দমকা হাওয়া একখানা পুরনো খবরের কাগজের পাতা উড়িয়ে নিয়ে এল। আর বলদেব ব্যস্ত হয়ে ওটা ধরে ফেলল। হয়তো-বা কাগজখানা চাদরের কাজ দিতেও পারে নিছক এই খেয়ালে। কোনো এক উপন্যাসে সে যেন পড়েছিল। পড়েছিল শীতবহুল দেশে যেসব গরিবদের গরম জামাকাপড় থাকে না, তারা জামার নিচে বুকের উপর খবরের কাগজ লাগিয়ে নেয়। আজকে হয়তো-বা সেও তাই করবে। কিন্তু যখনি খবরের কাগজখানা হাতে এসে পৌঁছল, সে আশ্চর্য হয়ে দেখল প্রতিটি কলামের কিছু না কিছু অংশ কাটা। অতি সাবধানে যেন ধারালো কাঁচি অথবা ব্লেড দিয়ে বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ খবর এবং বিজ্ঞাপনগুলো কেটে রেখে দিয়েছে। এখন তো এই দুটি পাতায় ডজনেরও বেশি জানালা হাঁ করে আছে। বলদেব ভাবল, এই কাগজের চালুনি তীক্ষ্ণধার ঠাণ্ডা বাতাস কীভাবে রোধ করবে! পত্রিকাটা খুলেই দেখল ওটা দু-তারিখের। প্রথম পৃষ্ঠায় তার চোখে পড়ল– ‘স্থানীয় আবহাওয়া’। কাঁচিচালকের সন্ধানী দৃষ্টি থেকে এ অংশটুকু কীভাবে যে রক্ষা পেয়ে গেছে কে জানে। লাল অংশটুকুর নিচে লেখা,– ‘দিল্লি ৬ জানুয়ারি, মহকুমা আবহাওয়ার সরকারি খবরে প্রকাশ, আগামী দুইদিন পরই দিল্লি এবং তার আশপাশ অঞ্চলে কঠিন ‘কোল্ড ওয়েভ’ অর্থাৎ কনকনে ঠাণ্ডা পড়িবে। কারণ শিমলার পাহাড়গুলোতে বরফ তৈয়ার করা হইতেছে। এই বছর দিল্লিতেও অন্যান্য বৎসরের তুলনায় অধিক ঠাণ্ডা পড়িবে বলিয়া অনুমান করা যাইতেছে। এই জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোনিয়ারও আশঙ্কা করা যাইতেছে।’
এরপরের অংশটুকু পড়ার প্রয়োজন নেই বলদেবের। এ বছর দিল্লির ঠাণ্ডার ওপর সে এর চেয়েও অধিক বিশ্লেষণ করে মর্মস্পর্শী ভাষায় রিপোর্ট লিখতে পারে।
প্রতিদিন টেম্পারাচার নিচের দিকেই নামতে থাকে। রাতে তো এমন বরফ পড়তে শুরু করে যে, সকালে উঠে দেখে কুয়া আর পুকুরের পানির উপর পাতলা বরফ জমে আছে। কিন্তু তার চেয়েও মারাত্মক হচ্ছে হাওয়া– যেগুলো শিমলা থেকে আসছিল। বলদেব ভাবল– আমি জানতাম না হাওয়াও যে বরফের মতো ঠাণ্ডা আর ব্লেডের মতো তীক্ষ্ণধার। আর এত চালাক যে, বারান্দার কোণে, দেয়ালের আড়ালে অথবা সিঁড়ির নিচে লুকোলেও সে ঠিক ধরে ফেলবে এবং বুকের উন্মুক্ত অংশ, কলার এবং আস্তিন দিয়ে প্রবেশ করে চামড়া মাংস ধরে একেবারে হাড়ে গিয়ে পৌঁছে যাবে।– কথাটা বারকয়েক ভাবল বলদেব। ভাবল, এ বছরের শীতকে নিয়ে অর্থাৎ ‘কোল্ড ওয়েভ’কে নিয়ে গোটা কয়েক কবিতা লিখে ফেললে কেমন হয়। বেশ সুন্দর করে– যাতে প্রয়োজনের সময় (অর্থাৎ মৃত্যুর পর) কাজে লাগে। কিন্তু এই কনকনে শীতে রক্ত, মন-মেজাজ উভয় জমে যায়, চিন্তা আর অনুভূতির সূত্র বরফ হয়ে যায় এবং মানুষের ধ্যান-ধারণা চিন্তার পরিবর্তে জড়িয়ে যায়।
সে ভাবল, এভাবেই যদি ঠাণ্ডা পড়তে থাকে তাহলে আমার শিরার সমস্ত রক্ত জমে যাবে। মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। আমার স্মরণশক্তি, অনুভূতি, অন্তর্দৃষ্টি সবকিছুই ঠাণ্ডার কবলে বেকার হয়ে পড়বে। অথচ আমার কিছু করা প্রয়োজন। কিছু বলা প্রয়োজন। এবং যদি না-ও পারি তাহলেও এই অন্ধ ফকিরটির মতো বিড়বিড় করা প্রয়োজন– ‘বড় কনকনে ঠাণ্ডা বাবা, একখানা কম্বলের প্রশ্ন, ভগবান তোমার মঙ্গল করবে।’
কিন্তু না, সে ফকির নয়। একজন কবি, একজন অনুভূতিশীল, বিচক্ষণ, শিক্ষিত যুবক। সে কোনো অন্ধ ফকির নয় যে, প্রকম্পিত স্বরে বিড়বিড় করবে। কিন্তু কে জানে হয়তো-বা আমার স্বরও ঠাণ্ডায় জড়িয়ে গেছে, হয়তো-বা আমার মুখ থেকেও কাঁপা কাঁপা স্বর বেরুবে। কিছু একটা বলে যে পরীক্ষা করা দরকার!– সুতরাং সে বলল, ‘সুরদাসজি, কার কাছে মিনতি করছ। এখানে তো সমস্ত কিছুই এখন ঘুমে অচেতন।’– এবং সে অনুভব করল, ঠাণ্ডার তীব্রতায় তার দাঁত কটাকট করে শব্দ তুলেছে। আর ফকিরের গলার আওয়াজের মতো তার আওয়াজও কম জড়িয়ে যায়নি। সে বেচারা ছিল অন্ধ। অতএব সে দেখতে পায়নি, প্রশ্নকর্তার পরনে ফ্লালিনের পাতলুন, গায়ে রেশমীর জামা এবং প্রশ্নকর্তা একজন শিক্ষিত বিচক্ষণ যুবক। অথচ ফকিরটি ভাবল, এ-ও ফকির। ‘কোনো চক্ষুষ্মান ফকির, আমার আড়ালে বসে আছে। অতএব এখানে আর আমার কিছু পাবার আশা নেই। এদিক থেকে যেই আসবে সব পয়সা সেই নিয়ে নেবে আগে।’ অতএব নিজের লাঠি এবং নিচে পাতানো কাপড়টা তুলে নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। এবং ক্যানাট প্যালেসের কামানের মতো বারান্দায় অনেকক্ষণ পর্যন্ত লাঠির আওয়াজ খট্ খট্ শব্দ তুলে মিলিয়ে গেল, বরং বলা যায় রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে বিলীন হয়ে গেল।
ঠাণ্ডার সাথে সাথে বলদেবকে নিঃসঙ্গতাও আক্রমণ করল। সে ভাবল– নিঃসঙ্গতাও একরকমের ঠাণ্ডা। অথবা ঠাণ্ডাও একরকমের নিঃসঙ্গতা। যেখানে কোনো সঙ্গী থাকে না, আত্মীয়স্বজন, প্রিয়তমা থাকে না এবং থাকে না বাজারের জনকোলাহল– সেখানে নিঃসঙ্গতাও নিজের মধ্যে একরকমের হিমশীতলতা এনে দেয়।–শোনা যায়, একটা নরক হবে– সেখানে পাপীদের আগুনে পোড়ানো হবে না। বরফের শেলের উপর শুইয়ে দেবে। এবং আরেকটা নরক এর চেয়েও ভয়ানক। সে নরকে পাপীদের একটি বদ্ধকক্ষে নিঃসঙ্গ অবস্থায় বছরের পর বছর আবদ্ধ করে রাখবে। আর বলদেব ভাবল, আমি এমন এক নরকে এখন আছি– যেটা ঠাণ্ডাও এবং নিঃসঙ্গও। এবং অনুভূতির প্রবল চাপে নিঃসঙ্গতার কঠিন অনুভব বরফমাখা বিজলির মতো তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল।
