আমার কিছু করা দরকার। সে ভাবল– না হয় ঠাণ্ডা আর নিঃসঙ্গতায় আমি পাগল হয়ে যাব। আমার কিছু বলা দরকার- কিছু ভাবা দরকার– না হয় মস্তিষ্ক বরফের মতো জমে একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। যেরকম পানির উপর জমে যাওয়া ভারি বরফ ডুবে নষ্ট হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর এ-ও ভুলে যাব যে, আমি কে, আমি কী, আমি কোথায় এবং কেন?
আমি কে? আমি কী?
আমি বলদেবরাজ শর্মা, জাতফাত বিশ্বাস করি না– কিন্তু জন্ম থেকেই ব্রাহ্মণ। মিরাট কলেজের গ্রাজুয়েট। আমার বাবা ওকালতি করে মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা রোজগার করেন। স্বাধীনতা পাওয়ার আগে রায়বাহাদুর রবণীরাজ শর্মা, বি.এ., এল.এল.বি. অ্যাডভোকেট হাইকোর্ট বলে ডাকত। এখন শুধু পণ্ডিত রবণীরাজ শর্মা বলেই ডাকে। আমি শুধু বাবার ছেলেই নই,– নিজেও কিছু। মানুষের ধারণা রঙ-চেহারা আর শরীরে আমি অদ্বিতীয়। তাছাড়া আমার অধ্যাপকদের বক্তব্য হচ্ছে– আমি তীক্ষ্ণ প্রতিভাসম্পন্ন, যদিও মাত্র দ্বিতীয় বিভাগে বি.এ. পাস করেছি। তবে এর কারণ, আমি কলেজের অন্যান্য অনুষ্ঠানাদিতে অবাধে অংশ নিতাম। ডিবেটিং সোসাইটি, টেনিস ক্লাব, ড্রামেটিক ক্লাব, মিটিং, কবিতা আবৃত্তি প্রভৃতি ছাড়াও আমি নিজেও ছিলাম একজন কবি। আমার ছদ্মনাম ছিল নির্মল। আমাকে আবৃত্তি অনুষ্ঠানে জনাব নির্মল মিরাঠি নামে ডাকত। কোথাও কোথাও পণ্ডিত নির্মলজি বলেও সম্বোধন করত। বলা হত আমার গজল আর কবিতায় প্রেমের বর্ণনা এমন তীব্রতা লাভ করত এবং সৌন্দর্য বর্ণনা এমন পূর্ণতা পেত– যা আমার সমসাময়িক কোনো তরুণ কবিদের কবিতায় পাওয়া যেত না।
আমি কোথায়? এবং কেন?
আমি এখন আমার বাবার সুরম্য প্রাসাদে নেই– যেখানে এখন আমার বেডরুমের আতসদানে হয়তো-বা আগুন জ্বলছে, স্প্রিংয়ের পালঙ্কে নরম কম্বল এবং রেশমি লেপ শোভা পাচ্ছে। হয়তো-বা শিয়রে সিল্কের চীনা স্লিপিং স্যুট ঝুলছে। কাশ্মিরি দর্জির তৈরি রেশমি ড্রেসিং গাউন এবং আলমারিতে মিলটন, বায়রন, কালিদাস ও গালিবের বাঁধানো পুস্তকের পেছনের ব্র্যান্ডির বোতলও আগের মতো হয়তো-বা পড়ে রয়েছে।
আমি এখন রাধার কুঠিতেও নই। সেখানে নৃত্যানুষ্ঠান হয়তো-বা জমকালোভাবে জমে উঠেছে এবং রক্তগরমকরা মদের পালা চলছে। আর একমাত্র আমি ছাড়া মিরাটের অন্যান্য সব শৌখিন মেজাজের অভিজাত যুবকেরা এগিয়ে গিয়ে প্রশংসায় ফেটে পড়ছে। আর রাধা সম্ভবত আমারই রচিত কোনো গজল অথবা আমারই নির্দেশিত কোনো ঠুমরি গেয়ে শুনাচ্ছে। রাধা…! যার সাথে আমার এত প্রণয় ছিল যার দরুন আমি ঘর ছেড়েছি। বাবা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু আমি ভ্রূক্ষেপ করিনি। গায়ের সেই এক জামা এক পাতলুন নিয়েই আমি হন্ হন্ করে চলে এসেছি। আর আমার মা উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়ে পেছনে থেকে আমাকে ডাকতে থাকলেন। কিন্তু আমার কানে তখন রাধার রহস্যময় ঘুত্রুর ছন্ছনানি বাজছিল। আমি সিদ্ধান্ত করে ফেলেছিলাম যে, আমি প্রমাণ করব কবিরা শুধু প্রেমের বর্ণনাই দেয় না, প্রেমও করে এবং মনপ্রাণ ঘরদোর সবকিছুকেই ছাড়তে পারে। রোমিও-জুলিয়েট, লাইলি মজনু, শিরি-ফরহাদ, চারুদত্ত এবং বসন্ত সীতা এরা সব তো শুধুমাত্র কাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু নির্মল ও রাধা, রাধা ও নির্মল সত্যিকার প্রেমের আগুনে পুড়ে এ পৃথিবীকে দেখিয়ে দেবে। অতএব আমি সেই পোশাকেই– পাতলুন আর জামা পরে বাজার হয়ে রাধার কুঠিতে এসে পৌঁছি। তখন আমার কাছে ঠাণ্ডা তেমন অনুভূত হয়নি। তৃতীয় প্রহরে সোনালি রোদে মোড়া ছিল এই বিশ্বপ্রকৃতি, এবং যৌবনের উত্তপ্ত রক্তও বয়ে চলেছিল আমার শিরায় শিরায়। আমার হৃদয় প্রেমরোগে আক্রান্ত এবং আমার বিশ্বাস ছিল (কেননা রাধা আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিল) সে-ও আমার মতো প্রেমাগ্নিতে জ্বলছে।
রাধা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আতসদানে নিজের লম্বা ঘন কালো চুল শুকাচ্ছিল। আতসদানের প্রজ্বলিত অঙ্গারের গোলাপি প্রতিচ্ছায়া ফুটে উঠেছে তার রক্তিম গণ্ডদ্বয়ে। আমি ভাবলাম– রাধার ভালোবাসা যার সৌভাগ্যে আছে– তার কাছে তীক্ষ্ণধার ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কোনো ভয় নেই। পৃথিবীর যে-কোনো বিপদের মোকাবেলা করতে পারে।
‘আসুন আসুন নির্মলজি।’ রাধা পেশাগত হাসিতে আমায় অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু সাথে সাথেই নিজের বড় বড় চোখজোড়া তুলে যখন সে আমার দিকে তাকাল– তার মধ্যেও আমি দেখতে পেলাম যেন প্রেমের উষ্ণ মদ টপ্কাচ্ছে।
‘রাধা তোমার জন্য আমি ঘর ছেড়ে দিয়েছি। বাবা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দিয়েছেন। ওঠ, চল আমার সাথে, আমার দিল্লি গিয়ে বিয়ে করে ফেলব…
‘এবং খাব কী?’
‘আমি চাকরি করব। তুমি চাও তো রেডিওতে গাইতেও পার।’
‘নির্মল, তুমি বড্ড ভুল করছ। তুমি বোধহয় জান না সরকারি রেডিওতে কোনো বাইজি গাইতে পারে না। যাও প্রাণনাথ, বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও গে। কেন লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি পা দিয়ে ঠেলে দিচ্ছ!’
‘শুধু এজন্যে যে, আমার কাছে সম্পত্তির চেয়েও প্রিয় তুমি। রাধা, আমি ইস্কুলে মাস্টারি করব, কেরানিগিরি করব, কিন্তু সেই ঘরে আর ফিরে যাব না– যে ঘরে তোমাকে স্ত্রী করে রাখা যাবে না।’
‘তো যাও বাবু, যা ইচ্ছে করগে। কিন্তু আমি এই লাইলি-মজনু নাটকের নায়িকা হতে প্রস্তুত নই।’– পরে সে এমন এক স্বরে বলল– যা বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা, তরবারির চেয়েও তীক্ষ্ণধার– ‘তুমি এখন যাও বাবু, আমাকে এখন ড্রেস করতে হবে। কাজের সময় হয়ে এল।’
