে ভ্রমণ করতে গিয়ে কেমন অসুবিধার সম্মুখীন হয়। নিচে মানুষ এমনভাবে পড়ে আছে যেন যুদ্ধের ময়দানে মৃতদেহ পড়ে আছে। পায়খানার দুর্গন্ধে প্ৰাণ ওষ্ঠাগত একাধিক নাসিকা-ধ্বনির সংমিশ্রণে এক অদ্ভুত সংগীতের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু গাড়িতে একনাগাড়ে একঘণ্টা তীব্র ঠাণ্ডা বাতাস খাওয়ার পর ওয়েটিংরুমের এই উষ্ণতা আমার জন্য কত মধুর। মেঝেতে একখানা পুরনো কাগজ পেতে আমি শুয়ে থাকলাম। সারাদিনের উত্তেজনা আর কোলাহলের ভারে পর্যুদস্ত দেহে ঘুমের নামগন্ধও নেই। তবুও আমি আশ্বস্ত; এখানে ঠাণ্ডা নেই। এবং তখনি, ঠিক তখনি আমার মনে পড়ল এখানে কোনো আতসদান নেই, শরীর গরম করার কোনো উপাদানই এখানে নেই। এই সুন্দর উষ্ণতা মানুষের দেহের সংবদ্ধ উত্তাপ– যা এ মুহূর্তে সকলের মৃত প্রাণ সজীব করে তুলছে। আমি ভাবলাম,– এই সুবৃহৎ ওয়েটিংরুমে আমি একা হলে মরেই যেতাম। হয়তো-বা প্রত্যূষে এখান থেকেই আমার মৃতদেহ বেরুত। এই আড়াইশো-তিনশো লোক এই কৃষকের দল, ছোটখাটো বাবু, ভারবাহী, রেলওয়ের ছোট চাকুরে, ফকির, সাধু– এদের সকলেরই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমার প্রাণটা বেঁচে গেছে। তদ্রূপ আমিও নিজের দেহের উত্তাপ দিয়ে তাদের চাঙ্গা করার প্রয়াস পেয়েছি। এবং বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমি ভাবতে থাকলাম, এই ওয়েটিংরুমে, এই যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চিত-নিদ্রিত মানুষের মধ্যে তাদের এই আকাশফাটা নাসিকা-ধ্বনির মধ্যে, এই সজীব করা উষ্ণতার মধ্যে এমন কী দার্শনিক সূক্ষ্মতা লুকিয়ে আছে! এমন সময় ঢং ঢং করে পাঁচটা বাজার সময়-সংকেত এসে যুক্ত হল একরাশ নাসিকাধ্বনির মধ্যে। এবং সম্মুখের প্রলম্বিত দুটি ইস্পাতের উপর দিয়ে ফোঁস ফোঁস শব্দ তুলে একটি ইঞ্জিন চলে গেল সুদূরের পানে। আর তার চেয়েও এক ভীতিপ্রদ স্বরে হাঁক দিয়ে উঠল স্টেশনের বড়বাবু,– ‘হেই পাহারাদার, মৃত লোকগুলোকে জাগিয়ে দাও। চলাফেরা করার জন্যও একটু জায়গা রাখে না– যেন তাদের বাবার ঘর।’
আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং বেরিয়ে পড়লাম। বাইরের বিশ্বপ্রকৃতি নীরব নিস্তব্ধ। দারুণ ঠাণ্ডা পড়ছে। রাস্তার আলো একটা একটা করে নিভতে শুরু করেছে।
কত বন্ধুর বাড়ি ধরনা দিলাম। প্রথমে রামদয়ালের বাড়ি। রামদয়াল এককালে আমার সাথে পড়ত। চাঁদনিচকে তার বাবার একখানা বড় কাপড়ের দোকান ছিল। আমাকে দেখেই অত্যন্ত হৃদ্যতার সাথে অভিনন্দন জানাল রামদয়াল।
‘এস বন্ধু নির্মল, আগে নাস্তাটা হয়ে যাক। পরে প্রোগ্রাম তৈরি করছি। কী বল নিৰ্মল মর্নিং শো একটা হয়ে যাক। ‘দিল দেকে দেখো’– সম্বন্ধে তোমার কী অভিমত! বন্ধু, ওই যে আশা পারেখ না– আগুন, সাংঘাতিক আগুন! আমি তো ফিল্মটা ইতোমধ্যেই তিনবার দেখে ফেলেছি। আজ তোমার সাথে আবার দেখি, কী বল!’
আমি বল্লাম, ‘বাবার সাথে ঝগড়া করে আমি বাড়ি থেকে চলে এসেছি। তিনি বলেছেন সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবেন। সুতরাং আমি চাকরির খোঁজে দিল্লি এসেছি।’
