এ-সময় ফিকাকে আমার কাছে মনে হল যেন তার চওড়া বুক কুঁচকে গেছে।
আমি বললাম– ‘তুমিও বড় বাড়াবাড়ি করছ। তারপর কী হল বলে যাও না।’
ফিকার চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতার ছায়া প্রকাশিত হল এবং সে বলল– ‘বাস– বাবুজি, খোদা আপনার ভালো করুন। রাত তো যাহোক বাবা কান্নাকাটি করে শেষ করলেন।
পরে সকালে সব কোচওয়ান এসে জড় হল। তাদের মধ্যে থেকে চাচা শায়দে বলল ‘তুলোর কোষ পিষে দিয়ে চোখ পরিষ্কার কর।’ তার কথামতো চোখ পরিষ্কার করলাম কিন্তু বাবা সেই আগের মতো কাতরাতে থাকলেন। আবার একজন বলল, ‘পালক পিষে চোখে বেঁধে দাও।’ তাই বাঁধলাম। পরে চোখ খুললে বাবা বললেন– ‘এত চেষ্টা আর কেন করছ, চোখের জ্যোতি তো চলে গেছে।’
‘তাকে দুটো হাসপাতালে নিয়ে গেলাম কিন্তু একটাতেও জায়গা পেলাম না। দুপুরে, রাজগড়ের এক কোচওয়ান বলল তার শালা নাকি মেও হাসপাতালের চৌকিদার। তার অনুরোধে জায়গা যাহোক একটা পাওয়া গেছে। তবে বারান্দাতে। হোক, তবুও কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু বাবু, সন্ধ্যা হতে চলল অথচ ডাক্তার দূরে থাকুক কোনো নার্সও এ দিকে আসেনি। আপনি তো সাহেব মানুষ, এ দেখুন, দুহাত জোড় করে অনুনয় করছি আমার সাথে চলুন। নিষ্পাপ রুগীটাকে একটু দেখে আসবেন।’
আমি বললাম, ‘ওখানে একজন ডাক্তার আছেন, ডাক্তার আবদুল জব্বার। তাঁকে আমার সালাম বলগে। যাও, কাজ হয়ে যাবে। আর যদি না হয় তাহলে কাল আমি তোমার সাথে যাব। এখন আমাকে একটা দাওয়াতে যেতে হবে। নাম মনে রেখ, ডাক্তার আবদুল জব্বার।’
ফিকা আমার প্রতি অজস্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায় নিল। পরে একটা খালি টাঙ্গা পেয়ে গেলাম। টাঙ্গা মেও হাসপাতাল অতিক্রম করাকালে দেখলাম, ফিকা হাসপাতালের এক চৌকিদারের সাথে কথা বলছে। বোধহয় সে ডাক্তার জব্বারের ঠিকানা জিগ্যেস করে নিচ্ছে।
একবার ভাবলাম, হাসপাতালে গিয়ে জব্বার সাহেবকে বলি কিন্তু তখন টাঙ্গা অনেকদূর চলে এসেছে। তাছাড়া আমার এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।
কিছুদূর গিয়ে ঘোড়া হঠাৎ পা ফসকে পড়ে গেল। প্রায় দশ মিনিটকাল পড়ে থাকল ঘোড়া। পরে উঠে যখন আবার চলতে শুরু করল তখনি দেখলাম, হঠাৎ জব্বার সাহেবের
স্কুটার আমার টাঙ্গার পাশ কেটে চলে গেল।–‘জব্বার সাহেব’–আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। কিন্তু জব্বার সাহেব আমার চিৎকারের চাইতেও দ্রুত চলে গেলেন।
কোনো চিন্তা নেই, আমি ভাবলাম কাল গিয়ে বলে দেব। কাল প্রথম কাজই করব এটা।
রাতে বাসায় প্রত্যাবর্তন করে শুনলাম, ফিকা কোচওয়ান এসেছিল এবং বলে গেছে, ‘বাবু আসলেই যেন আমাকে খবরটা দেয়।’
আমি ভাবলাম, এ-সময় তাকে আবার কে ডাকে। যদি জব্বার সাহেব হাসপাতালে গিয়ে থাকেন এবং যদি ফিকার কাজ হয়ে থাকে, তাহলে তার কৃতজ্ঞতা সকালেই না হয় কবুল করে নেব। আর যদি কাজ না হয় তাহলে যখনি যে চেষ্টা চালানো দরকার সকালেই চালাব।
সকালে আমি তখনো বিছানা ছাড়িনি– হঠাৎ ফিকা এসে দরজায় নক্ করল।
ফিকা জানাল– ‘রাতে জব্বার সাহেবের ডিউটি ছিল না। আজ দিনেই তাঁর ডিউটি।’
‘অর্থাৎ, তোমার বাবা ডিসেম্বরের এই কনকনে শীতের মধ্যে বারান্দাতেই পড়ে আছে?’ আমার কণ্ঠে দুশ্চিন্তা প্রকাশ পেল।
‘জি হাঁ’– সে বলল– ‘কিন্তু এ আর এমন কী বাবুজি। আপনি তো আমাদের ঘর দেখেননি। দশ বছর থেকে স্যাঁতসেঁতে কুঁড়েঘরে পড়ে আছি।’
‘আর তাঁর চোখ?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
‘সে তো চলে গেছে বাবু!’ ফিকা এমনভাবে বলল– যেন বছরখানেক হল তার বাবার চোখ চলে গেছে।
আমি বললাম– ‘চোখ যখন চলেই গেছে তখন কেন খামাখা বেচারা বুড়োকে হাসপাতালে টানাটানি করছ। সময় নষ্ট হবে, টাকা পয়সাও নষ্ট হবে।’
ফিকা বলল– ‘বাবুজি, কে জানে যদি চোখের কোনো অংশে ক্ষীণ একটুখানি দৃষ্টিশক্তি থেকে থাকে। দেখুন বাবুজি উনুন নিবে যায়। কিন্তু অনেকক্ষণ পরেও যদি ছাইয়ে হাত দেয়া না হয় তবে বুঝা যায় না কোনো জ্বলন্ত অঙ্গার অবশিষ্ট আছে কিনা।’
আমি এ কথায় চমকে উঠলাম। এতদিন পর্যন্ত ফিকা আমার সাথে শুধু চালের উচ্চমূল্য এবং আটার ভেতর ভেজাল মিশ্রণ সম্বন্ধেই কথাবার্তা বলত– পরে সে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল– ‘বাবুজি একটু চলুন না আমার সাথে।
শরীর থেকে তখনো আমার ঘুমের রেশ পুরোপুরি কাটেনি। আরো একটু ঘুমানো দরকার। তার ওপরও শেভ করা, চা-নাস্তা করা– সুতরাং আমি বললাম– ‘আমি তোমাকে নিজের কার্ড দিচ্ছি। তা ডাক্তার জব্বারকে দেখিও। বড় বন্ধুমানুষ, তাড়াতাড়ি কাজ করে দেবে। তোমার বাবা একেবারে ওয়ার্ডে চলে যাবে আর ওষুধ-পত্রের জন্যে তো আমি গিয়েই বলব।’
সে আমার কাছ থেকে কার্ড নিয়ে এমনভাবে চলল যেন পৃথিবীর তাবৎ ধনদৌলত একত্রিত করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি কার্ডে লিখে দিয়েছি, ‘জব্বার সাহেব! এর কাজটা করে দেবেন, বেচারা বড় গরিব, দোয়া করবে।’ আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস কাজটা হয়ে যাবে। ডাক্তারদের শুধু এতটাই দেখা– চোখ একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে– না কিছু ঔজ্জ্বল্য বাকি আছে।
আমি সারাটা দিন বাইরে বাইরে ছিলাম আর ফিকা সারাদিন আমার বাড়ির চারদিকে চক্কর দিয়ে ফিরছিল। সন্ধ্যায় সে আমাকে বলল, ‘জব্বার সাহেব চেম্বারে বসেছিলেন, তবে ভেতরে ঢুকতে দিলেন না। বলেন, পালাক্রমে এস। অনেকক্ষণ বসেছিলাম, কিন্তু আমার পালা আসেই না। তাই হাঁটু গেড়ে বসে লুকিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম পালা কীভাবে আসে বাবু।’
