‘দীনু ভাই!’ খানবাহাদুর চোখটির দিকে আর চাইতে না পেরে বললেন, ‘দীনু ভাই, তোমাকে কতবার বললাম, ছবির পর্দাটা পাল্টে দাও। জানো না, এটা বাদশার ছবি!
খানবাহাদুরের কথা শুনে দীনু খুব তাজ্জব বনে গেল। পর্দা বদলাবার কথা তাকে এই প্রথম বলা হল। তার এত অবাক হওয়ার কারণ, ওই যে ছবিটার পর্দা ইঁদুরে কেটে ফেলেছে, ওটাকে বাদশার ছবি বলা হচ্ছে। কিন্তু এমন বাদশা দীনুর চোখে কখনো পড়েনি, যাঁর মুখে দাড়ি এবং হাতে তসবিহ নেই! এক শা-সাহেবের কাছে আবার শুধু দীনুই নয়, তার বাড়ির সবাই মুরিদ হয়েছে কিনা।
দীনু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ কথাই ভাবছিল। খানবাহাদুর আবার বলে উঠলেন, ‘শুনেছ, লতিফ ছাড়া পেয়ে এখানে এসেছে?’
‘জি হ্যাঁ, বড় ভালো লোক।’
হ্যাঁ, আমারো তাই মনে হয়। আমার ইচ্ছে আছে– ওদের ছাড়া পাওয়ার খুশিতে গ্রামবাসীদের একটা বড়রকমের দাওয়াত দেব!’
দীনু আর কথা বলতে পারল না। তার চোখে আজ খানবাহাদুর একজন উঁচু দরের মহৎ ব্যক্তি বলে প্রতিভাত হতে লাগলেন।
.
ভোজের আয়োজন শুরু হল। এ উপলক্ষে কিছু নতুন মানুষ এল গাঁয়ে। খানবাহাদুর এদের নিজের বাড়িতে থাকার জায়গা দিলেন। কথাবার্তা শুনে চাকর-বাকররা জানতে পারল– নতুন মানুষগুলো গোয়েন্দা বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট।
খানবাহাদুরের চাকররা এ তথ্য লুকিয়ে রাখতে পারল না। গাঁয়ের অধিকাংশ লোকই জেনে ফেলল, খানবাহাদুরের কাছে গোয়েন্দা পুলিশের কিছু লোক এসেছে।
‘আরে ভাই, বড় লোকের কারবার। আল্লা দিয়েছেনও অনেক আর জান বাঁচানোর জন্যে সবকিছু তো ওঁকে করতেই হবে!’ কেউ কেউ ভাবল– গোয়েন্দা পুলিশের লোক খানবাহাদুরের জীবন এবং সম্পত্তি রক্ষার জন্যেই এসে থাকবে।
লতিফ, শব্বির আর বিশিষ্ট গ্রামবাসীদের বসবার জন্যে খানবাহাদুর তাঁর খাস কামরায় বন্দোবস্ত করলেন। সায়েবদের সাদা মূর্তিগুলোর উপর কালো পর্দা দেখে লতিফ হেসে উঠল।
‘ঠিক করেছেন, চাচা– শালাদের মুখে কালি লেপে দিয়ে ঠিক করেছেন। আবর্জনাগুলো এখন বাইরে ফেলে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো!’
লতিফের কথা শুনে খানবাহাদুরের চোখ সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের ছবির দিকে উঠে গেল। দীনু ওটার পর্দা বদলায়নি। ছবির একটা চোখ তখনো ছিদ্র দিয়ে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। খানবাহাদুরের সাথে লতিফও ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তাকিয়ে সে হেসে ফেলল।
‘বারে, বাহ্! ইংরেজ চলে গেছে ঠিকই। কিন্তু ওদের একটা চোখ এখনো আমাদের দিকে তাকিয়ে!’
কয়েক কলসি ঘাম যেন খানবাহাদুরকে নাইয়ে দিল।
‘না, না, তা নয়। ইঁদুরে পর্দাটা কেটে দিয়েছে।’
‘ইঁদুর!’ লতিফ বাঁকা হাসি হাসতে হাসতে চুপ হয়ে গেল।
নেমন্তন্ন শেষ হল। এ সময়ের মধ্যে খানবাহাদুর, লতিফ আর শব্বির কোনো কথাই বলেনি। নেমন্তন্ন থেকে ফেরার সময় লতিফ খানবাহাদুরকে জানাল, কাল সকালে সে শহরে যাচ্ছে। শব্বিরও থাকবে সাথে।
কেন জানে, কেন, খানবাহাদুরের মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু তাঁর এ অবস্থা তিনি গোপন করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন।
পরদিন সকালে লতিফ আর শব্বিরকে যারা বিদায় দিল, খানবাহাদুরও তাদের দলে রইলেন।
কিন্তু সেদিন সন্ধ্যাবেলা গাঁয়ে খবর এল– শহরে যাবার পথে লতিফ আর শব্বির গ্রেফতার হয়েছে। খানবাহাদুর তখন গ্রামবাসীদের বোঝাতে লাগলেন, ‘কতবার আমি ওদের বলেছি– এ দেশ আমাদেরই, আমাদেরই এ সরকার। কিন্তু ওরা শুনল কই– নিজেদের ছেলেপিলের ভাবনা পর্যন্ত ওদের নেই!’
‘কিন্তু, চৌধুরী সাহেব!’ গাঁয়ের প্রবীণ গণমান্য পাঁচজনে বললেন (ওঁরা খানবাহাদুরকে বরাবর চৌধুরী বলেন), ‘ওরা দেশের বা সরকারের বিরোধী তো নয়, অবশ্যি ইংরেজদের বিরোধী নিশ্চয়ই।’
‘তোমরা জানো না ভাই এই ছোকরাদের। যাকগে, ওসব কথা বাদ দাও। আমি ওদের ছাড়াবার চেষ্টা করছি। যতদিন ছাড়া না পায়, আমার কাছ থেকে ওদের ছেলেপিলেরা মাসে মাসে পঞ্চাশটা করে টাকা পাবেই। ‘
অনুবাদ : বাশীর আলহেলাল
অনুরোধ – আহমদ নদিম কাসমি
পাড়ার বড় গলির মোড়টায় সবসময় তিন-চারটা টাঙ্গা দাঁড়ানো থাকে। কিন্তু আমি সেদিন মোড়ের কাছে এসে দেখলাম একটা টাঙ্গাও নেই। আমাকে যেতে হবে অনেক দূর আর আমাকে খুব তাড়াতাড়িই পৌঁছুতে হবে। তাই বসে বসে টাঙ্গার প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে থাকলাম। অনেক টাঙ্গা এ পথে যাওয়া-আসা করছে কিন্তু সবগুলোই যাত্রী বোঝাই। এ সময় হঠাৎ ফিকে কোচওয়ানকে আমার দিকে আসতে দেখে বললাম, ‘ভাই ফিকে, টাঙ্গা কোথায়? টাঙ্গা নিয়ে এস না।’
‘বাবু টাঙ্গা তো আজ জুড়িনি।’ ফিকে জবাব দিল।
দেখলাম যে ফিকা কোচওয়ান বেশ শক্ত সামর্থ্য তাগড়া জোয়ান ছিল– আজ তাকে কেমন নিরীহ নিরীহ মনে হচ্ছে, যেন এ লাইনে সে এই প্রথম এসেছে। সে আজ শেভ করেনি। তার চোখজোড়ায়ও আজ সুরমা পড়েনি এবং পালকহীন পক্ষিশাবকের মতো রক্তিম হয়ে আছে।
‘কী ব্যাপার ফিকা!’ আমি জিগ্যেস করলাম।
সে বলল, –‘বাবু একটা কাজ আছে।’
‘হাঁ হাঁ, বল।’ আমি বললাম।
‘কাজ হল বাবু, আপনি আমার বাবাকে তো চেনেন?’ ফিকে বলল, ‘তার একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।’
‘উহ্’–আমি বড় ব্যথিত হলাম, ‘কী করে নষ্ট হল– কোনো দুর্ঘটনা?’
‘জী না– ‘ ফিকের চেহারায় একটা উদাস নির্লিপ্ততা ফুটে উঠল।
‘লাল তো সবসময়েই থাকে এবং চোখ ফেটে পানিও সবসময়ে গড়িয়ে পড়ে। আপনি তো জানেন। বাবার সাথে কয়েকবার তো আপনি টাঙ্গায়ও বসেছিলেন। তো বাবু কাল হল কী, বাবা মিছরি শহরের পথ দিয়ে আসছিলেন, সেখানে প্রতিদিন যে হাকিমটি সান্ডার তেল বিক্রি করত, সে আজ সুরমা বিক্রি করছিল। বাবা সে সুরমা নিয়ে এলেন। এবং আমাকে বললেন– ‘এতে চোখের লালিমা দূর হবে। হাকিম খোদা এবং রসুলের কসম খেয়ে বলেছে, এবং এ-ও বলেছে যে, যদি লালিমা দূর না হয় তাহলে কেয়ামতের দিন তুমি আমার ঘাড় ধর।’ তা আমিও বললাম, ‘হাকিম যখন খোদা এবং রসুলের কসম খেয়ে বলেছে আপনিও একটু লাগিয়ে দেখুন না।’ আম্মাও এই পরামর্শ দিলেন। তিনি ‘লোকমান হাকিম হেকমতের রাজা’ বলেই চোখে সুরমার শলা ঘুরিয়ে দিলেন। বাস আর যায় কোথা– বাবু কসম খেয়ে বলছি সেই যে চোখ বন্ধ হয়েছে– এবং যে কষ্ট, যেন তার নয় আমার–। বাবুজি, আপনার অসুবিধা হচ্ছে না তো? সিগ্রেটওয়ালার চেয়ারটা আনব নাকি?’
