ফিকা আরেকবার আমাকে চমকিয়ে দিল। জানি না, পলোয়ান ফিকার ভেতরে এই অনুভূতিশীল ফিকাটা এত বছর কোথায় লুকিয়ে ছিল।
আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, কাল নিশ্চয়ই যাব। এখন তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
পরদিন অতি প্রত্যূষেই আমার হঠাৎ শিখুপুর যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। রাতে প্রত্যাবর্তন করে জানতে পারলাম, ফিকা এসেছিল।
এরপর তিনদিন পর্যন্ত দীর্ঘসময় আমি ঘরেই কাটালাম। কিন্তু ফিকা আসেনি। চতুর্থ দিন আমি গলির মোড়ে এক কোচওয়ানকে জিগ্যেস করে জানতে পারলাম তার বাবা ওয়ার্ডে জায়গা পেয়েছে। এ-সময় ফিকাও আমার সামনে এসে উপস্থিত হল। তাকে দেখেই আমার লজ্জা লাগল। অতএব একটু মিথ্যা বলতে হল ‘কেমন ফিকা, জব্বার সাহেব কাজ করে দিয়েছেন না?’
সে বলল,–‘কিন্তু বাবুজি, তিনি তো আমার সাথে দেখাও করেননি।
আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, ‘আমি তাঁকে ফোন করেছিলাম।’
ফিকার চেহারায় রক্তিমাভা দেখা দিল। এবং তার চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল– ‘তাই তো আমি বলি, নার্স কেন বারবার শুধু বলেছিল দেখ বুড়োর যেন কোনো কষ্ট না হয়।’
পরে আমি ওখান থেকে চলে এলাম। যদিও আমার পা আস্তে আস্তে চলছিল কিন্তু চিন্তাশক্তি যেন হেরে গিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল।
রাতের প্রশস্ত নিদ্রা আমার লজ্জাভাবের কিছুটা লাঘব করেছে। কিন্তু সকালেই দেখি ফিকা আমার দ্বারে উপস্থিত। বলল– ‘আপনার অনুগ্রহে প্রবেশপত্র পেয়েছিলাম। তা তারা বাবাকে এখন কোটি লাখপতিদের হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এ তো বড় সর্বনাশ হয়ে গেল বাবুজি। আজ আমি মাকে সাথে নিয়ে গেছিলাম দুটা টাকাই মাটি হল। কিছু হয় যদি তো করে দিন।’
আমি বললাম– ‘আমি এক্ষুনি গিয়ে ডাক্তার জব্বারকে ফোন করছি।’
ফোন আমি করেছিলাম। কিন্তু ডাক্তার সাহেবের দেখা পাইনি। পরে কর্মব্যস্ততার ভেতর ডুবে গেলাম আমি। পাঁচ ছ-দিন পর ফিকাকে দেখলাম! ভাবলাম তার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে অন্য গলিতে ঢুকে যাব এবং সেখান থেকে পালিয়ে বেরিয়ে যাব।
কিন্তু ফিকা হঠাৎ দৌড়ে আমার সামনে উপস্থিত হল। বলল– ‘বাবুজি, আপনার এতসব উপকারের প্রতিদান কী করে দেব বুঝতে পারছি না।’
মিথ্যা আমার লজ্জাভাবকে কান ধরে একদিকে সরিয়ে দিল,– ‘তোমার বাবা ফিরে এসেছে না?’
ফিফা বলল,– ‘ফিরেও এসেছে। এবং অপারেশনও হয়ে গেছে। শুক্রবারে পট্টি খুলবে। দোয়া করবেন।’
আমি বললাম– ‘খোদা রহম করবেন।’
পরে সে শুক্রবার সন্ধ্যায় এল। আমি জিগ্যেস করতেই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ‘বাবুজি সর্বনাশ হয়ে গেছে। পট্টি খুলে জানা গেল এক চোখ তো আগেই চলে গেছে– এখন বাকিটার ওপরও তার প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তারা বলল, এখন প্ৰথম অপারেশনের ক্ষত শুকিয়ে গেলে দ্বিতীয়টার অপারেশন করা হবে।’
আমি তাকে সান্ত্বনা দিলাম। এবং সাথে করেই সামনে একটা দোকান থেকে ফোন করলাম ডাক্তার জব্বারকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে ফোনের কাছে উপস্থিত ছিল না। আমি তাকে কথা দিলাম যে, কাল গিয়ে ডাক্তার জব্বারের সাথে দেখা করব। তাকে হাসপাতালে না পেলে তার বাসায় গিয়ে ধরব।
পরদিন আমি ডাক্তার জব্বারের কাছে যেতে না পারলেও ফোন করেছিলাম। কিন্তু সেদিনও ফোনে পাইনি।
সম্ভবত সপ্তাহ দু-আড়াই পরে দরজায় কড়া নড়ে উঠল, চাকর এসে বলল– ‘ফিকা কোচওয়ান এসেছে।’ আমিও তাকে জানালাপথ দিয়ে দেখেছিলাম। একেবারে সাদা দেখাচ্ছিল তখন তাকে।
আমি চাকরকে জিগ্যেস করলাম ‘তুমি কি তাকে আমি আছি বলেছ?’
‘জ্বি হাঁ’–চাকর বলল– ‘হঠাৎ আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।’
‘বড় বোকা তো তুই’–আমি তাকে ধমক দিয়ে বললাম– ‘যা বলগে কাপড় বদলে আসছেন। ‘
কাপড় তো আমি আগেই বদলে রেখেছিলাম– তবে এখন আমার ভ্রুকুঞ্চন বদলাবার চেষ্টা করতে লাগলাম। পরে ভাবলাম, কী মিথ্যাবাদী আমি! দুপয়সা বা দুটো টাকা অথবা দুলাখেরও ব্যাপার নয়, শুধু দুটি চোখের ব্যাপার। আর আমি মিথ্যা বলতে যাচ্ছি। আমাকে ফিকার সামনে স্বীকার করে নিতে হবে যে, আমি তোমার জন্য সত্যি কিছু করতে পারিনি। পরে তার সামনে এসব কথা বুঝে শুনে এমনভাবে বলব যাতে সত্য কথাটা প্রকাশ পায় এবং সে-ও দুঃখ না পায়।
আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সে ঝরঝরিয়ে কাঁদতে শুরু করল এবং বলল– ‘বাবুজি, কিছুই বুঝে আসছে না যে– কিছুই বুঝে-আসছে না।’ তার গলা বুজে এল। এবং ঝুঁকে পড়ে আমার পা-জোড়া জড়িয়ে ধরল।
আমার মুখস্থ করা বাক্য এক মুহূর্তে গুলিয়ে গেল। কোনোরকম আমি বললাম- ‘ফিকা– কথা হল– ফিকা কথা হল কি
ছোট ছেলের মতো অশ্রুসিক্ত লাল চেহারা নিয়ে সে উঠল। এবং বলল– ‘বাবুজি কিছুই বুঝে আসছে না, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষাই খুঁজে পাচ্ছি না। আমার বাবা ভালো হয়ে গেছেন। তার দুটো চোখের জ্যোতিই খোদা ফিরিয়ে দিয়েছেন আপনার সহায়তায়। আপনি আমাকে খরিদ করে ফেলেছেন। বাবুজি খোদার কসম আমি সারাজীবন আপনার চাকর হয়ে থাকব।’
এবং আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম– ‘ও কিচ্ছু না ফিকা, ও কিছু না।’
অনুবাদ : আখতার-উন-নবী
কোল্ড ওয়েভ – খাজা আহমদ আব্বাস
বলদেব যেখানটায় বসেছিল তার সামান্য দূরেই ফকিরটি বসে বসে বড় করুণ আর প্রকম্পিত স্বরে বিড়বিড় করতে লাগল– ‘বড় কনকনে ঠাণ্ডা বাবা, গরিবকে একখানা কম্বল দিয়ে যাও; ভগবান তোমার মঙ্গল করবে বাবা।’ এবং যেহেতু ফকিরটি অন্ধ, অতএব সে জানে না রাত তখন গম্ভীর হয়ে গেছে। সমস্ত ক্যানাট প্যালেস নীরব, নিস্তব্ধ, কোথাও একটি পথিকের টিকিটিও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।– ফকিরটি যে শব্দ শুনে কাতর মিনতি জানিয়েছিল ওটা কোনো মানুষের পদশব্দ নয়। হাওয়ায় দোল-খাওয়া ছেঁড়া কাগজ এবং শুকনো পাতার শব্দ।
