কোনো সমিতিকে চাঁদা পাঠাতে গিয়ে তিনি বন্ধুদের বিনীত কণ্ঠে বলতেন, ‘কী বল হে– এই সমিতির জন্যে আর্থিক সাহায্যটা কেমন হওয়া উচিত? আমার মনে হয় সমিতি গঠনমূলক কাজই করে যাচ্ছে। গরিব লোক এত ছুটোছুটি করছে, যদি ওদের আর্থিক সাহায্যটুকুর দিকেও খেয়াল না রাখি, তাহলে সমিতির কর্মীদের মন থেকে সেবার অনুপ্রেরণা জুড়িয়ে যাবে যে। তাছাড়া ভাই, এ দুনিয়ায় কে কার! আল্লা যা দিয়েছেন তা সৎ কাজে ব্যয় করাই দরকার।’
খানবাহাদুরের বিগত জীবনের কথা যতদূর জানা যায় এবং গ্রামবাসীরা যতটুকু জানে, তা হচ্ছে, খানবাহাদুরের জন্মের পরই তাঁর বাবা আত্মহত্যা করেছিলেন। কারণ, তিনি নিজে একেবারে লাল টুকটুকে এবং ফর্সা ছিলেন, আর খানবাহাদুর নুরুল হুদার মতো কালো কিটকিটে শিশু ভূমিষ্ঠ হতে দেখে তাঁর সন্দেহ হয়েছিল যে, এ শিশু তাঁর নয়– অন্য কারো
পিতৃহীন শিশু-খানবাহাদুরের লালন-পালন তাঁর চাচার তত্ত্বাবধানে হতে লাগল। খানবাহাদুরের বয়েস যখন মাত্র দু-বছর, তখন তাঁর মা এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে অবিনশ্বর জগতে যাত্রা করলেন। মা কোনো-এক সময়ে তাঁর বাবা চৌধুরী বদরুদ্দোজার ঘরে দাসীর মতন এসেছিলেন এবং এই ধরনের একটা ধারণাই চৌধুরীর মনের মধ্যে ছেয়ে গিয়েছিল যে, তাঁর স্বামী বাড়ির সক্কলের বিরোধিতা সত্ত্বেও একজন দাসীকে বিয়ে করেছেন।
গাঁয়ে খানবাহাদুরের চাচার অনেক সম্পত্তি ছিল। তাঁকে নিয়ে চাচা গাঁয়ে এলেন। খানবাহাদুর তখন মাত্র আড়াই বছরের। তাঁর যখন জ্ঞানগম্যি হয়েছে, তখন এ সংসারে একমাত্র আপনার যে লোকটি চোখে পড়ল, তিনি হচ্ছেন তাঁর চাচা। চাচার মৃত্যুর পর সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলেন খানবাহাদুর; এবং খানবাহাদুরের বাপ-চাচার সমস্ত ধন-দৌলত জমেছিল ইংরেজের দান ঠিকাদারির কৃপায়। এই জন্যে স্বাভাবিকভাবেই সায়েবদের সাথে তাঁর একটা সম্পর্ক জমে উঠছিল। এই সম্পর্ক বাড়তে বাড়তে প্ৰশংসা, তারপর পুজোর আকার ধারণ করেছে।
খানবাহাদুরের জীবনে চল্লিশটি বসন্ত পার হয়ে গেছে। কিন্তু বন্ধুবান্ধবেরা অনেক বোঝানো সত্ত্বেও তিনি বিয়ে করেননি। ঘরে ছিল দুজন চাকর। এদের মধ্যে দীনু তাঁর প্রাচীন প্রসাদভোগী। তাঁর বাবার আমল থেকে সে এখানে আছে।
একমাত্র দীনুই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, খানবাহাদুরের বাবা চৌধুরী বদরুদ্দোজা নিছক সন্দেহের ভিত্তিতে আত্মহত্যা করেছেন। নইলে মায়ের গর্ভ তো কুমোরের চাক। দীনু বলে, ‘খানবাহাদুরের মা তাজি বিবিকে আমি ছেলেবেলা থেকেই জানি। বড় ভালো মেয়ে ছিলেন!’ সে কসম খেয়ে বলে, ‘তিনি যদ্দিন বেঁচে ছিলেন, পরপুরুষ তো দূরের কথা, বাড়ির চাকরদের সামনে পর্যন্ত পর্দা করতেন।’
খানবাহাদুরের অতীত জীবন যেমনই হোক-না কেন, গ্রামবাসীদের তাতে কিছুই এসে যায় না। তারা শুধু এটুকুই জানে যে, চৌধুরী নুরুল হুদা যেদিন থেকে খানবাহাদুর হয়েছেন, সেদিন থেকে তাঁর মধ্যে বড় একটা পরিবর্তন এসেছে। তিনি তাঁর টাকার থলে খুলে দিয়েছেন।
দাঙ্গার নামে খানবাহাদুর গদগদ হয়ে ওঠেন। কারণ দাঙ্গা তাঁকে দু-যুগের মতো বিখ্যাত করে দিয়েছে এবং গাঁ তো বটেই, শহরেও কোনো সভা হলে, কোনো সমিতি প্রতিষ্ঠিত হলে, সভাপতিত্বের জন্যে খানবাহাদুরের কাছেই আবেদন আসে।
তারপর দাঙ্গার তামস ঝড়-ঝাপ্টা কেটে গেছে। দূর হয়েছে দাসত্বের অন্ধকারও। ইংরেজ চলে গেছে এবং বেরিয়ে এসেছে স্বাধীনতার প্রোজ্জ্বল সূর্য। ইংরেজদের চলে যাওয়ায় ঘরে ঘরে উৎসব উদ্যাপিত হচ্ছে।
কিন্তু খানবাহাদুর হয়ে পড়লেন উদাস। দীনুর মনে হল, যেদিন তাঁর চাচা মারা যান খানবাহাদুর সেদিনও তো এতখানি উদাস হননি!
স্বাধীনতার সাথে সাথে এ সংবাদও গাঁয়ে এল, যেসব লোক স্বাধীনতা-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে জেলে গিয়েছিল, স্বাধীনতা দিবসে তাদের মুক্তি দেওয়া হবে। লতিফ আর শব্বিরের বিস্মৃত মুখ আবার গ্রামবাসীদের স্মৃতিতে টাকা হয়ে উঠল।
পরদিন দুপুরে যখন বন্ধু-বান্ধব আর সঙ্গী-সাথিদের সাথে মিছিল করে লতিফ আর শব্বির গাঁয়ে এসে পৌঁছল, তখন নেহালচন্দের খামারে সেই শোভাযাত্রার সংবর্ধনাকারীদের মধ্যে খানবাহাদুর নুরুল হুদাও ছিলেন। তিনি নাটকীয়ভাবে এগিয়ে গিয়ে লতিফ আর শব্বিরকে বুকে চেপে ধরলেন।
‘কী চৌধুরী সাহেব, আপনার মূর্তিগুলোর খবর কী?’ হাসতে হাসতে লতিফ খানবাহাদুরকে জিগ্যেস করল।
খানবাহাদুর চুপ মেরে গেলেন। কিন্তু গাঁয়ের মৌমাছিরা লতিফকে জানিয়ে দিল, চৌধুরী খানবাহাদুর বনে গেছেন।
‘বটে! ব্রিটিশ তাহলে যাবার সময় ওঁকে কিছু দিয়ে গেছে! চৌধুরী সাহেবের রাজভক্তি ব্যর্থ হয়নি।
খানবাহাদুর সংবর্ধনা থেকে বাড়ি ফিরে দেখলেন, সদরের কয়েক ব্যক্তি তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছেন। জেলা-ম্যাজিস্ট্রেট খানবাহাদুরের কাছে স্বাধীনতার অভিনন্দন ও জরুরি সমাচার দিয়ে পাঠিয়েছেন। খানবাহাদুর তাঁদের বিদায় দিলেন। কিন্তু আজ তিনি ভারী উদাস। লতিফের কথা তাঁর মনের ওপর একটা বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে যেন।
‘চৌধুরী সাহেব, আপনার মূর্তিগুলোর খবর কী?’ লতিফের এ কথাটা খানবাহাদুরের মস্তিষ্কে হাতুড়ি ঠুকছে। অনিচ্ছুকভাবে তাঁর দৃষ্টি বার কয়েক ইংরেজ লর্ড আর মূর্তিগুলোর ওপর পড়েছে। ইদানীং এগুলোর ওপর তিনি কালো পর্দা চাপিয়েছেন। সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের বড় ছবিটার ওপরও তাঁর নজর পড়ল। ওটা ছিল তাঁর পালংকের সামনেই টাঙানো। পর্দাটা ইঁদুরে কেটে দিয়েছে। ইঁদুরে কাটা পর্দার ছিদ্র দিয়ে ছবির একটা চোখ উঁকি মারছে। খানবাহাদুরের মনে হল, যেন সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের চোখে একটা গভীর উদাস ঝাপসা ছায়া। ও চোখ যেন খানবাহাদুরের কাছে কিছু চাইছে।
