গাঁয়ের কিছু লোক পুলিশের আবির্ভাবে চুপসে গেল। কিন্তু কেউ কেউ সাহসে ভর করে নুরু চৌধুরীর বাড়ির দিকে মুখ বাড়িয়ে মাটিতে থুতু ফেলল জোরে জোরে।
সারা গাঁয়ে বেশ কিছুকাল নুরু চৌধুরী লতিফ আর শব্বিরই মূল আলোচনার বিষয় হয়ে রইল–
‘শালা সায়েবদের দালাল নূরু চৌধুরীর এসব কী ধরনের কাণ্ড বল তো?’
‘হ্যাঁ, ভাই, জানো না, ও কত সাদা ঠাকুর নিজের ঘরে জমা করে রেখেছে?’
‘কিন্তু ভাই, বেচারা লতিফ আর শব্বিরের কী হবে?’
‘যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরই না হয়ে বসে আবার! ইংরেজ ওদের ওপর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মানুষকে খ্যাপানোর অভিযোগ আনবে। তারপর পাঠিয়ে দেবে সারাজীবনের মতো।’
‘ওদের ছেলেপিলেরা তাহলে খাবে কী? ‘
‘বাচ্চাগুলোর অভিশাপ পড়বে নুরু চৌধুরীর ওপর।
‘কিন্তু ভাই, নুরু চৌধুরী ওদের সঙ্গে শত্রুতা করতে শুরু করল কেন?
‘কেন জানে! হয়তো লতিফ আর শব্বির নুরু চৌধুরীকে বলেছিল– চাচা, এই ঠাকুরগুলোকে কতদিন আর বুকে করে পুষে রাখবে? এবার তো ওদের পাতাড়ি গুটোবার দিন ঘনিয়ে এল! হয়তো এরই ওপর আরো কথা হয়েছে। লতিফ বলেছে– চাচা, এ শালাদের তল্পি তোলার সময় এসেছে, মনে রেখ। যেসব বীর দেশকে স্বাধীন করার জন্যে জীবন দিয়েছে, এখন বরং ওদের ছবি আর ফটো দিয়ে ঘর সাজাও। হয়তো নুরু চৌধুরীর এসব কথা খুব খারাপ লেগেছে; তখন সে কিছু বলেনি। কিন্তু পরদিন, ভালো করে তখনো সকাল হয়নি, এমন সময় লতিফ শব্বির গ্রেফতার হল।’
.
সময় কাউকে চিরকাল মনে রাখে না। গ্রামবাসীও ক্রমশ লতিফ আর শব্বিরের কথা ভুলে যাচ্ছিল। তাদের মনে নুরু চৌধুরীর প্রতি যে পক্ষপাতিত্ব উবে গিয়েছিল তা ক্রমেই ফিরে আসতে লাগল। কারণ সবাই দেখল, লতিফ আর শব্বিরের বিচারের পর নুরু চৌধুরী গাঁয়ের বহু লোককে জমায়েত করে তাদের কথা দিলেন, সরকার ওদের আট বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে বটে, কিন্তু তিনি ওদের নির্দোষ এবং নিজের ভাই বলে মনে করেন। তিনি ওদের ছেলেপিলের প্রতি বাস্তব সমবেদনার প্রমাণ স্বরূপ খরচ-পত্তরের জন্যে মাসিক পঞ্চাশ টাকা করে মঞ্জুর করে দিলেন। এইভাবে মাসে একশো টাকা খরচ করে নুরু চৌধুরী নিজের সম্পর্কে সারা গাঁয়ের মনোভাবকে দিলেন বদলে।
কিন্তু তবু নুরু চৌধুরী তৃপ্ত হতে পারলেন না। তিনি গ্রামবাসীদের ধারণাই শুধু বদলে দেবার চেষ্টা করলেন না, বরং তাদের মনকেও জয় করে নেবার চেষ্টা করলেন। তিনি নিজের বাড়ির সামনের খালি জমিটুকুতে ছোট একটি পাঠশালা খুলে দিলেন। এছাড়াও গাঁয়ে কয়েকটি কুয়ো খোঁড়ালেন। গাঁয়ের প্রতিটি বিয়ে-শাদিতে, বিপদে-আপদে দেখাশোনা করা, অংশগ্রহণ করা ও সাহায্য করাটা নিজের অভ্যাসে পরিণত করে ফেললেন। আর, এদিকে তাঁর বাড়িতে বই, ছবি আর ঠাকুরেরও সংখ্যা বেড়ে চলল।
সেদিন নুরু চৌধুরীর বাড়ি ছাড়াও গোটা গাঁ-টাকেই আলোর মালায় সাজিয়ে দেওয়া হল। চৌধুরী নুরুল হুদা এবার খানবাহাদুর নুরুল হুদা হলেন। সায়েব-সুবোদের সংবর্ধনার জন্যে যে বিশেষ ঘরটি তৈরি হয়েছিল, সেদিন সেটির ভাগ্য গেল খুলে। এ-দিনটির আনন্দঅনুষ্ঠান সুসম্পাদিত করার জন্যে শহর থেকে অনেক লোক আনা হয়েছিল। সন্ধ্যা হতেই অভ্যাগতদের আবির্ভাব আরম্ভ হল– সবার শেষে এল জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মোটর। খানবাহাদুরের খেতাবপ্রাপ্তিতে তিনি অভিনন্দন জানাতে এসেছিলেন।
ম্যাজিস্ট্রেট যখন তাঁর রাজকীয় ভাষায় বললেন, ‘কাবাহাডুর সায়েব কালা আডমি আছে, টাটে কোনো ক্ষটি নাই, উহার অন্টর আয়নার মটো পরিষ্কার আছে।’– তখন হলটি হাততালির চোটে ফেটে পড়ে আর কি! খানবাহাদুর নুরুল হুদার চেহারাও খুশির চোটে লাল হয়ে উঠল।
ভোজের পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং খানবাহাদুর নুরুল হুদার মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা হল। তারপর ম্যাজিস্ট্রেট চলে গেলেন; তারপরও সারারাত আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে রইল গ্রামখানা
কিন্তু দিন কয়েক পরেই গাঁয়ের আরো কয়জন যুবক গ্রেফতার হল এবং এদের বেলায়ও লোকে সন্দেহ করল, এরাও লতিফ আর শব্বিরের পথের পথিক ছিল।
.
খানবাহাদুর নুরুল হুদার খেতাব পাওয়ার এক বছরও হয়নি, এমন সময় ইংরেজ ঘোষণা করল, তারা ভারত ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু এ গাঁয়ে এ খবর এত দেরিতে পৌঁছল যে, জল তখন অনেকদূর গড়িয়েছে। দেশ জুড়ে দাঙ্গার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। ইংরেজ চলে গেলে খানবাহাদুরের বেশি চিন্তা হল নিজের জীবন নিয়ে। কারণ চারদিকে গুজব রটে গিয়েছিল, গাঁয়ে সকাল-সন্ধ্যা যে-কোনো সময়ে আক্রমণ হতে পারে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে তিনি কয়েকটা চিঠি লিখলেন, কয়েকবার নিজের বিশেষ বার্তাসহ লোক পাঠালেন। কিন্তু তিনি সদরের শান্তি রক্ষা করেই কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না, খানবাহাদুরের আহ্বানে গাঁয়ে আসেন কেমন করে!
কিন্তু অবশেষে একদিন সশস্ত্র সৈন্যের একটা পল্টন খানবাহাদুরের নিরাপত্তার জন্যে শহর থেকে গাঁয়ে এল। সেদিন গাঁয়ের সমস্ত লোকের ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল এবং সবার মনে খানাবাহাদুর নুরুল হুদার মর্যাদা অনেক বেড়ে গেল।
আসলে ব্যাপারটা অন্যরকম। খানবাহাদুরও এই নতুন খেতাবের মারফতে পাওয়া সম্মানকে আরো খানিকটা দৃঢ় করার জন্যে অনেককিছুই করতে আরম্ভ করেছিলেন। ভাগ্যের জোরে দাঙ্গাও এই সময়ে তাঁকে গ্রামবাসীদের সেবা করার খাসা সুযোগ এনে দিল। গাঁয়ে যে-কোনো কাজই হোক না কেন– শান্তি-কমিটি গঠন কিংবা ‘মিলাদ-মাহফিলে’র অনুষ্ঠান কিংবা সভা-ধর্মসভা– খানবাহাদুর সবখানেই উঁচু আসন পেতেন। খানবাহাদুরের সায়েব-প্রীতি মূর্তি, ছবি আর বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পয়সার জোরে শুধু মর্যাদাই বাড়ে না, বরং এ যুগে পয়সা দিয়ে মানুষ পর্যন্ত কেনা যায়, এ শিক্ষা সম্ভবত তাঁকে এই বোবা বন্ধুরাই দিয়েছিল। এই কারণেই গাঁয়ের এবং আশপাশেরও সম্ভবত এমন কোনো সমিতি মণ্ডলী কিংবা রাজনৈতিক অরাজনৈতিক এমন কোনো প্রতিষ্ঠানই ছিল না যাতে খানবাহাদুরের চাঁদা যেত না।
